চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জর্জ ফার্নান্দেজ: রাজনীতির নায়ক থেকে খলনায়ক

ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা চলার সময় টানা ২০ দিনে ভারতজুড়ে রেল ধর্মঘট করে আলোচনা-সমালোচনার সব আলো নিজের দিকে টেনে এনেছিলেন তিনি। তেহেলকা ডটকমের স্টিং অপারেশনের পর পদত্যাগে বাধ্য হওয়া সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ দেশটির রাজনীতির এক বর্ণময় চরিত্র। নায়ক থেকে শেষ পর্যন্ত খলনায়ক হয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে। 

বিজ্ঞাপন

৮৮ বছর বয়সে মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কার্গিল যুদ্ধে নিহত সেনাসদস্যদের কফিন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এ শ্রমিক নেতা। ১৯৩০ সালের ৩ জুন কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোরের এক ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

বাবা জন জোসেফ ফার্নান্দেজ ছিলেন বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা। মা অ্যালিস ফার্নান্দেজ ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জের অনুরাগী। এ কারণেই নিজের ছয় সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম মা রেখেছিলেন জর্জের নামে।

১৯৪৮ সালে জর্জের বাবা এবং মা তাকে বেঙ্গালুরুতে পাঠিয়েছিলেন যাজক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে। কিন্তু পরের বছরেই তৎকালীন বোম্বেতে গিয়ে শ্রম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে অন্যতম শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠেন জর্জ ফার্নান্দেজ।

এই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্য দিয়েই রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি৷ এছাড়াও সাংবাদিকতা ও কৃষিবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন ফার্নান্দেজ৷

১৯৬৭ সালে তার সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ওই বছর দক্ষিণ মুম্বাই থেকে কংগ্রেস নেতা এস কে পাটিলকে হারিয়ে প্রথমবার লোকসভার সদস্য হন জর্জ ফার্নান্দেজ। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মোট ৯ বার লোকসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে শেষবার রাজ্যসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

ফার্নান্দেজ ১৯৭৪ সালে রেল ধর্মঘটের নেতৃত্বে ছিলেন। অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেনস ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর মুরারজী দেশাই মন্ত্রিসভায় জর্জ ফার্নান্দেজ ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী৷ বিনিয়োগ সংক্রান্ত গোলমালের জেরে মার্কিন সংস্থা আইবিএম ও কোকাকোলাকে দেশ থেকে চলে যেতে বলেছিলেন তিনি। ১৯৮৯-৯০ সালে ভিপি সিং মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।জর্জ ফার্নান্দেজ-সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী-ভারত

১৯৯৮-২০০৪ সাল পর্যন্ত অটল বিহারী বাজপেয়ী মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ এ সময়ই কার্গিল যুদ্ধ হয়৷ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধের অভিযোগ আনে ভারত। তার সময়ই পোখরানে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় দেশটি৷

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও তথ্য সম্প্রচার, শিল্প এবং রেল মন্ত্রণালয়ের অস্থায়ী দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম প্রবল বিরোধী মুখের মধ্যে জর্জ ছিলেন অন্যতম। সেই সময় তিনি ভারতে সমতা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞাপন

জর্জ ফার্নান্দেজ শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। অটল বিহারী বাজপেয়ীর অন্যতম সহযোদ্ধাও ছিলেন তিনি।

বিতর্ক-কেলেংকারি
ভারতের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিককে নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম ব্যারাক মিসাইল ও কফিন কেলেঙ্কারি।

ব্যারাক মিসাইল কেলেঙ্কারি ছিল ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এর বিরুদ্ধে ইসরাইল থেকে ভারত সরকারের ব্যারাক ওয়ান মিসাইল সিস্টেম কেনা নিয়ে একটি দুর্নীতি মামলা। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই মামলাটির তদন্ত করে সমতা পার্টির সাবেক ট্রেজারার আর কে জৈনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।

২০০১ সালে ভারতের প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী তেহেলকা ‘অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড’ নামে একটি স্টিং অপারেশন শুরু করে।জর্জ ফার্নান্দেজ-সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী-ভারত

ওই অভিযানে দেখা যায় তৎকালীন প্রতিরক্ষা বিষয়ক বেশ কয়েকটি চুক্তিতে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। তেহেলকার ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ছড়িয়ে পড়ে কেলেঙ্কারির খবর। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ওই সময় তেহেলকার বিরুদ্ধে ‘বিভ্রান্তিকর ও সাজান তথ্য-প্রমাণ তৈরির জন্য’ ব্যবস্থা নিতে সিবিআইয়ের কাছে দাবি জানিয়েছিল।

২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর দায়ের করা ওই মামলার এফআইআর-এ জর্জ ফার্নান্দেজ, জয়া জেটলির মতো রাজনীতিক ছাড়াও সাবেক নৌ কর্মকর্তা সুরেশ নন্দের মতো বড় বড় ব্যক্তিদের নাম ছিল। কিন্তু সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে টানা তদন্ত চালানোর পরও দুর্নীতির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ না পেয়ে ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সিবিআই মামলাটি বন্ধ করে দেয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন ২০০২ সালে কফিন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত করা হয় জর্জ ফার্নান্দেজকে। অভিযোগটি ছিল: কার্গিল যুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাদের মরদেহ বহনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০টি অতি নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়ামের কফিন তিনি কিনে এনেছিলেন আসল দামের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি দামে। এই তথ্যটিও তেহেলকার ‘অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড’ স্টিং অপারেশনেই বেরিয়ে এসেছিল।

অবশ্য এ মামলায় ২০০৯ সালে করা চার্জশিটে ফার্নান্দেজকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিল সিবিআই। তবে ঘটনাটি নিয়ে তীব্র জনরোষের মুখে এ অভিযোগ নিয়েই পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ।

ভারতের এই সাবেক মন্ত্রীর প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন জর্জ ফার্নান্দেজ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

অ্যালঝেইমার্স ও পারকিনসনস রোগে ভুগছিলেন তিনি৷ সম্প্রতি সোয়াইন ফ্লুতেও আক্রান্ত হন বাজপেয়ী সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী।জর্জ ফার্নান্দেজ-সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী-ভারত

জর্জ ফার্নান্দেজের স্ত্রী লীলা ফার্নান্দেজ সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের মেয়ে। ১৯৭১ সালে তাদের বিয়ে হয়। কিন্ত ১৯৮০ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তাদের একমাত্র ছেলে শন ফার্নান্দেজ যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ইংরেজি, তামিলসহ মোট ১০টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন জর্জ ফার্নান্দেজ।