চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চার স্তম্ভের পতনের পর জামায়াতের টিকে থাকা না থাকা

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মধ্য
দিয়ে দলটির প্রধান চার স্তম্ভের একই পরিণতি হওয়ার পর বাংলাদেশে জামায়াত
রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

বিজ্ঞাপন

র‍াজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের একপক্ষ মনে করে,
জামায়াতের মতাদর্শের মূলভিত্তি যেহেতু বাংলাদেশে নয়, তাই শীর্ষ নেতাদের
হারানোর পরও তাদের টিকে না থাকার কোন কারণ নেই।

অন্যপক্ষ অবশ্য মনে করছে,
গত ৮-১০ বছরে জামায়াত দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সব ধরনের গ্রহণযোগ্যতা
হারানোর কারণে বিদেশী সহায়তা থাকলেও শুধু সেটা নিয়ে তাদের টিকে থাকা কঠিন।

তবে কয়েকটি দেশে জামায়াতের মতো দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ দিয়ে কেউ কেউ
বলছেন, সংস্কারের মাধ্যমে জামায়াতের টিকে থাকা অসম্ভব নয়।

মূলতঃ যাদের আন্দোলনের ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি এবং জামায়াতের পতন, সেই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, জামায়াতের টিকে না থাকার কোন কারণ নেই। কারণ এ দলটির কেন্দ্র পাকিস্তানে।

`তার দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশকেন্দ্রিক নয়। তার অর্থের উৎস সৌদি আরব ও তুরস্ক। তাদের সমর্থন দিয়ে চলেছে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো দেশের ভেতরেও শক্তিশালী। এমনকি আওয়ামী লীগের ভেতরেও জামায়াত আছে,’ বলে দাবি করেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলন এবং পরে বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে জামায়াতের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা না বুঝে জামায়াতকে ভোট দিতো জামায়াত তাদের সমর্থন হারিয়েছে। এভাবে দেশের মধ্যে জামায়াত কিছুটা জনমর্থন হারিয়েছে সত্য, কিন্তু দল হিসেবে জামায়াত নির্মূল হয়ে যাবে না।

জামায়াত একটি দেশবিরোধী শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তির বিচার করলে হবে না, দেশবিরোধী দলের সাংগঠনিক শক্তি বিনষ্ট করতে দল হিসেবেও জামায়াতের বিচার করতে হবে।

তিনি বলেন: নিজামী কেবল জামায়াতের শীর্ষ নেতা ছিলেন না, তার অনেক আগে তিনি আল-বদর প্রধান ছিলেন। তিনি একাত্তরে যে অপরাধ করেছেন বা যে অপরাধের বিচার হয়েছে সেটা ব্যক্তিগত বিষয় না। ব্যক্তি শত্রুতার ভিত্তিতে তার বিচার হয়নি। এখানে মূল বিষয় রাজনৈতিক মতাদর্শ।

তিনি বলেন: জামায়াতের রাজনীতির একটা দর্শন রয়েছে। সে দর্শনের কারণেই পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর যাতে বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে ষড়যন্ত্র থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

‘সাম্প্রতিককালে চলমান যে সন্ত্রাস, তালিকা করে করে ধর্মের নামে মুক্তচিন্তার মানুষদের যে একে একে হত্যা করা হচ্ছে; সেটা একাত্তরের সেই হত্যাকাণ্ডেরই ধারাবাহিকতা। জামায়াতকে নির্মূল করা না গেলে এই হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে।’

শাহরিয়ার কবির বলেন: জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মের নামে নারী নির্যাতন, মানুষ হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছিলো যার ধারাবাহিকতা চলছে। দেশকে টিকিয়ে রাখতে দল হিসেবে তাই জামায়াতকেও নিষিদ্ধ করতে হবে।

‘আবার শুধু দল নিষিদ্ধ করলেই হবে না, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিত্ত বৈভবও অর্জন করেছে। সেটা দিয়ে তারা নিজেরা যেমন লাভবান হয়েছে তেমনি তাদের দলকেও শক্তিশালী করেছে,’ উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন: শীর্ষ ব্যক্তিদের অপরাধের বিচার যেমন করতে হবে তেমনি দলের বিচার করতে হবে।

‘দলের সম্পদ, দণ্ডিত ব্যক্তির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। তা ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না, জামায়াতও শক্তিহীন হবে না।’

শাহরিয়ার কবির যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি দল হিসেবেই জামায়াতকে শক্তিহীন করার কথা বললেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার বর্তমান অবস্থাতেই জামায়াতের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

দলটির দার্শনিক ও আর্থিক শক্তির উৎস দেশের বাইরে হলেও দেশের ভেতরে জামায়াত গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে মন্তব্য করে শান্তনু মজুমদার বলেন: মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চিহ্নিত অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু সময় থেকে জামায়াতবিরোধী চেতনার যে উত্থান হয়েছে তা অকল্পনীয়। একটা সময় ছিলো যখন দলের এবং শীর্ষ নেতাদের অপরাধ নিয়ে কথা বলা অকল্পনীয় ছিলো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াত আর গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

এমনকি নাম পরিবর্তন করে নতুন দল হিসেবে আসলেও জামায়াত টিকে থাকতে পারবে না বলে মনে করছেন শান্তনু মজুমদার।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ এর মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. মোবাশ্বার হাসান অবশ্য বলেছেন: বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলো।  তবে এ  কথা বলার সময় এখনো হয়নি যে, এর মধ্যে জামায়াতের রাজনীতি শেষ হয়ে গেলো।

‘তাদের রাজনীতি আরো চাপের মধ্যে পড়েছে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে জামাতের নতুন প্রজন্মের সদস্যরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় তা দেখার জন্য,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ধর্মীয় রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ড. মোবাশ্বার বলেন: তুরস্ক, আলজেরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী দলগুলোর রাজনীতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এরকম সংকটকালীন সময়গুলোতে এই ধরনের দলগুলোতে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়: এক হতে পারে দলের একটি অংশ জঙ্গীবাদের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। আরেকটি হতে পারে দলগুলো আধুনিকীকরণের দিকে ঝুঁকলো। এরকম অবস্থায় তাদের রাজনৈতিক চিন্তা, মতাদর্শে পরিবর্তন আসে, যেখানে তারা ইসলাম, গণতন্ত্র  এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মিলন দেখতে চান।

মতিউর রহমান নিজামীর আগে হত্যা-গণহত্যা-ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে দলের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান এবং আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়। এ চারজনকেই বাংলাদেশে জামায়াতের প্রধান স্তম্ভ মনে করা হতো।