চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ছবির ব্যবহার: একটি প্রাসঙ্গিক বক্তব্য

সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আলোচনায় এসেছেন, তার একটি প্রশংসনীয় ঘোষণা নিয়ে। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট কোনো প্রতিমা নয়, অফিসে আমার ছবি ঝুলাবেন না। বরং অফিসে আপনাদের সন্তানদের ছবি রাখুন। কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের দিকে তাকান।

বিজ্ঞাপন

নতুন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এরই মধ্যে দেশটির অনেকের হৃদয় জয় করেছে। ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই তার চমৎকার বক্তব্যের জন্য। কিন্তু একটা বিষয় কী জানেন, আমরা স্বদেশী বাঙালিরা বিদেশিদের দ্বারা বড় সহজেই বিগলিত হয়ে পরি। এই বিগলনটা যে খারাপ, তা কিন্তু বলছি না। আমাদের একটা সমস্যা আছে। সেটা হল অসম তুলনা।

এই যেমন ধরুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের নিউজ শেয়ার দিতে গিয়ে একটু ইনিয়ে বিনিয়ে আমাদের দেশের অফিস আদালতে সরকার প্রধানের ছবির টানানোর চলের বিষয়টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যারা তাদের জন্য এই বাক্য ব্যয়।

একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, আমাদের দেশে ছবি টানানোর একটা বাতুলতা আছে। বাংলাদেশে ছবির রাজনীতি বেশ প্রবল। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে পথে-ঘাটে নানা স্থানে যখন ধুম লেগে যায় ছোট-মাঝারি বড় নেতাদের ছবি টানানো দেখে। এসব দেখে খুব দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। আমরাই আবার কেউ কেউ ‘আদর্শহীন আনুষ্ঠানিকতার’ আতিশয্যে, আবার কেউ হীন রাজনীতির কারণে জাতির পিতা ও তার প্রতিকৃতিকে নানাভাবে অমর্যাদা করে চলেছি।

যার যার নির্বাচনী এলাকার ব্যানার-ফেস্টুনে এমপি সাহেবদের ছবি বড় করে টানানো হয়। তার নিচে কিছুটা ছোট করে তস্য দলীয় নেতা যার সৌজন্যে ছবি টানানো হয়েছে তার ছবিও পেয়ে যাই। আবার এসব ছবির সঙ্গে যদি নেতা হন আওয়ামী লীগদলীয়, তবে সেই ছবির এক কোণে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ও ওয়াজেদ জয়ের ছবি থাকে। আর স্থানীয় নেতা যদি বিএনপিপন্থী হন, তবে নিজের ছবির একপাশে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার ছবি যুক্ত করেন।

কখনো কখনো পাতি নেতার ছবির আকৃতি জাতির জনকের চেয়েও বড় হয়ে যেতে দেখেছি। আমার এক বন্ধু ছাত্রদল করে। আমরা নরসিংদী শহরে পা ফেললেই সেই বন্ধু ইয়া বড় হাসি দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। তার হাসি দেখতে গিয়ে তার প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে পোস্টারের এক কোণে আর দেখতে পাওয়া যায় না। মুজিব সৈনিক হিসেবে তাতে আমার অবশ্য লাভই হয়।

সে যাইহোক, যা বলছিলাম, যারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে নিয়ে প্রশংসার ছলে আমাদের ছবি টানানোর চলকে ইনিয়ে বিনিয়ে খোঁচা মেরেছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা একটু পিছনে ফিরে আমাদের ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস ঘুরে আসবেন।বঙ্গবন্ধু

‘৭৫-পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি তো দূরের কথা তাঁর নাম নেয়া ছিল নিষিদ্ধ। দেশের জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে রাইফেল বেয়নোটের জোরে ক্ষমতা দখল করার এই কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়তো পৃথিবীর আর কোন দেশের ইতিহাসে নেই। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি নিজেদের ক্ষমতাকে জায়েজ করতে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে গঠন করা হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীকে সাথে নিয়ে তারা রচনা করল বাংলাদেশের দু’দশকের অন্ধকার ইতিহাসের।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সত্যকে আড়াল করা যায় না। মিথ্যার মেঘ ছিন্ন করে সূর্যের মতো তিনি প্রতিভাত। ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের আজকের প্রাণ প্রিয় দেশনেত্রী শেখ হাসিনা সূর্যের দীপ্তি নিয়ে। মহাকালের কাছে যে ঋণ ছিল তা তিনি এসে শোধ করলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমহিমায় সংবিধানিকভাবে ফিরিয়ে এনে।

সংবিধানের ৪-এর ক অনুচ্ছেদের কথা বলছি। ২০১১ সালের ৭ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ (৪ক) উল্লেখ করে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করার বিধান জারি করা হয়েছে। যেখানে উল্লেখ আছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে।
বহু বছর পর বাংলাদেশীরা আবার ফিরে পেল তার জনকের নাম।জাতির পিতা দলমতের উর্ধে , তিনি কোন গোষ্ঠীর নন। তিনি দেশের সব মানুষের। জাতীয় পরিচয় ও অস্তিত্বের অপরিহার্যতায় তিনি অবিনশ্বর। সেই অবিনশ্বর প্রতিকৃতি। তাই সংবিধানের ৪-এর ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে সরকারই আসবেন জাতির পিতার প্রতিকৃতি টানানো বাধ্যতামূলক। এর সাথে ইনিয়ে বিনিয়ে দেশি-বিদেশি তুলনার কোনো সুযোগ নেই।

জাতির পিতার ছবি টানানোর পূর্বে কে বা কাহারা তাহাদের পরিবারের ছবি টানিয়ে রাখার চল করেছিলেন তার ইতিহাসটা আশা করি সবার জানা। সেই পরিবার প্রথা ভেঙ্গে চির উন্নত মম শির জাতির জনেকের প্রতিকৃতি সকল সরকারি ও আধা সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করার যে বাধ্যবাধকতা সংবিধান করেছে এটিকে আমি বাধ্যবাধকতা শব্দ বলতে নারাজ। এটি হল জাতির জনককে তাঁর সম্মান দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে সম্মানিত হলাম, এভাবে আমাদের সকলের ভাবনা থাকা উচিত। তিনি যেই রাজনৈতিক দলই করে থাকুন তাতে কোন আসে যায় না।

এবার যারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের নাম ধরে ইনিয়ে বিনিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ছবি জাতির জনকের পাশে টানানোর চলের দিকে জেনে বা না জেনে কৌশলী আলোচনায় মেতেছেন তাদের সম্ভবত জানা নেই যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সেসময় বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ছবি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই’।

এই অংশটি আমি কোট করেছি ০৩-২৬-২০১২ তারিখে দেশবিদেশে পত্রিকায় অধ্যাপক আবু সাইয়িদ স্যারের লেখা প্রবন্ধ ‘জাতির পিতার পাশে প্রধানমন্ত্রীর ছবির আইনগত ভিত্তি নেই’ থেকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন তখন তার পিছনের দেয়ালের দিকে তাকাবেন তাহলেই বুঝতে পারবেন যে, তিনি তার নিজের ছবি টানিয়ে রাখতে উৎসাহিত করেন না। সেখানে কেবল জাতির জনকের ছবিই শোভা পায়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা তার নিজের ছবি টানানোর প্রয়োজন নেই বলা সত্ত্বেও আমরা দেশবাসী দেশনেত্রীকে ভালবেসে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা হিসেবেই কেবল নয়, জাতির জনকের সোনার বাংলাকে গড়ার কারিগর হিসেবে। জাতির জনক আর দেশনেত্রীর এই প্রতিকৃতি আমাদের কাছে কেবল ছবি নয়। এটি কোন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবির সাথে তুলনীয় নয়। এ যে আমাদের বড় আবেগের জায়গা। আমাদের লাল সবুজের শপথ নিয়ে দেশপ্রেমের জায়গা।

ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মহানুভবতা থেকে শিখি এবং নিজেরা প্রতিজ্ঞা করি যে, দলগত বা রাজনৈতিক যে কোন স্বার্থেই হোক না কেন জাতির পিতার প্রতিকৃতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতিকৃতির কোন অসম্মান না করি। নির্বাচন হোক, সভা সমাবেশ হোক, পোস্টার হোক, ব্যানার যাই হোক সেখানে আমাদের আত্মপ্রতিকৃতি যেন জাতির পিতার প্রতিকৃতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতিকৃতির প্রতিকৃতির ছাপিয়ে না যায়।

আমি বিশ্বাস করি আমরা সবাই দেশকে ভালবাসি, বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি, বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ভালবাসি। তাই তাদের অসম্মান করে নিজের অস্তিত্বের অসম্মান করতে পারব না।
জয় বাংলা।
জয় বঙ্গবন্ধু।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)