চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গাছ!

এক ফেসবুক বন্ধুর ওয়ালে দেখলাম, স্কলাস্টিকা স্কুলের উত্তরা ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তার গাছগুলো কেটে রাস্তার উপর স্তুপ করে রাখা হয়েছে। মেহগনি গাছ। এই গাছ তেমন যত্ন না পেয়েও বেড়ে উঠছিল আপন খেয়ালে। এই গাছ আগামী বিশ বছরেও কোন ক্ষতির কারণ হতো না রাস্তা বা ফুটপাথের। কেন কার খেয়ালে কাটা হল গাছগুলো, কে জবাব দেবে। আসলে জবাবদিহিতার কিছু নেই। এই দেশে ক্ষমতার জোরে যা মন চায় করা যায়। জোর যার মুলুক তার। ২০ বছর পরে গাছগুলো কাটলে  আরো পরিপক্ক হতো। মেহগনি গাছ যতো পুরনো হবে, ততো মূল্যবান হবে।

গাছের প্রতি আমার ভালবাসা মায়ের কারণে, সে খুব গাছ লাগাতো গাছের পেছনে সময় দিতো। আমাদের বাড়িতে অনেক গাছ ছিলো। সব যে পরিকল্পনা করে লাগানো তা নয়। যেখানে ইচ্ছে সেখানে গাছ লাগাতাম, আমার একান্ত নিজের একটা মেহগনি গাছ ছিলো। আমাদের বাড়িটা বিক্রির সময় আমি কোন কিছুর জন্য কান্না করিনি, ২৩/২৪ বছর বয়সে গাছের শোকে কেঁদেছিলাম। কারণে অকারণে গাছ কাটা দেখলেই আমার মন খারাপ হয়। কান্না পায়। রাস্তার ধারের কেটে রাখা গাছগুলোর ছবি দেখে মনে পড়লো আমি আর আমার বন্ধু কতদিন এই পথ ধরে হেঁটে গেছি ওর বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে। কতদিন ফুটপাথে গাছের নীচে বসে গল্প করেছি। রৌদ্রতপ্ত দিনে কতদিন গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেয়েছি। গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই বান্ধবী বাচ্চাটার ছুটির অপেক্ষা করেছি। আহা! যশোর রোডের গাছগুলো বাঁচাতে মানুষ যেমন প্রতিবাদ করেছিল, উত্তরার গাছগুলো বাঁচাতে কেউ প্রতিবাদ করেনি, কারণ এলাকাবাসী জানে না গাছগুলো কাটা হবে। কেটে ফেললো গাছগুলো, আহা! গাছের কান্না কেউ অনুভব করল না। যেখানে মানুষের কান্না চাক্ষুষ করে কিছু হয় না, সেখানে গাছের কান্না।

রাস্তায় স্তুপ করে রাখা গাছগুলোর ছবি দেখে মনটা বিষন্ন হয়ে গেলো। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি ঢাকার রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে বা রাস্তার পাশে দুই পাশে বৃক্ষরাজির সারি। দুদিকের গাছের মাঝে ছায়া সুনিবিড় পথ। দিনে দিনে ঢাকা শহরে গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অথচ ১২ বছর আগে সিঙ্গাপুরকে দেখে মনে হয়েছিল কংক্রিটের শহর তেমন একটা সবুজের ছোয়া নেই। কিন্তু ১২ বছর পরে গিয়ে দেখলাম নগরায়নের ফলে বনভূমি কেটে ফেলার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। সবখানে সবুজের ছোঁয়া। আমরা দিনে দিনে বৃক্ষহীন করে তুলছি শহরকে।

সারা দেশের কথা নাই বললাম, কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বনের জায়গায় গড়ে উঠছে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ অবস্থায় দেশে প্রাকৃতিক বনভূমি কমবে, এটাই স্বাভাবিক।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) চলতি মাসের ৯ জুলাই বনবিষয়ক এক প্রতিবেদনে (দ্য স্টেট অব গ্লোবাল ফরেস্ট-২০১৮) বলেছে, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি। তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এই তথ্য মানতে নারাজ। মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশের মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ বনভূমি (বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা)। 

বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফও) ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) গত ২৭ জুন প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে বলছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনামেও রয়েছে বাংলাদেশের নাম। এতে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বিশ্বে বাংলাদেশের সমপরিমাণ বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

জিএফও এবং ডব্লিউআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনভূমি উজাড় হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল। ২০১০ সালে দেশের মোট বৃক্ষসম্পদের ৬০ শতাংশ ছিল এই এলাকায়। গত সাত বছরে তা কমে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীতে যেভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, সে অনুযায়ী গাছ লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে সামাজিক বন বিভাগ ঢাকার রাস্তাঘাটে গাছ লাগিয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৬০০টি। এর অধিকাংশেরই আবার এখন অস্তিত্ব নেই।

স্বাধীনতার পর গত চার দশকে ঢাকা শহরের কলেবর অসমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির সাথে অব্যবহিতভাবেই কমেছে জলাভূমি এবং সবুজ ভূমি। ঢাকা শহরে উন্মুক্ত ভূমি আছে মাত্র ১৪ শতাংশের মতো। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের পর থেকে ঢাকা শহরের কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর থেকে ২০ হাজার ৫৪৯ হেক্টর। সেই সাথে কৃষি জমি অকৃষি কাজে চলে গেছে প্রায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর। একইসাথে জলাভূমি এবং সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা কমেছে যথাক্রমে ৬ হাজার ২৭ এবং ২ হাজার ৮১২ হেক্টর।

পরিবেশবিদদের তথ্য অনুযায়ী, শহরের পুরনো গাছগুলোর ৭০ ভাগই কেটে ফেলা হয়েছে এবং সঠিক পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে। বাকি যে ৩০ ভাগ বেঁচে আছে, এর সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখের বেশি হবে না। মহানগরীর মধ্যে কেবল তেজগাঁও, কোতোয়ালি ও রমনা থানা এলাকায় ৯টি উদ্যানে গাছ আছে। বাকি অঞ্চলজুড়ে শুধু ইট আর পাথরের তৈরি স্থাপনা। প্রয়োজনীয় সংখ্যায় গাছ লাগানো হচ্ছে না বলে রাজধানীর পরিবেশে গুরুতর বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত গাছের অভাবে ঢাকার বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে করে মাইক্রোক্লাইমেট বিরাজ করছে। পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে বছরে সামাজিক বন বিভাগ ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাছ লাগানো হয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৬০০টি। ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির মতে, ঢাকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে চতুর্থ। স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশজ ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্ট দেখাচ্ছে, বাতাসের গুণগত মানের সূচকে ঢাকার স্কোর গত ১১ মার্চ ছিল ৫০১। একই দিনে এ স্কোর গাজীপুরে ছিল ৩৩৮ ও নারায়ণগঞ্জে ছিল ৩০৮। দেশে সব শহরের মধ্যে মার্চে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ রেকর্ড করা হয় নারায়ণগঞ্জে। সেখানকার স্কোর ছিল ৫৩৮। চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে সাধারণত ধুলাবালির পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পায়।

পর্যাপ্ত সবুজ না থাকায় এবং ঢাকার চার পাশের ইটভাটা, যানবাহন, শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলা ও যত্রতত্র উন্মুক্ত ডাস্টবিন থাকায় দিনে দিনে বাড়ছে নগরীয় বায়ুদূষণের মাত্রা। গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট অনুযায়ী, বায়ুদূষণের দিক দিয়ে সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি। প্রতি কিউবেক মিটারে এয়ার বর্ন রেট পার্টিকুলেট ম্যাটারের (বাতাসে সহনীয় পদার্থ) পরিমাণ এ শহরে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম, যেখানে সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে কার্বনের পরিমাণ সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২৯০ থেকে ৩০০ পিপিএম (পার্ট পার মিলিয়ন) সেখানে ঢাকার বাতাসে কার্বনের মাত্রা ৩৫০ পিপিএম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন এক সাক্ষাতকারে বলেন, নগরে পরিকল্পিত বনায়ন হলে নগরবাসীর ফুসফুস তাজা থাকবে। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় নগরে বায়ুদূষণের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া মানুষের জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন দরকার, তাও পাওয়া যাচ্ছে না গাছের অভাবে।

ঢাকা শহরে নেই আগের মতো, সবুজের সমারোহ, নেই সারি সারি বৃক্ষরাজি, কংক্রিটের এই শহরের বাতাসে রয়েছে বিষবাষ্প। শহরের চারদিকে ঘিরে আছে কলকারখানা আর ইটভাটা, শহরের নদীগুলো হয়ে উঠছে মরা খাল। আর এসব খাল যেন বর্জ্য পরিবাহিত নর্দমা আর ময়লার ভাগার। মানুষ বুক ভরে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের বদলে বায়ুমণ্ডল থেকে টেনে নিচ্ছে সিসাযুক্ত বিষাক্ত বাতাস। খোলাস্থানগুলো ভরে উঠছে দূষিত কঠিন ও তরল বর্জ্যে। সব মিলিয়ে ঢাকা শহর হয়ে পড়েছে নাগরিক-জঞ্জাল। আশা করে যাই, আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা আবার ভরে উঠুক সবুজে সবুজে, প্রাণ ভরে ঢাকাবাসী নিঃশ্বাস নিক নির্মল, বিশুদ্ধ বাতাসে। নাগরিক জঞ্জালের শহর হয়ে উঠুক সবুজের শহর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)