চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গণমাধ্যমের আচরণ নিয়ে লেখাটি কেউ ছাপবেন?

বেশ ক’দিন আগেই লেখার কথা থাকলেও ব্যক্তিগত আবেগের তীব্রতা যথেষ্ট কমানোর পর লেখাটি শুরু করছি। তবুও যেমন উচিত ততটা নৈর্ব্যক্তিক ভাবে লিখতে পারবো কি?

বিশেষ বিশেষ ঘটনা-দুর্ঘ্টনার পর আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ ও ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে যা যা করি, তার অনেক কিছু নিয়ে অনেক সময়ই প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হয়। আমি শুনেছি, কখনও যোগও দিয়েছি সেসবে। ভেবেছি মানুষের মধ্যে অযথা চাপ কিংবা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এমন আচরণ থেকে দিন দিন আমরা মুক্ত হয়ে উঠছি। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন ঘাতকের হামলায় নিহত হওয়ার পর তার শিশু সন্তান এবং স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেক গণমাধ্যমকর্মীর আচরণ আমার সেই আশাকে ভীষণ এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

১. দীপনের ছেলে রিদাত ফারহান জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলো। স্কুল কর্তৃপক্ষ তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এর বেশির ভাগটাই করতে হয় উৎসুক রিপোর্টারদের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য। তবু শেষ রক্ষা হয় না। প্রতিদিনই রিপোর্টার-ফটোগ্রাফাররা পরীক্ষা কেন্দ্রে যান। তার ছবি তোলেন। সদ্য বাবা-হারানো শিশুটিকে নানা প্রশ্ন করেন। সেসব ছবি টেলিভিশনে দেখানো হয়। পত্রিকায় ছাপানো হয়। শিশুটি যা বলে, যা না বলে ছাপানো হয় তা-ও।

২. এক রিপোর্টার নিজের পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠান দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান জলিকে। অনুরোধ করেন ফোন ধরতে। তিনি ফোন ধরতে পারেন না। কথাও হয় না সেই রিপোর্টারের সঙ্গে। পরদিন পত্রিকায় প্রায় তিন কলামজুড়ে ডা. রাজিয়ার উদ্ধৃতি ছাপা হয়। এত সব কথা নাকি তিনি ওই রিপোর্টারের সঙ্গে বলেছেন!

৩. খুব নামকরা একটি পত্রিকার রিপোর্টার তাদের পরিবারের এক বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যকে ফোন করে জানতে চান, দীপন নিহত হওয়ার পরও তার ছেলেকে কেনো পরীক্ষা দিতে পাঠানো হচ্ছে? এটি পরিবারের কেমন মানসিকতা?
– আচ্ছা একটি পরিবারের জীবনে সব চেয়ে ভয়াবহ দুঃসময়ে তাদের এমন প্রশ্ন করাটি কেমন মানসিকতা?

৪. এবার আরেক সাংবাদিক এলেন তাদের বাসায়। বললেন, তার মনটা নাকি ওই পরিবারের দুঃখে ভেঙে যাচ্ছিলো। রিদাতের মা তাকে ড্রয়িং রুমে বসালেন। এবার সেই সাংবাদিকের আবদার- তিনি দীপনের বেডরুমের ছবি তুলতে চান। বাসার লোকজন এমন প্রস্তাবে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার পর তার মনে হলো, তিনি রিদাতের পড়ার টেবিলের ছবি তুলতে চান।

-সেই ছবি তিনি কোথায়-কীভাবে ছাপতেন? কী প্রসঙ্গে? ছেপে কী পুরস্কার তিনি পেতেন?

৫. সাংবাদিকদের একজন এসে শোকগ্রস্থ বাড়িতে কিছুক্ষণ বসে বসে রইলেন। যখন বুঝলেন, এখানে তার তেমন কিছু করার নেই, রিদাতকে দেখে তার মাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওর ‘হাইট’ কত? তার মা অবাক হয়েও উত্তর দিলেন। সেই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না সাংবাদিক। শিশুটি নিচে নামার জন্য লিফটে ওঠার সময় সেখানে দৌড়ে গিয়ে তাকেও একই প্রশ্ন করলেন তিনি।

৬. একটি পত্রিকার সাংবাদিক দীপনের খুব কাছের এক স্বজনকে টেলিফোনে প্রশ্ন করেন, দীপন যে নামাজ পড়তেন তা কি তার নিজের ইচ্ছেয়, না কি পরিবারের প্রভাবে?
– ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়া মানুষটির সেই স্বজন কি মানে বুঝবেন এ প্রশ্নের। কি উত্তর হতে পারে তার? আর তা কী কাজে লাগবে পাঠক কিংবা দর্শকের?

৭. এমনকি ছেলের মৃতদেহ সামনে রেখেই দীপনের বাবাকেও নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলতে দেখেছি আমরা। একমাত্র ছেলেকে হারনোর পর তাঁর সন্তানতুল্য সংবাদকর্মীদের এমন আচরণ দেখতে হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হককে?

পশ্চিমা দুনিয়ার এক ধরনের গণমাধ্যমকর্মীর কাজ-কর্মের সঙ্গে আমরা পরিচিত।  তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি গ্ল্যামারের পেছনে ছুটতে। তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের অবকাশ কিংবা আনন্দের মুহূর্তগুলোতে তারা জুটে যান। লেগে থাকেন। ছবি, খবর, গুজব সংগ্রহে জান দিয়ে দেন। বুঝে হোক না বুঝে হোক, জীবন নিয়েও নেন কখনো কখনো। আর আমাদের এখানে এ ধরনের গণমাধ্যমকর্মীদের দেখি, বিখ্যাত-অখ্যাত মানুষের চোখের পানি লক্ষ্য করে ছুটতে। এমনিতে পাওয়া গেলে তো ভালোই, না হলে তা আনারও ব্যবস্থা করতে পারেন তারা।

ফয়সল আরেফিন দীপনের পরিবারকে ঘিরে গণমাধ্যমকর্মীদের এমন কিছু তৎপরতার যে নমুনাগুলো আমি দেখতে কিংবা জানতে পেরেছি বলে এখানে বললাম, সেগুলোতে  কী দেখি?-

১. শিশুর প্রতি চরম অসংবেদনশীল, অদ্ভুত এমনকি নিষ্ঠুর আচরণ,

২. জীবনের সব চেয়ে বড় দুঃসময়ে পড়া একটি পরিবারের বিপর্যস্ত সদস্যদের আরো বিপর্যস্ত করে তোলো এবং 

৩. সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন নেই এমন প্রশ্ন করে একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশ ও অবমাননার শামিল আচরণ।  

সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা ও সংবাদকর্মীদের আচরণ বিধি নিয়ে যখন বিভিন্ন মহলে এত আলোচনা তখন এমন বাস্তবতা হয়তো অনেকে বিশ্বাসও করতে চাইবেন না। নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর আবেগ থেকে লেখা এ কথাগুলোকে কোনও অ্যাকাডেমিক কাঠামোয় আনাও হয় তো সম্ভব হবে না। তবু সংবাদকর্মী হয়েও নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখা এবং অন্যকে সম্মান করার মতো সামান্য একটা চিন্তার সূত্রপাত কি করা যায়?

টিকা: সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার আলোচনায় বলা হয়, শিশুর প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে; অভিভাবকের আড়ালে কিংবা তাদের অনুমতি ছাড়া শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া যাবে না; মানসিকভাবে বিপর্য্স্ত কারো সাক্ষাৎকার কিংবা ছবি নেওয়া উচিত নয়; প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা যাবে না ইত্যাদি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)