চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত, অপদস্থ এক বিসিএস শিক্ষক

পরীক্ষায় নকল করতে বাধা দিয়েছিলেন এই শিক্ষক

সৎ জীবন-যাপন করবেন। তাই তিনি বেছে নেন শিক্ষকতা। এমন কি বিসিএসেও প্রথম পছন্দ ছিল সেটাই। তার বিশ্বাস ছিল এ পেশায় থেকেই দেশের জন্য, মানুষের জন্য বেশি কাজ করা সম্ভব। কিন্তু সেই পেশায় এসে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মো. মাসুদুর রহমানকে। 

বিজ্ঞাপন

মাসুদুর পাবনা শহিদ বুলবুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক। পরীক্ষায় নকল করতে বাধা দেওয়ায় কেন্দ্রের মধ্যেই তাকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এই ঘটনার একটি ভিডিও এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ঘটনার শুরু ৬ মে। এইচএসসি পরীক্ষার ডিউটি করছিলেন প্রভাষক মাসুদুর রহমান। সেসময় দেখতে পান তার কক্ষের দু’জন পরীক্ষার্থী অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করছে। তিনি তাদের খাতা কেড়ে নেন  এবং নিয়মানুযায়ী যতটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার তা করেন।

এতেই বাধে বিপত্তি। ঘটনার পর ৫ দিন চুপ করে থাকলেও গত ১২ মে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বের হবার পথে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে প্রভাষক মাসুদুর রহমানের উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাবনা শহিদ সরকারি বুলবুল কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি জুন্নুনের নেতৃত্বে তার উপরে হামলা চালানো হয়।

মাসুদুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইন-কে বলেন: ‘আমি এইচএসসি পরীক্ষার ডিউটি শেষ করে কেন্দ্র থেকে মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলাম। তখন হঠাৎ পেছন থেকে আমাকে বলা হয় এই দাঁড়া। আমি দাঁড়ালে কয়েকজন মিলে আমাকে মারতে শুরু করে। সেসময় আমাকে বলা হয়; তুই আর কলেজে আসবি না কলেজে আসলে তোর হাত কেটে নেবো। বাংলা বিভাগে আগুন ধরিয়ে দেবো।’

‘‘এরপর আমার সিনিয়র শিক্ষকরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং আমাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। এরপর থেকে আমার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমাকে কিছুদিনের জন্য কলেজে যেতে মানা করেছেন শিক্ষকরা।’’

কলেজে রাখা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কলেজ গেট থেকে মোটরসাইকেলে করে বের হওয়ার সময় কয়েকজন যুবক এসে অতর্কিত হামলা চালায় শিক্ষক মাসুদুর রাহমানের উপর। তাকে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি ও থাপ্পড় মারা হয়। ফেলে দেয়া হয় মাথার পাগড়িও। একপর্যায়ে তিনি বেরিয়ে যেতে চাইলে পেছন থেকে এসে তাকে লাথি মারে এক যুবক।

বিজ্ঞাপন

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার একজন শিক্ষকের এ ধরনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন অনেকেই।

এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন প্রিয় এ শিক্ষকের ছাত্র-ছাত্রীরা। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষকের এ ধরণের হেনস্থার সম্মুখীন হতে না হয়।

এই ঘটনায় সহযোগী অধ্যাপক ড. কৃষ্ণেন্দু কুমার পালকে প্রধান করে এবং ড. ইসমত আরা ও সহকারি অধ্যাপক হারুনুর রশিদসহ কলেজের কর্মচারি ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিয়ে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কমিটির তদন্তেও উঠে এসেছে ওই ছাত্রদের অপরাধ।

তদন্ত কমিটির প্রধান কৃষ্ণেন্দু কুমার পাল চ্যানেল আই অনলাইন-কে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের পর আমরা প্রাথমিকভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক নেতা ও কলেজের শিক্ষকদের নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বিষয়টা যেহেতু এভাবে সমাধান করা যচ্ছে না। উপরন্তু পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে সেহেতু আমরা এখন এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেবো। টিচারদের নিরাপত্তার জন্য সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করেই আমরা এটি করবো।’

প্রভাষক মাসুদুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ৩৬তম বিসিএসের মাধ্যমে যোগ দেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে। নিজ সততা ও সদাচারণের গুনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় তিনি।

জানা গেছে, বন্ধুমহলে মেধাবী এ শিক্ষক আমায়িক ও আচরণে নমনীয় বলেই সুপরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৬ -২০০৭ সেশনের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা ছিলেন শিক্ষক। মা গৃহিণী। বাবার দেখানো আদর্শের পথেই যেনো হাঁটতে চেয়েছেন চিরকাল।

বন্ধু-সহপাঠিসহ অনেকেই যখন বিসিএস প্রশাসন, পুলিশ ক্যাডারে নিজেদের অবস্থান সুনিশ্চিত করতে ব্যস্ত, মাসুদুর রহমান ছিলেন তাদের ব্যতিক্রম। কেননা শিক্ষকতাই ছিলো তার একমাত্র পছন্দ।

আর সেই পেশায় আসার ৬ মাসের মধ্যে এমন একটা ঘটনা তিনি ভীষণ অপমানিত, লজ্জিতবোধ করছেন। সম্মানজনক এ পেশায় এসে এভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে, তা কখনো কল্পনা করতে পারেননি।

ভিডিও রিপোর্ট: