চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্ষিপ্র চিতা লিটন, জমে থাকা ফিল্ডিং ও যা করতে হবে

পাওয়ার আছে অনেক। সেজন্য সামনে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। গল টেস্টে ড্র করতে হলেও বাংলাদেশকে গড়তে হবে ইতিহাস। আর জিততে হলে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেরই সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডটি লিখতে হবে নতুন হরফে। হাতে দশ উইকেট অক্ষত। শ্রীলঙ্কার ছুঁড়ে দেওয়া ৪৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬৭ রান তুলে চতুর্থ দিন শেষ করেছে চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জটা জিততে লিটন দাসের একটি গল্পই প্রেরণার উৎস হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ইনিংসে ব্যবধানটা কমানো যায়নি। মুশফিকরা অলআউট ৩১২ রানে। তার আগেই শ্রীলঙ্কা ৪৯৪ রান তুলে প্রথম ইনিংসেই এগিয়ে থাকল ১৮২ রানে। পরে দ্বিতীয় ইনিংসের ২৭৪ মিলিয়ে সাড়ে চারশর ওপরে লিড। বাংলাদেশের ব্যাটিংকে কি করতে হবে এই ম্যাচ বাঁচাতে হলে? কি আবার, অসাধ্য সাধন!

দ্বিতীয় ইনিংসে এমনিতেই ‘অজানা কারণে’ কেমন যেন একটু বেশি বিবর্ণ হয়ে যান টাইগার ব্যাটসম্যানরা। তার ওপর চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়ার চাপ! তাড়ায় মন না দিলেও অন্তত ম্যাচ বাঁচিয়ে ফেরার চাপটা নেহাত কম নয়! গলে চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করে জেতার ইতিহাসটিই কিনা সর্বোচ্চ ৯৯ রানের। এই মাঠে চতুর্থ ইনিংসে কোন দল আবার ৩০০’র ওপরেই পৌঁছাতে পারেনি। টেস্টের ইতিহাসেই চতুর্থ ইনিংসে ৪১৮ রানের বেশি তাড়া করে জেতার নজিরও নেই। সব মিলিয়ে স্বপ্ন দেখতেও স্বপ্নবাজের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

হাতে এখনো তিন সেশন পাচ্ছে বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জ। মহাচ্যালেঞ্জ। চতুর্থ ইনিংসে অবশ্য বড় ইনিংস খেলারও অভিজ্ঞতা আছে টাইগারদের। সবচেয়ে বড় সংগ্রহটি ৪১৩ রানের। ২০০৮ সালে এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই, সেটি ঢাকা টেস্টে। সেঞ্চুরি করেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। ৯৬ রানের ইনিংস ছিল সাকিবের। ৬১ রান করেন মুশফিক। যদিও সেই টেস্ট জেতা হয়নি বাংলাদেশের। ১০৭ রানে জিতেছিল শ্রীলঙ্কা। এবার ঢাকার মতো কিছু করতে পারলে গল টেস্টে ম্যাচ বাঁচানো হয়তো অসাধ্য কিছু হবে না। সাকিব-মুশফিক গলেও আছেন। তামিম-সৌম্য তো চতুর্থ দিনেই ভরসা দিলেন। মুমিনুল-মাহমুদউল্লাহ, লিটন-মিরাজরা ভরসা দিলে হয়ে যেতে পারে আরেকটি ইতিহাস।

লম্বা সময় ব্যাটিং করে টেস্ট ড্র করার সক্ষমতা যে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আছে, সেটির নজিরও খুব পেছনের নয়। ২০১৫ সালে এপ্রিল-মার্চেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩৬ ওভার ব্যাটিং সেরে ড্র করে ফিরেছিল টাইগাররা। খুলনার সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৩৩২ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে পাকিস্তান তুলে ফেলে ৬২৮ রান। নিশ্চিত হারই চোখ রাঙাচ্ছিল। পরে দ্বিতীয় ইনিংসে তামিমের ২০৬, ইমরুলের ১৫০ ও দুজনের রেকর্ড জুটি ৩১২ রানে ম্যাচটা বাঁচিয়ে ফিরেছিল বাংলাদেশ, ৬ উইকেটে ৫৫৫ রান তুলে। সেই ম্যাচে চতুর্থ ইনিংসের চাপ ছিল না। তবে সামর্থ্যের পুরোটা ঢেলে দেওয়ার তাড়নাটুকু তো নেওয়া যেতেই পারে সেখান থেকে।

বিজ্ঞাপন

সেজন্য অবশ্য নিজেদের বিশ্বাস করতে হবে আমরা পারি। বাড়াতে হবে মনের জোড়। গলে চতুর্থ দিনে ফিল্ডিংয়ের সময়কার বাংলাদেশের শারীরিক ভাষায় যে জড়তা আর দ্বিধা ছিল সেটাকে ঝেড়ে ফেলতে না পারলে মনের বিশ্বাসের এই জোড় হয়তো শক্ত হবে না।

রোদ ঝলমলে শুক্রবারে গলে লম্বা একটা সময় ক্যাচ-গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে করুণ প্রদর্শনী দেখা গেছে টাইগারদের। যেন তাড়া নেই, বাড়তি তাগিদ নেই, যেন ম্যাচ হাতছাড়া হয়েই গেছে ভাব! শর্ট কভারে দাঁড়িয়ে থাকা সাকিব একটা ক্যাচ এমনভাবে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, যেন এর থেকে কঠিন কাজ কিছু করতে হয়নি তাকে আর কখনো!

মিরাজকে বেরিয়ে এসে তুলে মারতে চাওয়া করুনারত্নের শর্ট কাভারে ভাসানো বলটি সাকিব শেষ পর্যন্ত একটু লাফ দেওয়ার ভান করে হাতটা উঁচুই করলেন মাত্র। বাকিদের ফিল্ডিংয়ে আরো অনেকবারই দেখা গেল এমন জমে থাকার নজির। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই যেন মানসিকভাবে হেরে যাওয়া। গলে বড় লক্ষ্যে ছুঁটতে যেয়ে ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রাখাটাও তাই টাইগারদের জন্য সমান জরুরী।

সেজন্য সতীর্থ লিটন দাসের কাছেই সঞ্জীবনী নিতে পারেন টাইগার ব্যাটসম্যানরা। ফিল্ডিংয়ের ওই গাছাড়া ভাবের মাঝেই ব্যতিক্রম ছিলেন মুশফিকের জায়গায় গ্লাভস সামলানোর দায়িত্ব পাওয়া লিটন। লঙ্কানরা যখন লিডের লাগাম ছোটাচ্ছে, তখনও সামান্য গাছাড়া ভাব দেখা গেল না তার মাঝে। একটা ক্যাচ নিয়ে তো চমকেই দিলেন।

ম্যাচের ৬১তম ওভারে মিরাজের আগের বলটাতেই রিভার্স সুইপ করে চার মেরেছিলেন ডিকেওয়াল্লা। ওভারের প্রথম বল ছিল সেটি। পরের বলটি অফস্টাম্পের বাইরেই থাকল। আবারো রিভার্স খেলতে গেলেন লঙ্কান ব্যাটসম্যান। কিন্তু লিটনের অসাধারণ ক্ষিপ্রতার কাছে এদফা হার মানতে হলো। ব্যাটসম্যানের শরীরি ভাষা বুঝে তাল মিলিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় ডিকেওয়াল্লার ব্যাট ছুঁয়ে আসা বলটি গ্লাভসবন্দী করলেন লিটন! অথচ রিভার্স খেলতে দেখে শুরুতে একটু বাঁদিকেই সরেছিলেন, লিটন তারপরও বলের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচালেন চিতার ক্ষিপ্রতায়!

শেষ দিনে ব্যাটসম্যানদের মানসিকতায় টিকে থাকার এই ক্ষিপ্রতা আর জেদ বহাল থাকলে মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়তে পারবে বাংলাদেশ। সাকিব-মুশফিকদের সামর্থ্যটা আছেই, এখন সেটি কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে অনূদিত করার চ্যালেঞ্জ।