চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খুন-খারাবির সৌদি আরব কেন পশ্চিমাদের কাছে এত মধুর?

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বৈশ্বিক রাজনীতি। খাশোগির নিখোঁজের ঘটনায় তুরস্কের অভিযোগের তীর সৌদি আরবের দিকে। সৌদি আরবের দাবি এই অভিযোগ মিথ্যা।

বিজ্ঞাপন

খাশোগিকে যদি সৌদি আরব হত্যা করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আবার পশ্চিমা শক্তি যদি কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তারা আরো বড় ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সতর্ক করেছে সৌদি আরব।

কিন্তু সৌদিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের কোন ব্যবস্থা এত সহজ হবে না।  কী কারণে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে সৌদি আরব এতো গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরেছে বিবিসি।

তেলের সরবরাহ এবং দাম
পেট্রোলিয়াম সরবরাহকারী দেশগুলোর সংগঠন-ওপেক এর মতে, বিশ্বে তেলের মজুদের ১৮ শতাংশ আছে সৌদি আরবে এবং তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্ব দরবারে এটি সৌদি আরবকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা এবং প্রভাব দিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলো তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে তারা তেল উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। ফলে অন্য কোন রপ্তানিকারক তেলের ঘাটতি পূরণের আগে সৌদির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী বাড়িয়ে দেবে তেলের দাম।

গত রোববার সৌদি সরকারের মালিকানাধীন আল আরাবিয়া টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক তুরকি আলদাখিল লিখেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তা এমন এক অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে যা গোটা দুনিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তিনি আরও লিখেছেন, তেলের দাম ৮০ ডলার হলেই যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষেপে যান, তখন এটি একশ বা দুইশ ডলার হতে পারে, এমনকি তার দ্বিগুণও হতে পারে, সেই সম্ভাবনা কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না। 

সামরিক চুক্তি
সুইডেনের ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের’(এসআইপিআরআই) মতে, ২০১৭ সালে অস্ত্র কেনায় সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব ছিল তিন নম্বরে।

ওই বছর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই ১১০ বিলিয়ন বা ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে সৌদি আরব। এই অস্ত্র ক্রয়ের খরচ আগামী দশ বছরে ৩৫০ বিলিয়ন বা ৩৫ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে সেই সুযোগ রেখে চুক্তি করেছে দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একে একক বৃহৎ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে হোয়াইট হাউজ।

বিজ্ঞাপন

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানিসহ অন্য দেশগুলোও সৌদি আরবে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে।

মিস্টার আলদাখিলের সম্পাদকীয়তে এমন ইঙ্গিত আছে যে, পশ্চিমা দেশগুলো কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সৌদি আরব তখন অস্ত্র কেনার জন্য চীন আর রাশিয়ার কাছে যাবে। 

নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঠিক রাখা এবং সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করে পশ্চিমা বিশ্ব।

ইয়েমেনে সংঘাতের ঘটনায় সৌদি বাহিনীর ওপর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠার পরও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ব্রিটেনের রাস্তাঘাটে মানুষকে নিরাপদ রাখতে সৌদি আরব সাহায্য করছে।

সৌদি আরব হচ্ছে ইসলামের জন্মস্থান। জঙ্গী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক জোট হয়েছে, তার সদস্য সৌদি আরব। সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য গত বছরও ৪০টি মুসলিম দেশকে নিয়ে জঙ্গি বিরোধী জোট গড়েছে সৌদি আরব। 

আঞ্চলিক জোট
ইরানের প্রভাব খর্ব করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে সৌদি আরব। কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সুন্নি ও শিয়া শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে।

সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে, সেসব বিদ্রোহীকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। আবার ইরান ও রাশিয়া এই যুদ্ধের মোড় তার পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে প্রেসিডেন্ট আসাদকে সাহায্য করছে।

আল আরাবিয়ার সম্পাদকীয়তে আলদাখিল সতর্ক করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নতুন অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে উন্নয়ন ঘটাবে। ফলে ইরানের সঙ্গেও সৌদি আরবের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারে, এমনকি তাদের মধ্যে পুনর্মিলনও ঘটতে পারে। 

বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ
আলদাখিল হুঁশিয়ার করে আরো বলেছেন, সৌদি আরবের বাজারে প্রবেশাধিকার থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিতাড়িত হতে পারে।

২০১৭ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সুবিধাসহ সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য এবং সেবাখাতের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের ধারণা, ২০১৫ সালে দুই দেশের যৌথ বাণিজ্য সহযোগিতায় দেড়লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে সৌদি আরব কানাডার সঙ্গে সব ধরনের নতুন ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। সে দেশে নারী অধিকার এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলায় যাদের আটক করা হয়েছিল, তাদের মুক্তি দিতে বলেছিল কানাডা। সৌদি আরব ক্ষিপ্ত হয়ে এ বিষয়টিকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে বর্ণনা করে।

সৌদি আরব শুধু কানাডা থেকে শস্য আমদানিই বন্ধ করেনি, উপরন্তু তারা সৌদি সরকারের বৃত্তি নিয়ে যে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে গিয়েছিল, তাদের সবাইকে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়।