চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তনু হত্যা: সময়ের ফাঁদে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোচনার শীর্ষস্থান লাভ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম তনু হত্যাকাণ্ড। আমাদের দেশে কী কোন ভালো ঘটনা ঘটছে না? পত্রিকার পাতায় খুনের খবর। টিভি’র পর্দায় হত্যার সংবাদ (ক্ষেত্র বিশেষ ভিডিও ফুটেজসহ)।

চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা এধরণের ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক। যানজটের বিভীষিকাও এখন অনেকটা সয়ে গেছে। এমন হচ্ছে কেন? এটা কী আমাদের সহনশীলতা? না কি কোন ঝড়ের পূর্বাভাস? সর্বত্র কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজমান। কেমন যেন একটা অপ্রকাশিত অস্থিরতা সবার মনে। আবার নীরবতাও। অস্থিরতা এবং নীরবতার এমন যৌথ সমন্বয় এর আগে হয়তো আর দেখা যায় নি।

প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্ব অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করছে। বিজ্ঞানের এই সাফল্য অনস্বীকার্য। উন্নতির জাগরণে মানব সভ্যতা। এর মধ্যেও কিছু কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানব সমাজকে পীড়া দেয়। এর একটি হচ্ছে নির্যাতন। ‘নির্যাতন’ শব্দটির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে নারী এবং শিশু। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও সাধারণভাবে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক দিয়ে এখনো নিজেদের পুরুষের সমকক্ষ মনে করতে পারেন না।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বের দরিদ্র জনগণের ৭০ শতাংশই নারী এবং মাত্র এক শতাংশ নারীর নিজস্ব মালিকানায় সম্পত্তি আছে। এ প্রতিবেদনটিই প্রমাণ করে যে, নারীরা পুরুষের সমানাধিকার পাচ্ছে না। এছাড়া দুঃখজনকভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নারীরা নির্যাতিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

গত ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেনের মেয়ে তনুর লাশ পাওয়া যায়। ঘটনার পর ধর্ষণের সন্দেহ পুলিশই প্রথম জানিয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের ১৪ দিন পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক দল প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। ময়নাতদন্তের বিলম্ব করার কারণ হিসেবে, কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন বলেছিলেন,‘ধারণা থেকে বলেছি তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।’

তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে এ তদন্ত চলছে। চাঞ্চল্যকর তনু হত্যা মামলার তদন্ত করেছে সিআইডির তদন্ত দল। এর সময় লাগতে পারে বলে শুনেছি’। এসপি’র এমন বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া। তিনি সেটা জেনেছেন। আরও ধারণা করা যায়, এই ঘটনার সাথে এমন বিশেষ মহল জড়িত, যাদের গ্রেফতার, বিচার কিংবা অন্য কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ অসম্ভব। ফলে তাদের অত্যাচার, ব্যভিচার এবং অনাচারের ধারা চলমান এক পরম্পরা।

আমাদের এই ধারণাটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন কুমিল্লার বিশেষ পুলিশ সুপার (সিআইডি) ড. নাজমুল করিম খান। গত ২২ জুন সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যার বিচার একদিন হবেই।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ৪ নেতা হত্যা, মানবতাবিরোধী হত্যার বিচার হয়েছে। একটু সময় লাগলেও তনু হত্যার বিচারও হবে। কারণ আমরা অনেক গুমের মামলায় কোনো প্রমাণ পাই না, লাশ পাই না। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর কাপড়ে ৩ জনের শুক্রানু পাওয়া গেছে। আসামি মারা গেলেও কবর থেকে লাশ তুলেও ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব। তনু হত্যার ঘটনার স্থান একটি স্পর্শকাতর এলাকায়। সেখানে ইচ্ছে মতো সোর্স ব্যবহার করা যায় না।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন জানান, সিআইডির কর্মকর্তারা ২২ জুন (বুধবার) আমাদের বাসায় এসেছেন। তারা বলেছেন, আমাদের (সিআইডি) হাতে যে সব প্রমাণ রয়েছে তাতে আসামির পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সিআইডি কর্মকর্তারা তনুর বাবাকে গাড়ি চাপা দেয়ার চেষ্টার বিষয়ে থানায় জিডি করার পরামর্শ দেন।

সেনানিবাসের বাসার পাশের একটি জঙ্গল থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধারের পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে তার প্রথম ময়নাতদন্ত করেন ডা. শারমিন সুলতানা। গত ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের জন্য তনুর লাশ জেলার মুরাদনগরের মির্জাপুর গ্রামের কবর থেকে উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গত ৪ এপ্রিল দেয়া হয় প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে তনুকে হত্যা ও ধর্ষণের আলামত না থাকায় সমালোচনার মুখে পড়ে ফরেনসিক বিভাগ।

গত ১৬ মে তনুর কাপড়ে ৩ পুরুষের শুক্রানু পাওয়া যাওয়ার খবর সিআইডি থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আবারো আলোচনায় উঠে আসে প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ডিএনএ প্রতিবেদনের এমন গরমিল তথ্যে ঝুলে যায় দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতের নির্দেশে ফরেনসিক বিভাগে হস্তান্তরের পর ১২ জুন ‍দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেটি নিয়েও বিতর্ক হয়।

তনু হত্যার পর একাধিক জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়েছে, “তনু হত্যার ১০ দিন”। “তনু হত্যার ৩০ দিন…” । বাস্তবতা হচ্ছে ঘটনার ৯৪ দিন পার হয়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন তনু’র বাবা-মা মামলার অগ্রগতি জানার জন্য সিআইডিতে কার্যালয়ে আসেন। ধারণা করেন। অসহায় চিত্তে, অশ্রুসিক্ত নয়নে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আশ্বাস দেয়া হয় তাদের। আবার ভিন্নভাবে হুমকী-ধামকীও দেয়া হয়।

কি অপরাধ এই পরিবারটির? নিজেদের দারিদ্রতার অভিশপ্ত বলে, তনু’র মায়ের আর্তনাদ আমরা শুনেছি। মেয়েকে হারিয়ে বিচার চাওয়ার অপরাধে এখন স্বামীর প্রাণও সংশয়ে। অদূর ভবিষ্যতে ইয়ার হোসেনে’র মৃত্যু সংবাদে আমরা কী অবাক হবো? না কি এটাও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেবো?

পত্রিকান্তরে আমরা জেনেছি, সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে একটি গোয়েন্দা দল। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের রহস্যজনক নীরবতার কারণ অজ্ঞাত। একই বৃত্তে ঘুরছে চাঞ্চল্যকর তনু হত্যামামলার তদন্ত। একজন লেফটেন্যান্ট-এর ছেলের দিকে প্রাথমিক দিকে সন্দেহের তীর থাকলেও, সেটা রহস্যজনকভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট। ‘তনু হত্যার ঘটনা দেশের জনগণকে বিচলিত করেছে। জনগণ এর সুষ্ঠু বিচার চায়’। গত ১৭ মে একথা মিডিয়ার সামনে পরিস্কারভাবে বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

বিচার বা শাস্তি না হওয়ার বহু উদাহরণ এদেশে রয়েছে। কিন্তু একটি ঘটনা ৯৪ দিন ধরে মিডিয়ায় টিকে থাকার দৃষ্টান্ত বিরল। তনুর বাবা বলেছেন, আমরা তো কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে বলছি না। আমরা আমাদের মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাইছি। একজন পিতার এই ন্যায্য দাবী পূরণে রাষ্ট্র ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এই লজ্জা কার? এই কলঙ্ক কি রাষ্ট্রকে লজ্জিত করে না?  মামলার গতি শ্লথ হয়ে গেছে। চরম অনিশ্চয়তা এবং হাতাশায় ভুগছে তনুর পরিবার। তবুও, আশাহত হৃদয়ের নির্ঘুম রাত স্বপ্নের হাতছানি দেয়।

মায়ের মন কেঁদে ওঠে। বিশ্বাস করতে চায়, শিগগিরই তাদের কন্যার হত্যাকারীদের বিচার হবে, শাস্তি হবে। এমন আশ্বাসও পাচ্ছেন তারা।  তদন্ত চলছে। চলতে চলতে কমে থামবে সেটা আমরা কেউ জানি না। শুধু এটুকু জানি, যারা আশ্বাস দিচ্ছেন, সেটায় আমরা বিশ্বাস রাখতে পারছি না। হাজারও ‘তনু’ এভাবেই নীরবে নিভৃতে চলে গেছে। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে। কাঁদছে…!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail