চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চকবাজার ট্র্যাজেডি: আর কখনোই বাবার আদর পাবে না তারা

একটু পরই বাবা আসবে বাসায়। ছোট দুটি বাচ্চা অপেক্ষার প্রহর গুণছে। বাবা আসলেই ঝাপিয়ে পড়বে কোলে। আর দুই সন্তানকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠবে তাদের বাবা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু না, তাদের বাবা আর কখনোই ফিরবে না। বাচ্চা দুটির বাবা এখন তাদের ছেড়ে অনেক দূরে। আর কখনোই অবুঝ শিশু দুটো বাবার আদর পাবে না, করবে না বায়না।

কারণ, আরও অনেকের মতোই চকবাজারের ভয়াবহ আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছে তাদের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাওসার।

বন্ধুদের সবসময় পুরান ঢাকায় বিরিয়ানি খেতে ডাকতো রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় আগুনে নিহত কাওসার। হাসি-খুশি প্রাণবন্ত তরতাজা প্রাণটি মুহূর্তেই পুড়ে যায় আগুনে।

কাওসারকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার পরিবার, তার বন্ধুমহল। কাওসারের কথা স্মরণ করে বাকরুদ্ধ হয়ে উঠছিলো তাদের কণ্ঠ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী কাওসার আহমেদের পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার আল মদিনা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকান ছিলো তার। লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। চোখে মুখে স্বপ্ন ছিলো লেখাপড়া শেষ করে বড় চাকরি করবেন। তবে সেই স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে তার।

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ছেলে কাওসার বছর দু’য়েক আগে  বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার দুটি যমজ সন্তানও রয়েছে। বুধবার রাতে আগুনে পুড়ে ছাই হন কাওসার। সেই সাথে ছাই হয়েছে তার ফার্মেসিও। কাওসারের লাশ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। তার লাশ নিতে আসা ভাই ও মায়ের আহাজারি থামছে না কিছুতেই। সব সান্ত্বনার ভাষাই যেনো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সেখান থেকে।

২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাওসার ২০১৪-১৫ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কাওসারের বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আবু সাইদ চ্যানেল আই অনলাইন-কে বলেন: কাওসারের ফার্মেসি আগে কামরাঙ্গীর চরে ছিলো। পরে সে পুরান ঢাকায় বাসা ভাড়া করে এবং সেখানেই ফার্মেসি দেয়। কাওসার প্রায়ই বলেতো তার বাসায় যেতে। বলতো এদিকে আর ঘুরে যা তোদের বিরিয়ানি খাওয়াবো। খুব সৎ ছিলো সে।

কাওসারের স্মৃতিচারণ করে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে তার আরেক বন্ধু আব্দুল্লঅহ আল মারুফ বলেন: কাওসারের এ পরিণতি মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমরা ইন্টারমিডিয়েট থেকে একসাথে লেখাপড়া করেছি। ও খুব ভালো ছেলে ছিলো। অনেক সংগ্রাম করে ও এতদূর এসেছে।

মর্মান্তিক এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭৮ জন মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে পুরুষ ৬৬ জন, নারী ৭ জন ও শিশু ৫ জন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বুধবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত রোডের শেষ মাথায় মসজিদের পাশে ৬৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওয়াহিদ ম্যানসনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

এলাকাবাসী বলছে, ওই ভবনের কারখানা থেকে আগুন ছড়িয়েছে। কেউ বলছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ আবার কেউ বলছে বিকট শব্দে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়ায়। ওয়াহিদ ম্যানসনের নিচতলায় প্লাস্টিকের গোডাউন ছিল। ওপরে ছিল পারফিউমের গোডাউন।

এ আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট। ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম সকাল ৯টার দিকে জানিয়েছে, টানা দশ ঘণ্টারও বেশি সময়ের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে আগুন। পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে এখন উদ্ধারকাজ চলছে।

ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট এবং বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার।

সড়ক পরিবহন ও সেতু বিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগুনের ঘটনা খতিয়ে দেখে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে সরকার। আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।

ঘটনা তদন্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।