চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তসলিমা নাসরিন বনাম মাসুদা ভাট্টি

আমি আপাতত দুজনের উপর মহা বিরক্ত। মাসুদা ভাট্টিকে চরিত্রহীন বলার পর আমার জানা মতে বাংলাদেশে সবার প্রথম আমি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, আমি চরিত্রহীন।

বিজ্ঞাপন

তবে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের এই চরিত্রহীন বলাটাকে আমি প্রথমত নিয়েছি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এর কারণ পরিষ্কার ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে মাসুদা ভাট্টি প্রশ্ন করেছেন, তিনি জামাত শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা, কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই প্রমাণ বহন করে এমন ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল তার আগের দিন রাত থেকেই। এই প্রশ্ন শুনে ব্যারিস্টার সাহেব তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কারণ সামনের নির্বাচন কেন্দ্রিক তার রাজনৈতিক পরিকল্পনার রূপরেখা তিনি মনে মনে এঁকেছেন সেটির ক্ষেত্রে শিবির এর সাথে তার সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ্যে নিজ মুখে শিকার করার মত বোকামি তিনি করবেন না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ আর যাই চাক অন্তত কোনোদিন রাজাকার আলবদরের দল জামাত শিবিরকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না, কতিপয় পাকি দালাল ছাড়া। সুতরাং এটা বুমেরাং হবে তাই স্বাভাবিক । এর কারণ তার ক্ষমা চাওয়ার ফোন আলাপেও পরিস্কার।

আমার এটিকে রাজনৈতিক কারণ হিসেবে নেয়ার এটাই প্রধান কারণ। আমি ব্যাক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির ছাত্র রাজনীতি করে আসা একজন মানুষ । সুতরাং আমিও চাইব আমার দল নির্বাচনের আগে আগে বিপক্ষ দলের বোকামিকে হাতিয়ার হিসেবে নেয়ার এই সুযোগ কখনোই হাতছাড়া না করুক এবং সেটা তারা করেওনি। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে তাদের ১ম দিনের কর্মসূচিকে আমি স্বাগত জানিয়েছি। এই বিষয়ে আবার শেষে আসছি।

তার আগে বলে নেই কেন নারীবাদের দিক থেকে কোন নারীকে প্রকাশ্যে চরিত্রহীন বললে এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সকল সময় কোন নারীর সাথে বিদ্যা-বুদ্ধি যুক্তি-তর্কে না পারলে শেষ পর্যন্ত একটাই অস্ত্র ব্যবহার করে তা হল চরিত্র। আমি নিজে ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড জেন্ডার পড়েছি , বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি, জাতীয় টেক্সটবুক অধিদপ্তরে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে কাজ করেছি। আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী সরকার নতুন করে বই ছাপিয়েছে। সুতরাং ভাষা দিয়ে কী করে নারীকে কালে কালে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়েছে, নিচুভাবে, ক্ষমতাহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিয়ে কথা বলার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখি। আমি তাই এটি নিয়ে উইমেন চ্যাপ্টরের সুপ্রিতি দিদির সাথে কথা বলি সেদিন সকালেই। দিদিকে এ বিষয়ে আমার অনুভূতি জানাই। লিখতে বলি।

সমাজে যে নারীকে প্রতি পদে পদে চরিত্রহীন শুনতে হয় প্রত্যক্ষ পরোক্ষ উভয়ভাবেই। কিন্ত যখন লাইভে এসে প্রকাশ্যে বলা হল সেটা প্রাতিষ্ঠনিকতা পেল, যেটি সমাজের প্রচলিত প্রথায় বিশাল আঘাত হানল। এক নিমেষেই অন্দরমহলের গালি থেকে বাহির মহলে চলে এলো, সেটি কখনোই কাম্য ছিলনা।

তাই আমি ১ম শক্তিশালী রাজনৈতিক যুক্তির পাশে এটিকে ২য় হিসেবে পাত্তা না দিয়ে পারলাম না। যে ১০১ জন নারী প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছে একক মাসুদা ভাট্টিকে নারী জাতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে নিজেদের সবার গায়ে অপমান জড়িয়ে নিয়েছে তাদের দলে আমিও ছিলাম। বলতে গেলে প্রকাশ্যে চরিত্রহীন বলার অপমানের প্রতিবাদ করা প্রথম ১০ জনের মধ্যে ছিলাম। প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন পর্যন্ত আমার মতে অসাধারণ একটি মুভমেন্ট লক্ষ করেছি। নারীকে অসম্মান করলে নারীর পাশে নারী দাঁড়াবে এটির একটি চমৎকার নজির আমরা দেখেছি। এর ২য় দিন যখন সমাজের ৫২ জন বিশিষ্ট মানুষ আমাদের সাথে মাসুদার পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটিকে আমি বিশাল অর্জন হিসেবে নিয়েছি।

তার মানে এবার যেটি দাঁড়াল ২টি পক্ষ ২ দিক থেকে ব্যারিস্টার সাহেবকে একেবারে ছোবল মেরে বসল। যদিও মাসুদা ভাট্টি নিজে নারীবাদী তার দিক থেকে এখনও লড়ছেন নারীবাদিদের সাথে। কিন্তু আমার বিশ্বাস মাসুদা ভাট্টি নিজেও মনে মনে জানেন যে এখানে তার প্রশ্নের সাথে অপমান সুলভ যেই শব্দটি শুনেছেন সেটির ভিত্তি একেবারেই রাজনৈতিক। কিন্তু তিনি সেখানে চুপ রইলেন।

গতকালের পর থেকেই রাজনৈতিক ও নারীবাদী উভয় দলের লেখা প্রতিবাদ কর্মসূচি দাবি সকল কিছু আমার কাছে বেশি বেশি মনে হয়েছে। এর কারণ আমি একটু আগেই বলেছি যে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ২ সর্প দ্বারা যথেষ্ট দংশিত হয়েছেন এবং মারা গেছেন। একজন সাপের বিষে নীল বরণ মানুষকে নিয়ে আর নাড়াচাড়ার আমি কোনো প্রয়োজন দেখিনি। এবং এর একটি আফটার ইফেক্ট অনুমান করছিলাম। বিষয়টা কিছুটা সাপে কাঁটা মানুষের গায়ে কামড় বসিয়ে নিজের ক্ষতি সাধনের মত। আর সেই আঘাতটা একজন নারীর কাছে থেকে আসবে সেটা অবশ্য চিন্তার বাইরে ছিল। হায়রে বাঙালি নারীবাদি সেই চিরায়ত পুরুষের বলির শিকার হয়ে নারীর দ্বারা নারীর শত্রুতার কূট কৌশল আবারো সামনে নিয়ে আসলেন তসলিমা নাসরিন । বাঙালি নারী পুরুষ উভয়েই বড় ডাবল স্ট্যান্ডার্ড গোছের জীব।

বিজ্ঞাপন

তবু এই সমাজে তসলিমা নাসরিন ও মাসুদা ভাট্টিরা খুব সচরাচর হয়ে উঠতে পারে না। তাই তাদেরকে একটু ব্যতিক্রম ভেবেছিলাম। কিন্তু না তারা আসলে যেই লাউ সেই কদু। যদিও তসলিমা নাসরিন এর মনোবেদনা আমিও বুঝেছি। সেই আগের মত চিরায়ত বাঙালি মধ্যবিত্ততার ভেতর উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে কৃতঘ্ন হওয়ার মত। এক কথায় প্রকাশ তো আর একদিনে আসেনি।

তাই ক বই নিয়ে মাসুদা ভাট্টির সমালোচনাও যথেষ্ট ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়ে গেছে। যেখানে লেখনি থেকে লেখককে নিন্দিত করেছেন তিনি। যেটি একজন অচেনাকে উপকার করার বদলে আশা করেননি তসলিমা। দিনশেষে আমরা তেলের জাতি। প্রশংসা শুনতে ভালবাসি। সমালোচনা শুনে আমাদের শোধ রানো ধাতে নাই।

আবার মুদ্রার অপর পিঠে আমাদের একটা অদ্ভুত গুণ আছে যেটি না বলে পারছিনা সেটা হল, আমাদের মত এত স্বল্প সময়ে মানুষকে জাজ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আর কাউকে দেননি ।

আরও একটি বিষয় যেটা তসলিমা নাসরীনের মনোবেদনা হবে সেটা খুব স্বাভাবিক । এই এক চরিত্রহীন শব্দের জন্য সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের এক ছাতার নিচে চলে আসা এটি যে খারাপ তা কিন্তু তসলিমা নাসরিন খারাপভাবে নিয়েছেন তা না। তিনি সকল সময়ে নারীবাদি জায়গা থেকে কথা বলতে গিয়ে কাউকে পাশে পাননি। সুতরাং তিনি এতে গোসসা হবেন  তাই তো স্বাভাবিক। তার মানে এখন বিষয়টা তাদের ব্যক্তিগত। আমরা আর এখানে কথা না বলাই ভাল। দুই বান্ধবি নিজেদের ঘরে নিজেরা ঝগড়া বিবাদ করুক। আমাদের সময়ের অনেক দাম। আর নষ্ট করা ঠিক হবে না।

সব শেষে বলব, আমার বয়স অভিজ্ঞতা দুটোই খুব কম। তবু স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু বুঝেছি সাপের দংশনে মাঈনুল সাহেব মারা গেছে ২ দিন আগেই। নারীবাদের আর রাজনীতির ২ শাপও ছোবল দিতে গিয়ে তাদের বিষ দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছেন। সুতরাং মরা সাপ নিয়ে আর মাথা না ঘামানোই উচিৎ।

আমি শুধু তসলিমা নাসরিন ও মাসুদা ভাট্টিকে একটা অনুরোধ করব ছোট বোনের আবেগ থেকে, দেখুন আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থায় একজন তসলিমা নাসরিন ও একজন মাসুদা ভাট্টি হয়ে গড়ে উঠা খুব কঠিন। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বহু নারী প্রথা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে আপনাদের মত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আপনাদের একটি শব্দ তাদের কাছে একটি রচনার মত।

আপনার এই পারস্পরিক আক্রোশ থেকে দয়া করে বেড়িয়ে আসুন। আরও হাজার হাজার তসলিমা নাসরিন ও মাসুদা ভাট্টি গড়ে তুলুন। একদিন দেখবেন হাজার হাজার আপনি লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি আপনি হয়ে সমাজের সব সাপের বিষ দাঁত ভেঙে দেবে।

নিরন্তর শুভকামনা আপনাদের দু’জনের জন্য।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)