চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চীন-মার্কিন মধুচন্দ্রিমার সমাপ্তি

ফ্লোরিডা রিসোর্ট মার-এ-ল্যাগোতে সফররত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-য়ের সাথে “খুবই, খুবই ভালো সম্পর্ক” এর যে অভিব্যক্তি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে ১০০ দিন না যেতেই ভাটা পড়েছে। চীন-মার্কিন এই মধুচন্দ্রিমার ছেদ টেনেছে চীনের ব্যাংক, জাহাজ কোম্পানি, ব্যক্তির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তাইওয়ানের সাথে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির চুক্তিতে।

নর্থ কোরিয়ার অর্থ পাচারের দায়ে ড্যানডং ব্যাংক, পণ্য পাচারের দায়ে চীনের জাহাজ কোম্পানি ও দুই ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞায় ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। আবার নিজেদের ‘বিদ্রোহী এলাকা’ দাবি করা তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ১.৪ বিলিয়ন ইউএস ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তিও রুষ্ট করেছে চীনকে।

নর্থ কোরিয়ার ব্যাংক ড্যানডং-কে নর্থ কোরিয়ান অর্থ পাচারে অভিযুক্ত করে নিষিদ্ধ করায় ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ক্ষতি করে এমন ‘ভুল পদক্ষেপ বন্ধ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ড্যানডং ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারবে না।

এছাড়াও দুইটি চাইনিজ জাহাজ কোম্পানি ও দুই চীনা নাগরিককে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাহাজ কোম্পানি ড্যালিয়ান গ্লোবাল

ইউনিটি শিপিং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা নর্থ কোরিয়ায় অভিজাত পণ্য পাচার করে। নর্থ কোরিয়ার উইপনস প্রোগ্রামে অর্থায়ন বন্ধ করতেই এমন সিদ্ধান্ত। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটি জানান। তবে নর্থ কোরিয়ার উপর অবরোধ আরোপে চীনের নিষ্ক্রিয়তার জন্য এই পদক্ষেপ নয় বলেও দাবি করে তিনি বলেন, এটা চীনের বিরুদ্ধে নয়, এটা একটা ব্যাংক এবং চীনের ব্যক্তি ও স্বতন্ত্র সত্ত্বার বিরুদ্ধে।

“ড্যানডং ব্যাংক নর্থ কোরিয়ার অবৈধ আর্থিক কার্যক্রমের পথ, যা নর্থ কোরিয়ার ডাব্লিউএমডি (উইপনস অব মাস ডেসট্রাকশন) এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রোগ্রামের জন্য কোম্পানিগুলোর লাখ লাখ ডলার লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত হয়।” যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে ট্রাম্পের সাথে আলোচনার জন্য সাউথ কোরিয়ান প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইন ওয়াশিংট সফরের সময় এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে। এদিকে শি জিনপিং এখন হংকং রয়েছেন। সেখানে যুক্তরাজ্যের উপনিবেশ মুক্ত হয়ে দেশটির চীনে ফিরে আসার ২০ তম বার্ষিকি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন তিনি। বেইজিং ভিত্তিক গ্যাভেকাল ড্রাগোনোমিক্স এর পরামর্শক ইয়ানমেই জি বলেন চীন এর সম্পর্কে সতর্ক ছিলো, কিন্তু এর সময়টাই তাদের ক্রুদ্ধ করেছে।শি জিনপিংয়ের হংকং সফরের জাঁকজমক আর অনুষ্ঠানের প্রতিই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি চেয়েছিলো তারা, নর্থ কোরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে তাদের ব্যর্থতার দিকে নয়।

আগামী সপ্তাহে জার্মানিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে এই দুই দেশের প্রেসিডেন্টের বৈঠকেরও কথা রয়েছে। কিন্ত এপ্রিলে মার-এ-লোগো’তে তাদের প্রথম বৈঠকের চেয়ে সেই সাক্ষাৎ শীতল হবে, ধরে নেয়াই যায়।

চীনা ব্যাংকের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ এবং তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির এই খবর এলো, যখন এই দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশ আর মাত্র ২ সপ্তাহ পরেই তাদের বাণিজ্য সম্পর্কে সমতা আনতে প্রাথমিক পর্বের আলোচনা সম্পন্ন করতে যাবে।

এই দুই পদক্ষেপের ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই চীন সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে গরুর গোশত আমদানির উপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় বেইজিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন রাষ্ট্রদূত এই আলোচনার ‘প্রাথমিক ফল’ উদযাপন করেন। “আমরা ১৪ বছর এর জন্য অপেক্ষা করেছি।” বৃহস্পতিবার টেরি ব্র্যান্সট্যাড এমনটিই বলেন। চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মূল অগ্রাধিকার এবং এটা একটা অন্যতম মাধ্যম (গোশত রপ্তানি) যার মাধ্যমে তা সম্ভব। চীনে মাংস রপ্তানির পুনরায় শুরুকে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের নতুন সূচনা বলেও অভিহিত করেন তিনি।

জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই পিয়ংইয়ং-এর উপর কয়েক পর্যায়ে অবরোধ আরোপ করেছে। কিন্তু নর্থ কোরিয়াকে আর্থিক যন্ত্রণায় ফেলতে সবচেয়ে সক্ষম চীন, এমনটাই ধারণা। পিয়ং ইয়ং সিরিজ মিসাইল টেস্টের প্রেক্ষীতে ওয়াশিংটন নর্থ কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চীনকে তাগাদা দিয়ে আসছিলো। নর্থ কোরিয়ার উপর অবরোধ আরোপ করলে আরও ভালো বাণিজ্য চুক্তির আশ্বাস এপ্রিলে জিনপিং-কে দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

কিন্তু এই মাসের শুরুতে এক টুইটে ট্রাম্প বলেছিলেন, চীনের পদক্ষেপ ‘কাজ করছে না’।

তাইওয়ানের কাছে ১.৪২ বিলিয়ন অস্ত্র বিক্রির চুক্তি, যা ট্রাম্প প্রশাসনের এমন প্রথম উদ্যোগ। তাইওয়ানকে নিজেদের সীমান্তে স্বশাসিত দ্বীপ বলে মনে করা চীন ক্রুদ্ধ হয়েছে। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনা দূতাবাস এই সীদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এই পদক্ষেপে চীনের ক্ষুদ্ধ হতেই পারে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শুক্রবার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ গুরুত্বপূণ স্পিরিটের বিরোধী”, যার সূচনা হয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ফ্লোরিডা রিসোর্টে এপ্রিলে চীনা প্রেসিডেন্টের বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের সময়।

চীনা বিশ্লেষকরা এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তকে অকার্যকর এবং বিপরীতি প্রতিক্রিয়া দেখাবে বলে মন্তব্যে করেছেন। নর্থ কোরিয়ার উপর অতিরিক্ত অবরোধ আরোপে চীনকে দোষারোপের সুযোগ নেই বলেও অভিমত তাদের। তারা বলেন, চীন এরই মধ্যে অনেক কিছু করেছে, কিন্তু তারা নর্থ কোরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে না।

এছাড়াও মানব পাচার এবং জোরপূর্বক শ্রমের জন্য সবচেয়ে নিকৃষ্টের তালিকায় এই সপ্তাহের শুরুতে চীনকে স্থান দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা বেইজিংয়ের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এমনতর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের এমন নৈরাশ্য নিঃসন্দেহে দেশদুটির মধ্যে সম্পর্কের নতুন মেরুকরণই স্পষ্ট করলো।