চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘টাকলু’ বলায় ছাত্রত্ব বাতিলের (অ)যৌক্তিক কিছু কারণ

সাম্প্রতিক বিষয়ে একটি স্যাটেয়ার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে টাকলু বলায় সাত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টা কি আসলেই সমালোচনা করার মতো? এর পিছে যৌক্তিক কিছু কারণও তো থাকতে পারে:

টাকলা কেন বলল না?
টাক‘লু’ শব্দটা কেমন যেন। ফেসবুকের জামানায় ‘লু’ মানেই তো লুল। আর আগে লু বললে মানুষ বুঝতো ‘লু হাওয়া’। ফলে শিক্ষার্থীরা টাকলু বলতে ‘লুল’ না ‘লু হাওয়া’ বুঝিয়েছে তা নিয়ে বেশ কনফিউশন তৈরি হয়। তারচে বরং ‘টাকলা’ বললেই ভালো হতো। টাকলা বলতে সবার চোখে ভাসে একটি নাম। ‘মুরাদ টাকলা’। ফেসবুক সেলিব্রেটি। ছাত্রদের টাকলা বলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন টাকলু বলল? কাকে কী নামে ডাকতে হবে সেটাও যে ছাত্র জানে না তার ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার দরকার কী?

ছাত্রদের সৃজনশীলতার পথ দেখাতেই এই বরখাস্ত:
শিক্ষককে টাকলু ডাকায় সাত ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আসলে তা না। শিক্ষককে এমন সৃজনশীল নামে ডাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পেরেছে এই সাত ছাত্র খুব মেধাবী ও সৃজনশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু সৃজনশীলতা চর্চার তেমন সুযোগ নেই। পুঁথিগত বিদ্যাই ভরসা। সেহেতু ছাত্রদের ছাত্রত্ব বাতিল করে সৃজনশীলতার পথ দেখানোই এই বরখাস্তের লক্ষ।

বিদ্রোহী কবিতার অভাব:
কাজী নজরুল ইসলাম সেই কবে বিদ্রোহী কবিতা লিখে গেছেন। তারপর কতবছর পেরিয়ে গেল, আর কোনো বিদ্রোহী কবিতার দেখা নাই বাংলা সাহিত্যে। বুদ্ধিমান মানুষ একটু চিন্তা করলেই দেখবেন, কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবিতা লিখেছিলেন কোন প্রেক্ষাপটে? জেল, জুলুম, বরখাস্তের প্রেক্ষাপটে না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন একটা সিচুয়েশন সৃষ্টি করলো। বরখাস্ত হওয়া ছাত্ররা মনের ক্ষোভ ঝাড়তে কবিতার আশ্রয় নিলেই বাংলা সাহিত্য পেয়ে যাবে ‘আমি টাকমাথা করে দেব চুল পূর্ণ’ টাইপ ঝাঁঝালো কোনো কবিতা।

ব্যক্তিগত নাম আর অফিসিয়াল নামের পার্থক্য বোঝানো:
সাত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাদের একটা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষা না দিলে ছাত্ররা বুঝতো না কোন নামে শিক্ষার্থীদের ডাকা উচিত আর কোন প্রেয়সীর জন্য রেখে দেওয়া উচিত। ‘টাকলু’ নামক আদুরে ডাক কি শিক্ষার্থীর মুখে মানায়?

বিজ্ঞাপন

মুরুব্বিদের নাম নেওয়া নিষেধ:
বাঙালি সমাজে মুরুব্বিদের নাম নেওয়া নিষেধ। মানব শরীরে টাক-ই সবচে বড় মুরুব্বি। ছাত্ররা সেই মুরুব্বির নাম নিয়েছে। সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় এটা অনেক বড় দুষ্টুমি। আর দুষ্টুমি করলে শাস্তি দেওয়ার অধিকার তো আছেই।

সমস্যা অন্যখানে:
সবাই ভাবছে শিক্ষক রাগ করে ছাত্রদের বহিষ্কার করিয়েছেন। আসলে তা না। সমস্যা অন্য জায়গায়। এই শিক্ষককে কেউ নাম দেয়নি। ফলে একটি গান তার খুব প্রিয়। অর্ণবের ‘তুমি তাদের নাম দিলে না’। হঠাত সাত শিক্ষার্থী তাকে নতুন নাম ‘টাকলু’ দেওয়ায় প্রিয় গানটা আর শুনতে পারবেন না। অভিমান গিয়ে গুনগুন করে গাইতে পারবেন না ‘তুমি তাদের নাম দিলে না/ মনের ভুলে কেউ দিলো না/ তোমার দেওয়া আমার কোনো/ নাম ছিলো না ছিলো না’। গানটা তার এতই প্রিয় যে এটা না শুনতে পারলে তার ভীষণ মন খারাপ হবে। কী দরকার মন খারাপ করার? তারচে ভালো ছাত্রদের বহিষ্কার করে দেয়া।

শিক্ষার্থীদের গুনাহ থেকে বাঁচানো হয়েছে:
ধর্মমতে কারও নাম বিকৃত করা গুনাহ। ছাত্ররা শিক্ষককে ‘টাকলু’ ডাকার মধ্য দিয়ে নাম বিকৃত করছিল। যা কবিরা গুনাহের শামিল। ছাত্রদের গুনার হাত থেকে বাঁচাতেই ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। খালিচোখে ছাত্রদের ক্ষতি মনে হলেও আখেরে কিন্তু তাদেরই লাভ হয় এমন কাজ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

একটি উগান্ডার গল্প:
সবশেষে নাম নিয়ে উগান্ডার একটি বেনামি গল্প। উগান্ডার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে ‘টাকলু’ ডেকেছে। উগান্ডার শিক্ষকদের আবার হেব্বি ক্ষমতা। শিক্ষকও টাকলু ডাকা সব শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করে দিয়েছে। শিক্ষক বাসায় এসে এই ঘটনা খুব আনন্দ নিয়ে স্ত্রীকে বলছে। এক ঝাঁক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা যেমন তেমন ক্ষমতার কাজ না। তিনি যে এত এত ক্ষমতার মালিক স্ত্রীর জানা উচিত। কেননা স্ত্রী মাঝে টাক নিয়ে মস্করা করে। শিক্ষকের স্ত্রীর আবার কথা বলা পাখির খুব শখ। ড্রইংরুমে বিশাল খাঁচায় অনেক বড় একটা কাকাতুয়া পুষতেন। উগান্ডার শিক্ষক যখন গল্পটা স্ত্রীকে গল্পটা বলছিলেন কাকাতুয়া কান খাড়া করে সব শুনে ফেলছিল।

পরদিন সকালে শিক্ষক বাসা থেকে বের হওয়ার সময় কাকাতুয়া বলে উঠলো, ‘গুড মর্নিং টাকলু’! শিক্ষক বিব্রত হলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। হাজার হোক স্ত্রীর প্রিয় পাখি। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময়ও কাকাতুয়া বলে উঠলো ‘গুড ইভনিং টাকলু’। ভারী বিপদ। শিক্ষক ভুলেও আর কাকাতুয়ার খাঁচার দিকে যান না। রাতে দেখা গেল কাকাতুয়া চেঁচামেচি শুরু করেছে। কেননা প্রতি রাতে শিক্ষক ও তার স্ত্রীকে ‘গুড নাইট’ বলা শেখানো হয়েছে। চেঁচামেচি শুনে শিক্ষকের স্ত্রী কাকাতুয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, সমস্যা কী? চিৎকার করছো কেন? কাকাতুয়া বলল, স্যারকে তো গুড নাইট বললাম না। তিনি আমার কাছে এলেনই না। আমার গলায় তো গুড নাইট আটকে আছে।

স্ত্রীর জোরাজুরিতে শিক্ষককে কাকাতুয়ার সামনে আসতে হলো। কাকাতুয়া খুবই স্বাভাবিকভাবে বলে উঠলো ‘গুড নাইট টাকলু’। শিক্ষককে বিব্রত হতে দেখে স্ত্রী বললেন, আরে এত বিব্রত হচ্ছো কেন? ও তো কোনো মানুষ না। তোমার ছাত্র না। ও পাখি। কাকাতুয়া। একটা পাখি টাকলু বললেই কী আর চুলওয়ালা বললেই কী?
শিক্ষক আশ্বস্ত হতে পারলেন না। বিরক্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলেন। সকালেও শুনতে হলো একই কথা। উগান্ডার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক স্ত্রীকে আচ্ছা মতো বকাঝকা করলেন। বেয়াদব পাখিটাকে উচিত শিক্ষা দিতে স্টোর রুমের তীব্র গরমে এক সপ্তাহ রেখে দিতে বললেন। এক সপ্তাহ স্টোর রুমে পাখিকে আটকে রাখা হলো। অনাহার-অর্ধাহার ও গরমে পাখির তো মর মর অবস্থা। শিক্ষকের স্ত্রী কাকাতুয়াকে খুব করে বোঝালেন। আজেবাজে কথা বলতে নিষেধ করলেন। তারপর নিয়ে এলেন আগের জায়গায়। ড্রইংরুমে। কাহিল হয়ে যাওয়া পাখির দিকে তাকিয়ে শিক্ষক মুচকি হাসেন। জব্বর শায়েস্তা হয়েছে।

পরদিন সকালে সেই শিক্ষক সেজেগুজে বের হচ্ছিলেন। তাকে দেখেই ডাক দিলো কাকাতুয়া। স্যার এদিকে আসেন। টাকলু না ডেকে স্যার ডাকায় তিনি খুব খুশি হলেন। খুশি মনে এগিয়ে গেলেন খাঁচার কাছে। কাকাতুয়া বললো, ‘বুঝতেই তো পারছেন’।

তবে যৌক্তিক-অযৌক্তিক যাইহোক, টাকলু ডাকা যে কখনও কখনও মোটেও নিরাপদ না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ঘটনার পরে জাতি তা বুঝতে পেরেছে।