চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘গভীর সমুদ্রে আন্তদেশীয় মাদক ব্যবসা, বিদেশ থেকে অর্থায়ন’

মিয়ানমারের নাগরিকদের সমন্বয়ে গভীর সমুদ্রে একটি আন্তদেশীয় মাদকের চোরাচালান চক্র সক্রিয় আছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব জানায়, দেশের বাইরে থেকে এই মাদক চোরাচালানের অর্থায়নও হচ্ছে। তবে কোন দেশ থেকে মাদকের অর্থায়ন হচ্ছে কৌশলগত কারণে সেটা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেনি তারা।

মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ৮ লাখ পিস ইয়াবাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে র‌্যাব-১।

আটকরা হলো- তুহিন হোসেন (২৫), মো. সবুজ (২৬) এবং মো. শাহজাহান (৩৫)।

বিকেলে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি বলেন, ৫০ কোটি টাকার ইয়াবার জন্য চোরাচালান চক্রটি দুইটি যন্ত্রচালিত বোট ভাড়া করেছিল। তারা ভুট্টা কিংবা তরমুজের ভেতর ইয়াবা ভরে চালান করতে চেয়েছিল। কিন্তু গত দু’দিন আগের কালবৈশাখী ঝড়ে জলপথে যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয় বিবেচনা করে বোটে না এসে লঞ্চে ইয়াবাগুলো লঞ্চে নিয়ে আসে।

গভীর সমুদ্রে মাদকের চোরাচালান সম্পর্কে তিনি বলেন, বড় বড় ইয়াবার চালানগুলো গভীর সমুদ্রের বর্ডার এলাকায় হস্তান্তর হয়। সমুদ্রের উপকূলে এসব লেনদেন হয়। কিন্তু আগে যেখানে টেকনাফ আর কক্সবাজার উপকূলে ইয়াবা চালান হতো সেখানে র‌্যাব-১৫ (অস্থায়ী ব্যাটালিয়ন) নজরদারি থাকায় মাদকের চোরাচালান নেই বললেই চলে। কিন্তু চোরাকারবারিরা বসে নেই। তারা টেকনাফে চালান করতে না পেরে পাথরঘাটা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর উপকূলে চোরাচালান করে যাচ্ছে। কখনো আবার আমাদের নজরদারি টের পেয়ে রিরুট করে দক্ষিণাঞ্চল জলপথ ব্যবহার করে লঞ্চে করে চালান নিয়ে আসছে।

মুফতি মাহমুদ বলেন: একটি আন্তদেশীয় সিন্ডিকেট এই মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। আমরা এখনো তাদের মূলহোতাকে আটক করতে পারিনি। গভীর সমুদ্রে হাজার হাজার মাছ ধরার ট্রলার থাকে, মাদক চোরাকারবারিরা এই মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে। তাই গভীর সমুদ্রে চোরাকারবারিদের প্রতিরোধ করা কষ্টসাধ্য। তবে মাদক চোরাকারবারিদের রুখতে র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে।

তিনি বলেন: ইয়াবা পাচারের সাথে স্থানীয় ট্রলার মালিকদের একটি অংশ জড়িত আছে। চট্টগ্রাম-টেকনাফ রুটে র‌্যাবের বিশেষ অভিযান পরিচালিত হওয়ায় ইয়াবা কারবারি চক্রগুলো ইয়াবা চালানের বিকল্প রুট হিসেবে সাগর পথ ও অভ্যন্তরীণ নদী পথকে বেছে নিয়েছে। 

আট লাখ ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন: তুহিন হোসেন ও মো. সবুজকে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা সপ্তবর্ণা ০১ নামক একটি লঞ্চ থেকে আনুমানিক পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার ইয়াবাসহ আটক করা হয়। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যর ভিত্তিতে পরে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে দুপুরে তিন লাখ চল্লিশ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়।

তিনি বলেন: প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সংঘবদ্ধ এই চক্রটি গভীর সমুদ্র থেকে ইয়াবাগুলো ট্রলারের মাধ্যমে পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় নিয়ে আসে।সেখান থেকে তারা সুবিধামত নদী পথে এবং স্থল পথে ইয়াবাগুলো পাচার করতো এবং নিয়মিত তাদের রুট পরিবর্তন করতো।

‘‘ইয়াবার চালানটিও সেখান থেকে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ঢাকায় পাচার করার পরিকল্পনা করে। দুইভাগে ইয়াবা পাচারের উদ্দেশ্য হলো একভাগ ধরা পড়লেও যেন অন্য ভাগ ধরা না পড়ে।’’

এই কর্মকর্তা বলেন: তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরো জানা যায়, তাদের ৮-১০ জন সদস্যের একটি চক্র চোরাচালানের সাথে জড়িত। তারা প্রায় দেড় বছর যাবত মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এখন পর্যন্ত তারা পাঁচ থেকে সাতটি সফল চালান করতে পেরেছে। উদ্ধারকৃত ইয়াবাগুলো রাজধানীর অভিজাত এলাকার একটি বাসায় রাখার কথা ছিল। সেই বাসা থেকে ইয়াবাগুলো তাদের নিজস্ব বাহকের মাধ্যমে বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল।

‘‘আরও জানা যায় প্রতি ৬-৭ মাস পর পর প্রতি চালানে ৫-৭ লাখ টাকার ইয়াবা ঢাকার উদ্দেশ্যে আনা হতো। এভাবেই সংঘবদ্ধচক্রটি মায়ানমার থেকে উপকূল হয়ে নদী পথে অথবা বিকল্প সড়ক পথে ইয়াবাগুলো সরাসরি ঢাকায় সরবরাহ করতো।”

তবে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে রাজধানীর অভিজাত এলাকা ওই বাসার ঠিকানা ও ওই বাসা থেকে কাউকে আটক করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে কিছু জানায়নি র‌্যাব।

আটকরা জানায়, ইয়াবা সড়ক পথে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে ঢাকায় পাচার করতে হলে অনেক বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। তাই মাদকপাচারকারী চক্রটি তাদের রুট পরিবর্তন করে সাগর পথে কক্সবাজার হতে পটুয়াখালী ও চাঁদপুর হয়ে ঢাকায় আসে। 

২০১৮ সালের ৩ মে থেকে দেশব্যাপী বিভিন্ন মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। এসময় তারা প্রায় ২০ হাজার জন (১৯ হাজার ৩৭৯ জন) মাদক কারবারিকে আটক করে এবং ৭৫ লক্ষাধিক (৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৮৫ পিস)ইয়াবাসহ অন্যান্য বিপুল পরিমান মাদক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। যার মূল্য প্রায় ৪শ পঞ্চাশ কোটি টাকা।

এছাড়াও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই হাজার ৩৭৫টি অভিযানে আট হাজার ৫৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।