চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেমন ছিল বাংলাদেশের বিশ্বকাপ পথচলা?

১৯৯৭ সাল, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য স্মরণীয় এক অধ্যায়। মালয়েশিয়ায় বসা আসরে আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রার টিকিট অর্জন করে বাংলাদেশ। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষে খেলে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে। ২০১৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ টাইগারদের জন্য ষষ্ঠ আসর। সময়ের পরিভ্রমণে দেখে নেয়া যাক কেমন ছিল লাল-সবুজদের বিশ্বকাপ পথচলা।

নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে রোববার নেমে পড়ছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ সাউথ আফ্রিকা। ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস আসরের জন্য ১৫ সদস্যের দলে নেতৃত্বে দেবেন যথারীতি অদ্বিতীয় মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, তার ডেপুটির দায়িত্ব সামলাবেন সাকিব আল হাসান।

আগের পাঁচ বিশ্বকাপে টাইগারদের সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে গত বিশ্বকাপে এই সাফল্য ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। এমনিতে অন্য বিশ্বকাপগুলোতে বাংলাদেশের প্রদর্শনী একেবারে খারাপ নয়! ২০০৩-এ সাউথ আফ্রিকা আসরে কোনো জয় মেলেনি কেবল।

তাছাড়া ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে যেয়েই পাকিস্তানকে হারিয়ে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসে লাল-সবুজরা। সেবার দুই জয় নিয়ে ফেরে। অন্য তিন বিশ্বকাপের প্রত্যেকটিতে তিনটি করে জয়। ইংল্যান্ডকে দুবার-সহ ভারত-সাউথ আফ্রিকাকে হারানোর অভিজ্ঞতাও আছে। সবমিলিয়ে বিশ্ব আসরে ৩২ ম্যাচ খেলে ১১ জয়ের পিঠে ১৯ হার ও ফলহীন দুটি ম্যাচের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পাশে।

প্রথম দৈত্যবধ, পাকিস্তানকে বিশ্বকাপে হারানোর পর বাঁধনহারা উল্লাস (১৯৯৯)

১৯৯৯ বিশ্বকাপ, অস্ট্রেলিয়ার জয়গাঁথার শুরু। শুরু বাংলাদেশেরও। বিশ্বমঞ্চে প্রথমবার যাওয়া টাইগারদের নেতৃত্বে আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ১২ দেশের আসরে টেস্ট খেলুড়ে ৯ দেশের সঙ্গী আইসিসি ট্রফি জয়ী বাংলাদেশ। আছে কেনিয়া ও স্কটল্যান্ড।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়টি পায় টাইগাররা। ২৪মে, ৯ উইকেটে ১৮৫ করা বাংলাদেশ স্কটিশদের ১৬৩ রানে গুটিয়ে দিয়ে তুলে নেয় ২২ রানের জয়। পরের জয়টি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া। পাকিস্তানের বিপক্ষে। নর্দাম্পটনে নতুন ইতিহাস লেখার দিনে ২২৩ রানের সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। পরে পাকিস্তানকে অলআউট করে দেয় ১৬১ রানে। ব্যাটে ২৭ রান, আর বোলিংয়ে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা খালেদ মাহমুদ সুজন।

পরের বিশ্বকাপ ২০০৩ সালে। সাউথ আফ্রিকার ওই আসর ভুলেই যেতে চাইবে বাংলাদেশ। দুঃস্বপ্নের সেই আসরে টেস্টে পূর্ণসদস্য দেশের মর্যাদা নিয়ে খেলতে যায় টাইগাররা। গ্রুপ ‘বি’তে স্বাগতিকদের সঙ্গে বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া ও কানাডা। কেনিয়া যে আসরে সেমিফাইনালে খেলেছিল। আর টেস্ট না খেলা কেনিয়া ও কানাডার বিপক্ষে হেরেছিল বাংলাদেশ। নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে উইন্ডিজের বিপক্ষে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচ ছাড়া বাকি সব লড়াইয়ে হারে টাইগাররা, হারের সংখ্যাটা ৫!

চার বছর ঘুরে পরে আসর ২০০৭ সালে। অস্ট্রেলিয়ার হ্যাটট্রিক শিরোপার জন্যই যে বিশ্বকাপকে মনে করা হবে বেশি। তবে টাইগারপ্রেমীরা মনে রাখবেন, দুঃস্বপ্নের পথ ফেলে চার বছর পর বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের কথা। প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোনোর কথাও। আসরে অংশ নিয়েছিল ১৬ দেশ। আসে সুপার এইট ভাবনা। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বারমুডা। বাংলাদেশ সুপার এইটে জায়গা করে নেয়। যেখানে তারা শক্তিশালী সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে চমক দেয়।

ভারত বধের পর (২০০৭)

ভারতের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগেরদিন হাবিবুল বাশারের দলের কাছে উড়ে যায় বিষাদের খবর, অলরাউন্ডার মানজারুল ইসলাম রানার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। পরে শোক হয় শক্তি। মাশরাফীর ৪ উইকেট, রফিক-রাজ্জাকের ৩টি করে উইকেটে ভারতকে তিন বল হাতে রেখে ১৯১ রানে গুটিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে তরুণ তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের ফিফটিতে আসে জয়।

ভারতকে হারানোর পর সেবার বারমুডা ও সাউথ আফ্রিকাকে হারায় বাংলাদেশ। মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সুপার এইটে প্রোটিয়াদের হারানো গেলেও ওই পর্বে বাকিসব ম্যাচ হেরে বাড়ির পথ ধরতে হয়।

বিশ্বকাপের পরের আসর ঘরের মাঠে। ২০১১ সালে ভারত, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথ আয়োজক হয় বাংলাদেশ। নিজের ষষ্ঠ আসরে এসে শচীন টেন্ডুলকারের কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার মঞ্চে নিজেদের আলো ছড়ানো পারফরম্যান্স ছিল টাইগারদেরও। সাকিব আল হাসান তখন অধিনায়ক।

আসরে বাংলাদেশের প্রথম জয়টি আসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে, শেষে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। আর মাঝে এক ঐতিহাসিক জয় আনে লাল-সবুজরা। চট্টগ্রামে পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়। যদিও পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ রানে গুটিয়ে যাওয়ার লজ্জা মিলেছে। সেটির সঙ্গী হয় সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার বিষাদও।

মনে রাখার মতো কিছু করতে পারেনি পাইলটের দল (২০০৩)

গত আসরে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতেও স্মরণীয় অর্জন আছে বাংলাদেশের। আজ টাইগার ক্রিকেটের যে বদলে যাওয়া জাগরণী গান, সেটির শুরুও হয় ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ থেকেই। বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য আসে, প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার মধ্য দিয়ে।

ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে খেলতে না পারায় চোখের জলে টাইগারপ্রেমীদের মন ভারি করে দেয়া মাশরাফী এবার অধিনায়ক। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশের ক্রিকেট ছুঁয়েছে নতুন উচ্চতা। নিজেদের পঞ্চম আসরে এসে মাহমুদউল্লাহর ব্যাটে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ সেঞ্চুরির দেখা পায় লাল-সবুজরা, মাহমুদউল্লাহ পরের ম্যাচেই করেন আরেকটি শতক। প্রথমটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, পরেরটি নিউজিল্যান্ডের।

আসরে ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী ছিল যৌথ স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড, আর ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, স্কটল্যান্ড ও আফগানিস্তান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টিতে ভেসে যায় বাংলাদেশের ম্যাচ। আফগানিস্তানকে হারিয়ে শুরু করা টাইগাররা পরে হারায় স্কটল্যান্ডকে। আর ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিয়ে চলে যায় কোয়ার্টারে। সেখানে ভারতের বিপক্ষে বহু বিতর্ক ছড়ানো এক ম্যাচে হেরে থামতে হয় বাংলাদেশকে। রুবেল হোসেনের ফুলটস বলে মিডউইকেটে রোহিতের ক্যাচ নিয়েছিল বাংলাদেশ। ‘নো’ বল ডাকেন আম্পায়ার, টিভি রিপ্লে বলছিল ‘নো’ ছিল না। সেটা প্রথম, পরে রায়নার ক্যাচ নেয়ার সময় বাউন্ডারি লাইন ছোঁয়ার রিপ্লেরও সাড়া দেননি টিভি আম্পায়ার। ওই ম্যাচে মাঠের দায়িত্বে ছিলেন আলিম দার ও ইয়ান গৌল্ড। ১০৯ রানের বড় হারে শেষ হয় টাইগারদের স্মরণীয় বিশ্বকাপযাত্রা।

সময়ের সাথে সাথে অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারি করেছে বাংলাদেশ। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নামছে। হাজারের উপর ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্কোয়াড। প্রত্যয় আর প্রত্যাশা মিললে টাইগার-দ্যুতি ছড়াবে ইংল্যান্ড আসরেও। চার বছর আগের বিশ্বকাপে যে অন্যরকম ক্রিকেট খেলার যাত্রা শুরু করেছিল টাইগাররা, সে পথ ধরে সাফল্য রেখাটা ঊর্ধ্বগামী করার চ্যালেঞ্জ আবারও।

ঘরের মাঠের আসরে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর (২০১১)

গত আসর ও এই আসরের মাঝে বাংলাদেশ চড়াই-উতরাইও দেখেছে অনেক। সময়টাতে নিধাস ট্রফির ফাইনাল, এশিয়া কাপের ফাইনাল, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা নিজেদের উচ্চতাটা বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশকিছু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়সহ জায়ান্ট প্রতিপক্ষদের মাঝেমধ্যেই হারানোর স্মৃতিও সঙ্গী হচ্ছে। আর সদ্য টাটকা যে স্মৃতি, আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়।

বিশ্বকাপের মঞ্চ যদিও সেসব থেকে ভিন্ন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধ কন্ডিশনে বড় পরীক্ষাই দিতে হবে মাশরাফী-তামিমদের। প্রত্যাশার পারদও থাকবে আকাশচুম্বী। বলতে গেলে নিজেদের ইতিহাসে সেরা বিশ্বকাপ দল নিয়েই ইংল্যান্ডে গেছে বাংলাদেশ। তরুণ-অভিজ্ঞতার মিশেলে নিজেদের দিনে যেকোনো প্রতিপক্ষকেই প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ফেলার মতো এক দল।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দল: তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, মোহাম্মদ মিঠুন, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা (অধিনায়ক), মেহেদী হাসান মিরাজ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, আবু জায়েদ রাহি।