চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডিজিটাল ঈদ আনন্দে এবারের বিশ্বকাপ

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। পুরো মাসের সিয়াম সাধনার শেষে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায়, অলিগলিতে বেজে ওঠে প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ।” এই গানের সুরের সাথে বাঙালি মুসলিমের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের রঙ, আনন্দের অনির্বচনীয় বারতা। রোজার শেষ দিনের ইফতারের পরে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম আনন্দে একাকার হয়ে যায়। চারিদিকে খুশির জোয়ারে মেতে ওঠে সব বয়সী মানুষ।

বিজ্ঞাপন

ঈদের আনন্দ সবসময় একই না থাকলেও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই উৎসবে আনন্দের কমতি ছিল না কখনো। সেকালে একালে সবকালেই আনন্দময় সার্বজনীন ঈদ উৎসব। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে উৎসব উদযাপনের ধরন। বদলেছে এর অনুভূতি প্রকাশের ভিন্নতা। সময়ের পরিবর্তনে ঈদ আনন্দে লেগেছে ডিজিটাল হাওয়া। ইন্টারনেট, অনলাইন, ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে ঈদের বৈশ্বিক রং আরও বেড়েছে। ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এই সব ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া। ঘরে বসে আমেরিকা বা বিলাত প্রবাসী সন্তান-সন্ততির সাথে ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে একে অপরের সাথে ভাগ করে নিচ্ছে ঈদের আনন্দ। এক মূহুর্তের মধ্যে দুনিয়ার এই প্রান্তের ঈদ আনন্দের ছোঁয়ায় মেতে উঠছে দুনিয়ার অপর প্রান্তের মানুষ। আর এই অভূতপূর্ব যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি মাধ্যমে। তাই বদলে যাচ্ছে পৃথিবীব্যাপী ঈদ উৎসবের আমেজ।

তথ্য প্রযুক্তি আর অনলাইনের দুনিয়ায় প্রচলিত ঈদ আনন্দে লেগেছে নতুনত্বের বাতাস। আগেকার দিনের মতো নাগরিক মানুষেরা এখন আর দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে শপিংয়ে ক্লান্ত হয়ে ঈদের কেনাকাটায় মাতে না। ই-কমার্স বদলে দিচ্ছে ঈদ কেনাকাটার প্রথাগত পদ্ধতি। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মে ঢুকে যে কেউ নিজের পছন্দের ঈদের পোশাক এবং উৎসবের প্রয়োজনীয় সব কিছুই পেয়ে যাচ্ছে এক ক্লিকে। অনলাইন শপে অর্ডার করার সাথে সাথে পছন্দের ঈদ সামগ্রি পৌঁছে যাচ্ছে ঘরের ড্রয়িংরুমে। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে এখন আর বাসের ট্রেনের বা প্লেনের টিকেট কাটতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। অনলাইনে অর্ডার করে যে কোন ডেসটিনেশনের টিকিট সহজেই পেয়ে যাবেন আপনি। আর এইভাবেই ঈদের আনন্দ আরও সহজ এবং ব্যাপকভাবে ডিজিটালাইজড হয়ে ধরা দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের মানুষের কাছে।

তবে সব সময়ই ঈদের আনন্দের বেশির ভাগ জুড়ে থাকে শিশুরা। কেমন ছিল আগের ঈদ? স্মৃতির আবেগে ভেসে ভেসে অতীতে গেলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না কারও। আর তা যদি হয় ঈদের স্মৃতি তা হলে তো কথাই নেই। কি আনন্দ, কি উৎসবের মাতামাতি! সেই সময়ে এখনকার বসুন্ধরা শপিং মল যমুনা ফিউচার পার্কের মত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় বড় শপিং মল ছিল না।  আড়ং, মায়াসীর, ক্যাটস আই, মেনজ ক্লাব, অহং, রেলুসে, সাদাকালো, দেশী দশ, ইনফিনিটি, এপেক্স, ইয়োলো, সাদাকালো, অঞ্জনস, বিশ্বরং, দর্জিবাড়ী- এই রকমের নামিদামী ব্র্যান্ডের সুপার শপ তো দূরের কথা তখন রেডিমেড গার্মেন্ট পর্যন্ত ছিল না। থান কাপড়ের দোকান থেকে থান কিনে পোশাক বানাতে হতো। রোজার আগে থেকেই ভিড় শুরু হয়ে যেত খলিফা, টেইলর বা দর্জি বাড়িতে। আবার এসব থান কাপড় যখন তখন কেনাও যেত না, হাটের দিন হাট ছাড়া কাপড় পাওয়া যেত কম। গঞ্জে বা সদরের নিউমার্কেট থেকে উচ্চবিত্তরা অবশ্য কাপড় কিনতে পারতো। দর্জি বাড়িতে কাপড় বানাতে দিয়ে রাতে ছোটদের চোখে ঘুম নামতো না। কখন দর্জি বানাবে তার শার্ট প্যান্ট- এই চিন্তায়? ছোটরা সব সসময় ঘুর ঘুর করতো দর্জি বাড়ির আশপাশে- কখন বানানো শেষ হবে তারটা? এই আনাগোনা ও অপেক্ষার ক্ষণকাল সবার চোখেই লেগে আছে মধুর স্মৃতি হয়ে। দুই একদিন আগে স্বপ্নের পোশাক হাতে পেয়ে ঈদের আনন্দ রঙিন হয়ে উঠতো আমাদের ছেলেবেলার ঈদ।

সকালে ছোট বড় সকলে মিলে পুকুরে বা নদীতে গোসল করে নতুন পোশাক পরে সেমাই খেয়ে দলে দলে দূরের কোন ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে যাওয়া। মনে হয় মেঠো পথে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি টুপি পরিহিত মানুষের মিছিল মিলিত হয়েছে কোন এক মোহনায়। তখন গ্রামে গ্রামে ঈদগাহ মাঠ ছিল না। কয়েকটি গ্রামের জন্য ছিল একটি ঈদগাহ মাঠ। গ্রামে গ্রামে ঈদগাহ এর প্রয়োজনীয়তাও মনে করত না। কারণ এই উপলক্ষে ঈদগাহে কয়েকটি গ্রামের লোক একসঙ্গে মিলিত হতে পারত। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে চলত কুশল বিনিময়। ঈদগাহ থেকে ফেরার পর প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, মিষ্টি মুখ করা। ছোটরা নতুন জামা কাপড় পরে দল ধরে এ বাড়ি সে বাড়ি বেড়াতে বের হতো। তাদের তো দশ/বার বাড়িতে না যেতে পারলে যেন ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হতো না। কোন কোন আত্মীয়স্বজন ছোটদেরকে দুই টাকা/পাঁচ টাকা ঈদের সালামি দিত। এই সালামি পেয়ে নিজেদেরকে অনেক সম্পদশালী মনে হতো। এই মূল্যবান সম্পদ আমরা অনেকদিন আগলে রাখতাম। টাকার গরম অনেক দিন থাকত।

আগের দিনে অনেক এলাকায় গ্রামের লোকজন সাধারণত গরিবদের ফেতরার টাকা না দিয়ে সমপরিমাণ খাবার চাল দিত। ঈদের দিন সকালবেলা ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পোঁটলা বেঁধে চাল সঙ্গে করে নিয়ে যেত। ঈদগাহ মাঠের চারপাশে ভিখারি ও গরিব লোকজন এই চাল নেয়ার জন্য কাপড় বিছিয়ে রাখত। লোকজন নামাজের পূর্বে সঙ্গে আনা চাল ওই কাপড়ের ওপর ছিটিয়ে দিত। ছোটরা এই কাজটি করতে খুব আনন্দ পেত।

তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ও স্যাটেলাইট টিভির প্রভাবে বর্তমানে ঈদ উদযাপনের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। আগে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ঈদকার্ড প্রেরণ বেশ জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে অফিস ও কর্পোরেট জগতে এর প্রচলন থাকলেও ব্যক্তি পর্যায়ে তেমন একটা নেই। এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার, ইমেইল বা মোবাইলের এসএমএস বা এমএমএস-এর মাধ্যমে। ঈদের আনন্দ আবর্তিত হয় ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটি পারলার ও শপিংকে কেন্দ্র করে। কেনাকাটাই যেন এখন ঈদের মূল আনন্দ। ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে আমাদের হাতের কাছে তাদের সেবা নিয়ে হাজির থাকে সবসমই স্কয়ার, মেরিল, ইউনিলিভার, রেকিট এন্ড বেনকিজার, ম্যারিকো বাংলাদেশ, প্রাণ, ব্র্যাক, ঈগলু, স্বপ্ন, বসুন্ধরা গ্রুপ, রূপ চাঁদা, মীনা বাজার, নন্দন, এসিআই, ওয়ালটন, স্যামসং, এলজি, বাটারফ্লাই, সিঙ্গারসহ দেশি বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠান।

নিজেকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকেই বিউটি পারলারগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। ফ্যাশন হাউসগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। কিশোরী-তরুণীর হাতে মেহেদি লাগানো সেকাল একাল দুই কালেই খুব জনপ্রিয়। মনে হয় তাদের হাতে আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। আনন্দ যেন হাতের মুঠোয় থাকে। তবে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন রংয়ের মেহেদি রেডিমেড পাওয়া যায়, হাতে লাগানোর সহজ উপায় আছে। কিন্তু সেকালে মেহেদি লাগানো ছিল অনেক কষ্টকর। তখন এই কষ্টকর কাজটিই ছিল ঈদ আনন্দের প্রধান আকর্ষণ। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সংগ্রহ করা হতো মেহেদি বা মেন্দির পাতা। তারপর রাতে একজন শিল পাটা নিয়ে মেন্দি বাটতে বসত। আর তাকে ঘিরে চারদিকে গোল হয়ে বাকিরা বসত। চলত গল্পগুজব, হাসি ঠাট্টা গান। মেহেদি প্রস্তুত হলে একটি ছোট কাঠি দিয়ে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা হতো বা চুন দিয়ে নকশা একে হাতের তালুতে মেহেদি ছাপ মেরে রাখা হতো। পরে দেখা যেত হাত লাল সাদা নকশা হয়েছে। নিজের, চাচাত ফুফাত, প্রতিবেশী ভাই বোনদের সঙ্গে মেহেদি লাগানোর সেই সময়টুকু যে কি মধুর ছিল!

কিন্তু যে ঈদের জন্য এত আয়োজন সেই ঈদের দিনে কি আগের দিনের মতো আনন্দ হয়? ঈদের দিনে দল ধরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়ানো গ্রামে কিছুটা থাকলেও শহরে এখন নেই বললেই চলে। সারাদিন অলস সময় কাটানোর পর বিকেলে বা সন্ধ্যায় শিশু পার্ক, এ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা আত্মীয়স্বজনদের বাসায় বেড়াতে বের হয় কেউ কেউ। ঈদের মাঠের আনন্দও সীমিত হয়ে গেছে। শহরে তো ঈদের নামাজ ও শুক্রবারের জুমার নামাজের পার্থক্যই বোঝা যায় না। কারণ মসজিদেই হয় ঈদের জামাত। কোলাকুলি করার জায়গা নেই। বড় ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়ে কয়জনে?

অবশ্য এখন ঈদের আনন্দ দিতে বা ঈদ আনন্দকে ঘরে বন্দী করতে ব্যস্ত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো। সপ্তাহব্যাপী প্রচারিত হয় ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। আধুনিক প্রজন্মের মেয়েরা ব্যস্ত থাকে ঈদের টিভি অনুষ্ঠানে নিজেদের মাতিয়ে। ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত মানুষের জন্য এই আনন্দ কম কি!

ঈদের অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা যাই থাকুক না কেন, ঈদের আনন্দ থাকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে, ধর্মীয় অনুভূতিতে। এই আনন্দে ছোট বড়, ধনীগরিব, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একাকার হয়ে যায়। এটাই ঈদের বড় মহিমা। ইসলাম ধর্ম মুসলমানদের যে কটি দিবসকে আনন্দ ফুর্তি করার জন্য নির্ধারন করে দিয়েছে তার প্রধানতম দিবসটি হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। তাই এ দিনের আনন্দও ইবাদাতের মধ্যে গণ্য। তবে এ আনন্দে অশ্লীলতার মিশ্রণ ঘটালে হিতে বিপরীতই হবে অর্থাৎ সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে।

যেহেতু পবিত্র ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ইসলামী দিবস তাই ঈদুল ফিতর আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে সেই ইসলামের গোড়া পত্তন থেকেই। আমাদের সমাজে ঈদের দিনে হরেক রকমের আয়োজন থাকে। বিশেষ করে পবিত্র রমজানের শুরু থেকে আরম্ভ হয়ে যায় ঈদ উদযাপনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি। তবে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ঈদের আচারানুষ্ঠান ও বর্তমান প্রজন্মের ঈদের আচারানুষ্ঠান তথা আনন্দ ফুর্তির মধ্যেও দেখা যায় বিস্তর ফারাক।

বিজ্ঞাপন

আমরা পাঁচ পুরুষ তথা লাক্কড় দাদার আমল পর্যন্ত ঈদ উদযাপন ও ঈদের ফুর্তি ফার্তির অনুসন্ধানে দেখতে পাই সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। সেই লাক্কড় দাদা থেকে পই দাদার আমল পই দাদা থেকে দাদার আমল এরপর বাপের আমল বাপ থেকে ছেলের আমল বা আমাদের আমল। আমাদের লাক্কড় দাদার আমল হিসেব করলে প্রায় একশ বছর পূর্বের আমল বা সময়কেই বলা যেতে পারে। তখন মানুষের জীবন যাত্রার মান ছিল খুবই সাদামাটা। মানুষ পদব্রজে হজে যেতেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেও পায়ে হেঁটে কিংবা ঘোড়া বা গাধাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে অভিজাত মহিলাদের ক্ষেত্রে সওয়ারী বা পালকী চড়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বিনা ভিসায় যাতায়াত করার প্রচলন ছিল সে সময়। দুর গন্তব্যে রওয়ানা দিতে হলে দু তিনমাস বা ছয়মাস হাতে রেখে রওয়ানা দিতে হতো। সে সময়ে তারা ঈদও উদযাপন করতেন নিতান্ত সাদামাটাভাবে। ঈদের জামাত আদায় এবং সাধ্যমতো কিছুটা বাড়তি খাবারের আয়োজনই ছিল বেশির প্রথম পাতার পর ভাগ মানুষের ঈদ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর পই দাদার আমলেও মানুষের মধ্যে সম্পদের পাহাড় গড়ার কোন চিন্তা চেতনা বা স্বপ্ন ছিলনা বিধায় জীবন যাত্রার মান ছিল নিতান্ত সাদামাটা। তবে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল খুবই বেশি। বন্ধুত্ব বা ইয়ারানা ধর্মীয় খেশি বা কুটুমিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে সিংহভাগ মানুষের জীবন যাত্রার মান সে সময়ও উন্নত না হওয়ায় এবং জীবন যাত্রার মান উন্নত করার তাগিদ তাদের মধ্যে তেমন একটা অনুভুত না হওয়ায় সে সময়কার ঈদও তারা পালন করতেন সাদামাটাভাবে। তবে পাড়া পড়শী ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার প্রবণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর দাদার আমল শুরু হলে সে সময় ঈদে সামর্থবান অনেকেই নতুন জামা কিনতেন। তবে সে সময় এতো ফ্যাশন ট্যাশনের প্রতিযোগিতা ছিলনা বিধায় পুরুষরা সাধারনত লুঙ্গি ধুতি গেঞ্জি আর মহিলাদের জন্য সুতি শাড়িই কেনা হতো।

ঈদের জামাতের পূর্বে ঈদগাহ বা মসজিদে রোজাভঙ্গকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হতো। অভিনব এসব শাস্তির মধ্যে ছিল কান ধরে উঠবস করানো, কলাগাছ কাঁধে করে সারা ঈদগাহ মাঠ বা মসজিদের চতুর্দিক প্রদনি করা এমনকি আগত মুসল্লিদের জোতাও বহন করানো হতো ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা পরিত্যাগকারীদের। শাস্তি প্রদানের পর তওবা করানো হতো এবং ভবিষ্যতে আর রোজা না ভাঙ্গার অঙ্গীকার নেয়া হতো।

বর্তমানে পিতার আমল থেকে শুরু করে ছেলের আমল চলছে। ঈদের আনন্দ ফুর্তিতেও এসেছে নতুনত্ব ও আধুনিকতার ছড়াছড়ি। পিতা বা দাদার আমলে সম্পূর্ণ দেশীয় যে পিঠা সন্দেশ তৈরী করা হতো তার আধুনিকায়ন হয়ে বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার পাতা থেকে রেসিপি দেখে তৈরী করা হয় পিঠা পায়েস। আর এসব পিঠা বা সন্দেশের নাম পরিবর্তন হয়ে ধারন করে অত্যাধুনিক সব নাম। আগের যুগে বিপ্তি বা উপরী কাপড়ের দোকান থেকে লুঙ্গি গেঞ্জি ও সুতি শাড়ি কেনার পরিবর্তে বর্তমানে গড়ে উঠা অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মার্কেট থেকে সদ্য আগত দেশী বিদেশী ডিজাইনের প্যান্ট শার্ট পাঞ্জাবী শেরওয়ানী ফতোয়া মোবাইল ড্রেস লেহেঙ্গা থ্রিপিছ শর্ট ড্রেস স্কার্ট বাহারী ডিজাইনের শাড়ি ইত্যাদি কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বর্তমানে নায়ক নায়িকা বা মডেল তারকাদের পরিধেয় বস্ত্র অনুসরন করে নতুন নতুন ডিজাইন আমদানি করার প্রতিযোগিতাতো আছেই। অনেক অভিজাত পরিবারের লোকেরা পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে যেতেও দেখা যায়। আর এখনকার বাংলাদেশে ভারতীয় এবং পাকিস্তানী কাপড়ের চাহিদা বেড়ে গেছে অনেক। ঈদের কাপড় কিনতে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন বিদেশী পোশাক।  তবে আমাদের দেশীয় পোশাক এবং ঐতিহ্যের স্বার্থে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সবাইকে। বিদেশী ফ্যাশন এবং কাপড়ের পরিবর্তে বেছে নিতে হবে আমাদের দেশীয় পোশাক।

আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি বেড়ানোর প্রবণতা কমিয়ে বর্তমানে পার্ক অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্ট কফি বার পিকনিক বা বিনোদন স্পটে ভিড় করতে দেখা যায় বেশি। এছাড়া আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়ানোর পরিবর্তে অনেকেই ঘরে বসে বিভিন্ন চ্যানেলের ঈদ অনুষ্ঠান উপভোগেই বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকেন। আত্মীয় স্বজনদের বাড়ী বেড়ানোর বদলে রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতেই বেশি ভিড় করতে দেখা যায়। রাজনৈতিক নেতারাও নিজ নিজ বাড়িতে কর্মী সমর্থকদের জন্য গরু জবাই করে ভুড়িভোজের আয়োজন করার সংস্কৃতি গত ক’বছর থেকে বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। এছাড়া আগের দিনে ঈদ কার্ড ডাকযোগে প্রেরণের যে একটা রেওয়াজ ছিল তা বর্তমান ডিজিটাল যুগে হ্রাস পেয়ে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইমেইলসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে এসে ঠেকেছে। ঈদের দিনে বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়দের সাথে ফোনালাপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে চেটিং বেড়েছে বর্তমান যুগে। পায়ে ধরে মা বাবাসহ গুরুজনকে সালাম করার প্রবণতা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। কেহবা পাহাড়সম অট্টালিকায় বসে এয়ারকুলারের বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে ডিসের মাধ্যমে বিনোদনে মত্ত আবার পাশের বাড়িতে তার আত্মীয় বা পড়শী নতুন জামা কেনা দুরের কথা জঠর জ্বালায় দুমোটো ভাতও জোগাড় করতে পারছেনা, এ ধরনের দৃশ্য বর্তমান সমাজে চোখে পড়ার মতো। কিছু কিছু শিল্পপতি পত্র পত্রিকা বা মিডিয়ায় কভারেজ পাওয়ার জন্য জাকাতের কিছু নিম্নমানের মোটা সুতার কাপড় বিতরন করতে পত্রিকার পাতায় দেখা যায় এবং সাথে সাথে এও দেখা যায় যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে কিংবা শিল্পপতির স্বেচ্ছাসেবকদের লাঠির আঘাতে নিহত বা আহত হওয়ার সংবাদ। বর্তমান যুগে ঈদকে সামনে রেখে বেড়ে যায় চাঁদাবাজি। অফিস আদালতের কর্তারা ঈদের দোহাই দিয়ে বাড়িয়ে দেন ঘুষের রেট আবার অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে বাড়িয়ে দেন পণ্যের মুল্য। বর্তমানে অনেকেই পাড়া বা মহল্লার মসজিদ বা ঈদগাহের পরিবর্তে জেলা সদরের বড় ঈদগাহ মাঠ বা বাংলাদেশের বৃহত্তম ঈদগাহ মাঠে গিয়েও ঈদের জামাত পড়তে দেখা যায়। তবে এতে পড়শীদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করা সম্ভব হয়না। আবার কোথাও কোথাও কুলাকুলি করার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে বিভিন্ন কারণে।

বর্তমানে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে কর্মী সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাতেও দেখা যায় রাজনৈতিক বা সামাজিক অনেক নেতা পাতিনেতাকে। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে ঈদকে উপলক্ষ করে নেতাদের কর্মতৎপরতা ব্যাপকহারে বাড়তে দেখা যায়। তখন শুরু হয় ভোটারদের মোবাইল নাম্বার অনুসন্ধানের হিড়িক। অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করা হয় ভোটারদের নামে এসএমএস পাঠাতে। তবে নির্বাচনের পরে অনেকেই ভুলে যান ভোটারদের কথা। তখন বেড়ে যায় চাটুকারদের কদর।

এছাড়াও হাল জমানার ঈদ ও আগের জমানার ঈদে আরও যথেষ্ঠ ব্যবধান রয়েছে যা আমাদের প্রবীণ মুরব্বীয়ানদের সাথে আলাপ করলে জানা যায়। তবে এবারের ঈদ উৎসবের সাথে আরেকটি বাড়তি আনন্দের উৎসব যোগ হয়েছে বাঙালির জীবনে আর তা হলো রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮। ফুটবল বলতে বাঙালি এবং বাংলাদেশের মানুষ অজ্ঞান। খেলাধূলার মধ্যে ফুটবল বাঙালির সবচেয়ে প্রথম প্রেম। হাল আমলে ক্রিকেট বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয় খেলা এবং সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গৌরব অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেকেটারদের এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। যা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের উজ্জল ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। ক্রিকেটের এই আনন্দের সাথে সাথে বাঙালি কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল এই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ঘরে ঘরে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার জার্সি এবং জাতীয় পতাকা আর বাড়িতে বাড়িতে উড়ছে দুই দেশের পতাকা। এই সময় সারাবিশ্বের মানুষের মত বাংলাদেশের মানুষের চোখও থাকবে টিভি পর্দায় বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের দিকে। তাই এবারে ঈদের টিভি অনুষ্ঠানগুলো অনেক ম্লান থাকবে বিশ্বকাপের দাপটে একথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। তবে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং টিভি অনুষ্ঠানের সাথে সাথে সিনেমা পাগল মানুষেরা কিন্তু ছুটবেন সিনেমা হলে পরিবার পরিজন নিয়ে।

রকেটের নিয়মিত সব যাত্রীর সঙ্গে উঠে পড়েছে এক ফার্স্ট ক্লাস যাত্রী আতিক। ব্যবসায়ী আতিক নিজের কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে টাকা পাওয়ার জন্য। আগুনের ঘটনা যখন সারা দেশের মূল খবরে পরিণত হয় তখন সে মংলায় বন্ধুর বাসায় আত্মগোপন করার জন্য স্টিমারে ওঠে। অন্যদিকে কারখানার আগুনে পোড়া এক নারী কর্মীর লাশ নিয়ে স্বামী মনসুরও একই স্টিমারের যাত্রী হয়। এমন একটি গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে কমলা রকেট। যার উল্লেখযোগ্য নিয়ে নির্মিত আকর্ষণীয় ট্রেলার প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি। যা সুন্দর গল্পের পাশাপাশি সুনির্মাণের আভাস দিল। সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন নূর ইমরান মিঠু, যিনি ছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পিঁপড়াবিদ্যার মূল অভিনেতা। কমলা রকেট প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। মুক্তি পাবে ঈদুল ফিতরে। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের মৌলিক ও সাইপ্রাস নামের দুটি গল্প অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য করেছেন শাহাদুজ্জামান ও মিঠু। কমলা রকেট এ আতিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৌকীর আহমেদ। দালাল হয়েছেন মোশাররফ করিম। আরো অভিনয় করেছেন জয়রাজ, শহীদুল্লাহ সবুজ, সুজাত শিমুল, সামিয়া সাঈদ, সেওতি, বাপ্পা শান্তনু, ডমিনিক গোমেজ ও আবু রায়হান রাসেল।

ঈদুল ফিতরে মুক্তির সবুজ সংকেত ইতিমধ্যে পেয়েছে হার্টবিট প্রডাকশনের আলোচিত সিনেমা সুপার হিরো। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড সদস্যরা সুপার হিরো দেখেছেন। সবাই বিনা কর্তনে ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটি। সুপারহিরো পরিচালনা করেছেন আশিকুর রহমান। সিনেমাটির প্রধান দুটি চরিত্রে আছেন শাকিব খান ও শবনম বুবলি। আরো অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, শম্পা রেজা, টাইগার রবি ও সিন্ডি রোলিং। শোনা যাচ্ছে, বিশেষ একটি চরিত্রে আছেন তাসকিন রহমান।

এবারের ঈদুল ফিতরের অতিচর্চিত সিনেমা পোড়ামন ২। হিট সিনেমার সিক্যুয়াল হিসেবে নয়- গল্প, নির্মাণ, প্রচারণার ধরন, পরিচালনা, অভিনয়শিল্পী নির্বাচন এই আলোচনার অংশ। পোড়ামন ২ এর গল্প নিয়ে সামান্য আভাস পাওয়া গেছে টিজার, ট্রেলারে। গ্রামীণ আবহের সেই গল্প আগ্রহ জাগানিয়া। সিনেপর্দায় ধনী গরীব বৈষম্য ক্লিশে মনে হলেও বাস্তবে নিশ্চয় এ ভেদ মুছে যায়নি। সেই গল্পটা নতুনভাবে বলা যেতে পারে। এর ভিন্ন ভিন্ন জার্নিও থাকতে পারে। পোড়ামন ২ সেই স্বপ্ন দেখায়। পরিচালক রায়হান রাফি বলছেন, এই গল্প শতভাগ মৌলিক। পৃথিবীর কোনো দেশের সিনেমার সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে না। এছাড়া পোড়ামন যে একটা ব্র্যান্ড অস্বীকার করা যাবে না। গল্পে নায়ককে দেখানো হয়েছে সালমান শাহর ভক্ত হিসেবে। যা ইতোমধ্যে সালমান ভক্তদের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। এটা নির্মাতার সুকৌশলী পদক্ষেপ। অভিনয়শিল্পী নির্বাচনে চতুর সিদ্ধান্ত নির্মাতার। সিয়াম আহমেদ ছোটপর্দার হালের ক্রেজ। ভালো অভিনয়ও করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে তা স্বাক্ষর দেখা গেছে। অন্যদিকে এক সিনেমার নায়িকা পূজাকে নিয়ে দর্শক আগ্রহের অন্ত নেই। সহজ সরল, পাশের বাড়ির লুক আছে তার। অন্যদিকে বাপ্পারাজকে নিয়ে অনেকের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। আছেন আনোয়ারা, ফজলুর রহমান বাবুর মতো পরীক্ষিত অভিনয়শিল্পী। চোখে পড়েছেন সাঈদ বাবুও। প্রেমের গল্পে গান অপরিহার্য অঙ্গ। পোড়ামন ২ এও থাকছে কিছু গান। এর মধ্যে সালমান শাহকে উৎসর্গ করা গানটি হাইপ তুলেছে, যদিও গানটির কথা সুর গড়পরতা মানের। তবে দৃশ্যায়ন হৃদয় ছুঁয়েছে। ভালো লেগেছে ও হে শ্যাম গানটি। নিঃসন্দেহে বছরের অন্যতম সেরা গান হতে যাচ্ছে। এছাড়া গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সুতো কাটা ঘুড়ি শুনতে বেশ। সব মিলিয়ে ভালোমানের মিউজিক স্কোর থাকছে।

এইসব চলচ্চিত্র ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র রিলিজ করছে এবারের ঈদে। ডিজিটাল ঈদের আনন্দের সাথে ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা টিভি অনুষ্ঠানের হাতছানির সাথে সামাজিক যোগাযোগ সাইট, অনলাইন মাধ্যম ফেসুবক আর টুইটারের হাতছানিতে ভরপুর হয়ে উঠুক সবার ঈদ আনন্দ। ঈদ মোবারক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)