চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টোকাই সেলিব্রেটি আর জালিয়াত তারকা বনাম তারুণ্য

বিচিত্র প্রাণীগুলি এখন রাতারাতি সেলিব্রেটি হতে চায়। দেশে এটেনশন আর প্রবাসে এসাইলাম শিকারদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য। দেশে অনেকে চেতনার মহাজাগতিক ব্যবসা করেন। এরাই আবার বিলেতে-ইউরোপে এসে বিএনপি-জামায়াত সেজে এসাইলাম নিয়ে দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ভিক্ষার টাকায় দিনযাপন করেন। সে টাকায় নিরাপদ দূরত্বে থেকে নিশ্চিন্ত দিনযাপন করেন, আর ফেসবুকে করেন ‘আদর্শ আর চেতনার বিপণন চর্চা।’

বিজ্ঞাপন

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো জাল করে অনলাইনে ইঁদুরের ফাঁদে আটকেছে তারুণ্যের মোটিভেশন বক্তা নামধারী চাপাবাজ ঠিকাদার। ধরা খাওয়া চোরের মুখে তারুণ্যের করুণা ইভটিজার-বাস কন্ডাক্টরকেও হার মানিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন সেলিব্রেটি হবার হিড়িক। পর্ন তারকা সাজতে গিয়ে অবশেষে আত্মহননে মুক্তি খুজঁছে ফলোয়ার বাড়াতে উন্মুখ বালিকা। ইউটিউব দেখে বক্তৃতা শেখা টকবাজরা কাপিঁয়ে বেড়াচ্ছে টক-শোর ময়দান। অন্যের অনুকরণে, চৌর্যবৃত্তিতে উৎপন্ন হচ্ছে হাইব্রিড ইউটিউবার। কম পরিচিত লেখকের লেখা চুরি করছেন ভেরিফায়েড লেখক। তারকা সাংবাদিক অন্যের লেখা চুরি করে থিসিস বানাচ্ছেন। ধরা খেয়ে চোরের মায়ের বড় গলায় চৌর্যবৃত্তিকে গবেষণায় জাস্টিফাই করার জন্য ছাপা-ছাপি নয়তো বোকাবাক্সে গলাবাজি করছেন। অনলাইনের সংক্রমণে সাংবাদিকতার বানান না জানা ধান্দাবাজরা সরাসরি সম্পাদক সেজে অাভির্ভূত হচ্ছেন। অন্যের গান-সুর-গল্প-চিত্রনাট্য চুরির চামারি চলছে হরে-দরে।

ছাগল পিটিয়ে মানুষ বানাবার মহতি সংগ্রামের ঐতিহ্য অামাদের! নেতা-নেত্রীরা নিজেদের অকাল কুষ্মাণ্ড পুত্রধনদের গৃহশিক্ষক রেখে রাজনীতিবিদ বানাচ্ছেন! তাদের হাতেই নাকি নিরাপদ হবে দেশ! দুই নেত্রীর উপাধিগুলো লিখে দেয়া একই ব্যক্তি দেশের সভাকবি। চাটুকার, চটিবাজ, ভাঁড়, সুবিধা কানা বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা প্রণোদনা নিয়ে বুদ্ধিজীবি সাজছেন।

গুটিবাজ বর্ণচোরারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সমানে বলে যাচ্ছে মুখস্ত স্লোগান। দেশপ্রেমের গালভরা বুলি, ভিশন মিশন নিয়ে জনগণের সাথে টি-টোয়েন্টি খেলতে নামছেন রাজনীতিজীবি প্রাণীরা। ছিনতাইয়ের দৌরাত্ম্য এখন স্কুল শিশুদের অান্দোলনের কৃতিত্ব ছিনতাই অবধি নেমেছে। ন্যায়হীনতার প্রতি ঘৃণার বিস্তৃতি এখন বাচ্চাদের কোমল চোখের অশ্রুতে-ক্ষোভে।

ফেসবুক লাইকইয়াবাখোররা ধরা খাচ্ছে উদ্বুদ্ধকরণ বক্তা, শিল্পী, মাদকবিরোধী অান্দোলনের রুপকার সাজতে গিয়ে। চটুল চোরাই সংলাপে, টুকলিফাইড লেখা-থিম ভেরিফায়েড পেইজে দিয়ে সেলিব্রেটি হতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে বিকৃতমনা চোরের দল। লাইক-কমেন্ট করতে রীতিমত লোকবল নিয়োগ দেয়া সেলিব্রেটিরা একসময় হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ, দেবার মতো, মনে রাখাবার মতো মৌলিক কনটেন্ট সৃষ্টির মৌলিক স্বাতন্ত্র তাদের নেই।

গানটাও এখন অার শোনার বিষয় নেই। ইউটিউবের ভিউ যখন শিল্প অার শিল্পীর উচ্চতা মাপার ফিতে হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন একটা হিট গানের পর হারিয়ে যাচ্ছে রাতারাতি তারকারা। সিংহভাগ লেখক কবি ভূল বাক্যে নিজেদের বইয়ের রিভিউ লেখাচ্ছেন, নিজ খরচে অাত্ম-প্রসাদে চালাচ্ছেন ছাপাছাপি। বইমেলার মাঠে এসব লেখক পরিচিত পাঠকদের নিজেদের বই গছাতে প্রাণান্তকর সংগ্রামের মাধ্যমে পাঠককে ধন্য করছেন। অার স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে মানুষকে বইমুখী করা হুমায়ুন অাহমেদের মতো পাঠকপ্রিয় লেখকদের সমালোচনার বিকৃতি ছড়াচ্ছেন।

সম্মান, ভালবাসা লাইকের দামে কিনতে যাওয়া তারকা ধরা খাচ্ছেন জনগণের হাতে। পেজে লাখ লাখ লাইক, অথচ ভোটে দাড়াঁলে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা হাজার পেরোচ্ছে না। হাইব্রিড তারকাদের ষ্টেজ প্রোগামে দর্শকরা অর্ধচন্ত্র দেখছেন হরদম। অামাদের মত সাধারণ পাবলিকদের তামাশা দেখে যেতে হচ্ছে, অগত্যা বিকল্প না থাকায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ভেসে চলেছে নিয়ন্ত্রিত সময়ে নিয়ন্ত্রক পরিচালিত উন্নয়নের বাধঁভাঙ্গা জোয়ারে। পেশাজীবিরা ক্ষমতার চাটুকারিতায় সুবিধা খুজঁতে মরিয়া।

বিজ্ঞাপন

‘বুস্ট দেয়া’ সম্মান অর্জন করার চেয়ে, অাত্মসন্মান নিয়ে, ধরে রেখে বেচেঁ থাকাটা অনেক কঠিন। মগজে, মননে অতখানি পুষ্টি অার অায়োডিনহীনতা নিয়ে সেলিব্রেটি হওয়া যায় না। নিজের ও তো কিছু পুজিঁ থাকতে হয়। অভিনয় দিয়ে, সঙ সেজে, অনুকরণের বোল-চালে উদাহরণীয় হওয়া যায় না। উল্টো মাঝখান থেকে তারা অাত্মপ্রতারণার ফাঁদে জীবনটাই হারায়।

ব্যর্থতার ভার বয়ে ক্লান্ত ভণ্ডরা জীবনের শেষ চেষ্টা হিসেবে ‘মানুষ’ হবার অাগে সেলিব্রেটি হবার পথ খুজঁছেন। কিন্তু, সবকিছু ডাউনলোড করা গেলেও ‘অভিজ্ঞতা’ টা ডাউনলোড করা যাচ্ছে না। কথার ফুল-ঝুরি, ভণ্ডামির বেচাকেনায় প্রজন্মকে প্রেরণা দেয়া যায় না। কিছুটা হলেও তো করে দেখাতে হয়।

নেতা সাজতে অাসা অভিনেতারা অাটকে যাচ্ছেন জনতার চোখে।

যাদের যেখানে থাকবার কথা, তারা সেখানে নেই। অার এ শূন্যতার সুযোগে সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতির অঙ্গনে ভর ও দখল করেছে ভাড়েঁরা।

ব্যতিক্রম যে নেই, তা বলছি না। কিন্তু ব্যাতিক্রমের ক্ষমতা কি ক্ষমতা থাকে যাপিত বাস্তবতা অতিক্রম করবার! তবে একই সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে; জালিয়াত, স্টান্টবাজদের ভীড়েও ভালো কাজ হচ্ছে। সংখ্যায় স্বল্প ভালোগুলো থাকবার কারণেই, রদ্দি মালগুলোকে অালাদা করা যাচ্ছে।

অাশার কথা, চোরাই জালি মাল, কপি-পেস্ট ক্রিয়েটররা ধরা খাচ্ছে জনতার হাতে। ধরিয়ে দিচ্ছে কিন্তু অাজকের বাংলাদেশের তারুণ্যই। জালিয়াতির জালের বাইরেও সত্যের, সুন্দরের, শিল্পবোধের চর্চা অনুরিত হচ্ছে। ঘৃণা অার বিদ্বেষ অার নিন্দার সময়ে ন্যায়ের দীপ্যমান বাতিটি ধরে রেখেছে কিন্তু প্রজন্মই।

ইউটিউবসম্ভাবনার দেউটিতে অাশার এখনো জ্বলতে থাকা বাতিটি হল, অামাদের তারুণ্য এখনো ‘ইয়েসম্যান’ হয়ে যায়নি। তারা এখনো ন্যায়হীনতার বিরুদ্ধে না বলতে জানে। ছাত্রদের সাম্প্রতিক অান্দোলন অামাদের সে বার্তাটিই দিয়েছে। মূল্যবোধ, মানবতা এখনও কেবল ফেসবুকের স্ট্যাটাসে, রাজনীতির নীতিহীনতায় ভাসমান নয়, তারুণ্যের বুকের পাজরেও বেচেঁ অাছে। এই দুর্মূল্যের বাজারে এখনো সবকিছু পণ্য হয়ে যায়নি। উকিঁ-ঝুকি দেয়াটা নয়, টিকে থাকাটাই অার্ট।

খ্যাতির মরিয়া লালসায় ক্ষণিকের তারকা সাজার ভিউয়ার, ফলোয়ার উন্মুখ দুপুরের শেষে সন্ধ্যা অাসে। রাত শেষে অপেক্ষায় খাকে নতুন সকাল। মেধার অালোধারায় বোধ আর ভালবাসা অনুরণিত হোক আমাদের ভেতরের আকাশে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)