চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তাবলিগ নেতারা বিভক্ত, অনুসারিরা কতটা বিভক্ত?

এবারের টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে তাবলিগ জামাতের মধ্যকার দ্বন্দ্বটা প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রস্থল দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রকাশ্য কর্মসূচি দেখা গেছে ঢাকার রাজপথে। বিমানবন্দরে তাবলিগি নেতাদের অনুসারিদের একাংশে বিক্ষোভ, হুমকি ও কর্মসূচি সৃষ্ট জনদুর্ভোগে নাভিশ্বাস ওঠেছে জনগণের। এমন বাজে ঘটনার প্রভাব ঢাকাজীবনে প্রথমবারের মত দেখা গেছে। অথচ দ্বন্দ্বের শুরুটা এবং কেন্দ্রস্থল এদেশে ছিল না, ছিল ভারতে।

বিজ্ঞাপন

তাবলিগ জামাতের দ্বন্দ্বে নেপথ্যে দেওবন্দ ও নিজামুদ্দিনের নেতাদের সকলেই ভারতের। উপমহাদেশের ইসলাম শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থান ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে। অপরদিকে ইসলামি দাওয়াতের জন্যে গঠিত তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রস্থল নিজামুদ্দিন মারকাজ মসজিদ ভারতের দক্ষিণ দিল্লির পশ্চিম নিজামুদ্দিনে অবস্থিত। নিজামুদ্দিন মসজিদ মারকাজকে বলা হয় তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র, এবং ওই জামাতের বর্তমান আমির হচ্ছেন মাওলানা সাদ কান্ধলভি।

মাওলানা সাদ তাবলিগ জামাতের নিজামুদ্দিন মারকাজকে মক্কা-মদিনার পর ইসলামের সবচেয়ে বড় কর্তৃপক্ষ দাবি করার পর দেওবন্দের সঙ্গে বিরোধ স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে মাওলানা সাদের দাবি কোরআন শিখিয়ে অর্থ নেওয়া যাবে না, যা সরাসরি দেওবন্দি আলেমদের বিরুদ্ধে যায়। কারণ, দেওবন্দের অনুসারি মাদরাসাদের অধিকাংশই মসজিদ-মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষাদান করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন, এবং এই ধারার আলেমদের বেশিরভাগই সারাবছর অথবা শীতের মৌসুমে দেশব্যাপী ওয়াজ নসিহত করে থাকেন। এই ওয়াজ মাহফিলে তাদের বেশিরভাগই টাকা নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো আলেমদের আবার আগে থেকেই অর্থের বিনিময়ে বুকিং নিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এর বাইরে তাবলিগ জামাতের মধ্যকার দ্বন্দ্বে রয়েছে মওলানা সা’দ তথা তাবলিগ জামাতের আমিরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। শুরুতে তাবলিগ জামাতের আমির এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও একটা সময়ে এসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যায় সাংগঠনিক পর্যায়ে, অর্থাৎ শুরা কমিটির। কিন্তু মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নিয়ে পূর্বের একক সিদ্ধান্তে ফিরে যান। আর এতে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বিরোধ প্রকাশ্য হয় ওখানে।

তাবলিগ জামাতের শুরুটা ভারত থেকে, সেটা গত শতকের বিশ দশকে। ভারতের ইসলামি পণ্ডিত মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি তাবলিগ জামাত নামের এ দাওয়াতি কার্যক্রমের সূচনা করেন; যা স্বেচ্ছাশ্রম ভিত্তিক এবং ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে পরিচালিত। তাবলিগ জামাতে অংশগ্রহণকারীদের কাউকে কারও কাছ থেকে অর্থ নিতে দেখা যায় না। নিজদের অর্থে তাদের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। মওলানা ইলিয়াসের মৃত্যুর পর তার ছেলে মওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। ওই শুরা কমিটিতে সদস্য ছিলেন পাকিস্তান তাবলিগ জামাতের আমির হাজি আদুল ওয়াহহাব, মওলানা ইনামুলের ছেলে মওলানা জুবায়েরুল হাসান এবং মওলানা ইউসুফের ছেলে মওলানা সা’দ।

মওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নেওয়ার পর একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। মওলানা সাদের এই সিদ্ধান্তে মওলানা জুবায়েরের ছেলে মওলানা জুবায়েরুল হাসান বিরোধিতা করেন, তিনি নেতৃত্বের দাবি করেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। এই বিরোধ ও সমস্যাগুলো মূলত ভারতেই সৃষ্ট। কিন্তু এটা এখন আর ভারতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এবারের বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও চলে আসে, এবং সেটা হুমকির পর্যায়েও চলে যায়।

বিজ্ঞাপন

নিজামুদ্দিন মারকাজের আমির মওলানা সা’দ কান্ধলভি বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে এবার বাংলাদেশে আসার পর বিমানবন্দরে বিক্ষোভ করে তাবলিগ জামাতের একাংশ। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রস্থল কাকরাইল মসজিদে অবস্থানকালে সেখানে হামলার চেষ্টাও চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তাবলিগিদের মওলানা সা’দ বিরোধি অংশ প্রয়োজনে আরেকটা ‘শাপলা চত্বর’ বানানোরও হুমকি দেয়। এই হুমকিদাতাদের শাপলা চত্বর বানানোর হুমকি তাদের হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়। কারণ ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হয়ে রাজধানীজুড়ে নাশকতা চালিয়েছিল।

তাবলিগ জামাতের একাংশের নামে হেফাজত নেতাদের এই হুমকি-ধমকির পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সা’দ এবারের বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন না, তিনি দিল্লি ফিরে যাচ্ছেন। অথচ এই মওলানাই বিশ্ব ইজতেমায় গত তিন বছর আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন।

তাবলিগ জামাতের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যার শুরুটা ভারতে তার প্রভাব এখন বাংলাদেশে পড়েছে। শুরু থেকে রাজনীতি বিযুক্ত ধর্মীয় দাওয়াতি কার্যক্রমের তাবলিগ জামাতের বাংলাদেশ অংশে বাংলাদেশের রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা ঢুকে পড়ার কারণে এখন এই ধর্মীয় কার্যক্রমও সমস্যার মুখে পড়েছে। মওলানা সা’দকে এবার ইজতেমায় অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসার পরের দিন পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হয়েছে, হয়ত শেষও হয়ে যাবে যথারীতি; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বিভক্তির সুস্পষ্ট যে রেখা অঙ্কিত হল সেটা গুরুত্বের দাবি রাখে।

এমন না যে এবারই প্রথম মওলানা সা’দ কান্ধলভির আমিরের পদ ও একক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে, আগেই ওঠেছিল সেটা। এনিয়ে ভারতে বিরোধ চলেছে, তবে এবারের মত আর কখনই এমনভাবে বাংলাদেশে বিমানবন্দরে এমন বিক্ষোভ হয় নি, এনিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে কিছু বলতে হয়নি, এটা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য দিতে হয় নি। এটা হয়েছে এবার, এবং সেটা তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে হেফাজতে ইসলাম নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণেই। ফলে তাবলিগ জামাতের মৌল নীতিই এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তাবলিগি কার্যক্রম হেফাজতে ইসলামের করতলগত হল এর মাধ্যমেই।

বাংলাদেশে আলেম ওলামারা দ্বিধাবিভক্ত আদর্শ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে; সেটা অনেক দিন থেকেই। কওমি মাদরাসার আলেম ওলামারা বিভক্ত, দল-উপদলে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ও ধর্ম ব্যবসা কাঠামোর বাইরে থাকা তাবলিগ জামাত এবার পুরোপুরিই ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের হাতেই বন্দি হয়ে গেল।

তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রস্থল নিজামুদ্দিন মারকাজের আমির মওলানা সা’দ এবারের বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে পারেননি, আগামিতে হয়ত পারবেনও না। তার অংশ না নিতে পারায় বিদ্রোহি অংশের বিরোধিতা ছাড়াই এবারের ইজতেমা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এর রেশ থেকে যাবে পুরোপুরি। সা’দ অংশের অনুসারিরা আগামিতে দেওবন্দ ও মাওলানা জুবায়েরুল হাসান অনুসারিদের শীর্ষস্থানীয়দের কাউকে এবারের মত প্রতিরোধ করতে যে মাঠে নামবে না সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। ফলে এক মওলানা অংশ নিতে না পারলেও আগামিতে আরও অনেক মওলানার অংশ নেওয়ার পথেও প্রতিবন্ধকতার বীজটা রোপিত হয়ে গেল। যা দাওয়াতি এ কার্যক্রমের ওপর প্রভাব পড়তে বাধ্য।

ভারতের তাবলিগি নেতাদের বিভক্তির প্রভাবে বাংলাদেশের নেতারাও বিভক্ত হয়ে গেছেন, এবং সেটা রাজনৈতিক ঢঙয়ে। হেফাজতে ইসলাম নেতারা সামনে চলে আসার কারণে দাওয়াতি এ কার্যক্রম তার আসল রূপ হারাতে বসেছে। হেফাজত নেতাদের অনেকের সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার কারণে তাবলিগি কার্যক্রমেও এই জঙ্গিবাদ পোক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাই থেকে যাচ্ছে। মসজিদে-মসজিদে হেফাজত প্রভাবিত জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়া শুরু হয়ে গেলে ভয়াবহ সঙ্কটে পড়ে যাবে দেশ। তখন এথেকে উত্তরণও কঠিন হয়ে যাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)