চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেমন আছেন, আনিস ভাই…

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়—১৯৫২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম। বেঁচে থাকলে আজ সাতষট্টিতে পা দিতেন। জন্মদিনটি তিনি কীভাবে পালন করতেন অথবা এই দিনে সাংবাদিকদের কঠিন কোনো প্রশ্নের কী বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিতেন—সেটি ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে, বহুদিন আগে বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘ইত্যাদি’তে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে উপস্থাপক হানিফ সংকেত প্রশ্ন করেছিলেন, ঢাকার মেয়র হলে আপনি কী করবেন? জবাবে স্যার বলেছিলেন, ‘আমি এমন কাজ করব যাতে এই শহরে কেউ পা রেখেই বুঝতে পারে, এখানে একজন মেয়র আছেন।’

অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ওই বক্তব্যের আগে-পরে এই মহানগরীর মেয়রের চেয়ারে অনেকেই বসেছেন। কিন্তু অনেক সময়ই নাগরিকদের মনে সংশয় জেগেছে যে, আদৌ এখানে কোনো মেয়র আছেন কি না? সেই সংশয় প্রথমবারের মতো দুর করছিলেন যে মানুষটি—তার নাম আনিসুল হক। কিন্তু উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচিত হবার পর থেকেই ঢাকাকে বদলে দেয়ার যে অদম্য, সাহসী আর ইনোভেটিভ যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেটি মাঝপথেই থমকে যায়। দুই বছরের মতো দায়িত্ব পালনের পরে দুরারোগ্য ব্যাধির কাছে হার মেনে গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিদায় নেন, এই মহানগরীর মানুষের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘স্বপ্নদেখানো মানুষে’ পরিণত হওয়া আনিসুল হক—যিনি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের সেই বাক্যেরই প্রতিধ্বনি করতেন, ‘স্বপ্ন সেটি নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে; বরং স্বপ্ন হচ্ছে সেটি, যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’

ঢাকা মহানগরীর চেহারা বদলে দেয়ার যে স্বপ্ন আনিসুল হক আমাদের দেখিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন তাকে আসলেই ঘুমাতে দেয়নি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার যে জঞ্জাল বাসা বেঁধেছিল রাজনীতি-অর্থনীতি-অপরাধ আর ক্ষমতার এই কেন্দ্রবিন্দুতে—সেটির চেহারা রাতারাতি পাল্টে দেয়া যে রীতিমতো অসম্ভব, সেটি আনিসুল হক নিজেও জানতেন। বিভিন্ন সময়ে তার কথায় সেই অসহায়ত্ব আর ক্ষোভও ফুটে উঠতো। কিন্তু তারপরও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কী করে জনগণের পক্ষে লড়াই করতে হয়, তার একাধিক উদাহরণ তিনি মাত্র দুই বছরেই তৈরি করেছিলেন। কিন্তু শেষটা হলো না। এই মহানগরীতে অন্তত দুই মেয়াদে মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে পারলে আমরা যে তিলোত্তমা ঢাকা শহরের কথা বলি—সেই স্বপ্নের শহর তিনি গড়ে তুলতেন—এ নিয়ে বোধ করি নাগরিকদের কোনো সংশয় নেই।

কিন্তু আনিসুল হক আমাদের মাঝে নেই। এটি ভাবতেও বুকের ভেতরে এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়। আনিসুল হককে আমরা যদি শুধু একজন রাজনীতিবিদ কিংবা শুধু একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচনা করি—তাহলে এই হাহাকার তৈরি হবার কথা নয়। কিন্তু আনিসুল হক শুধু একজন রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রতিনিধিই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সংবেদনশীল এবং প্রচণ্ড বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী মানুষ—যিনি মানুষের কাছে যেতেন।

এখনও অনেক রাজনীতিবিদ মানুষের কাছে ছুটে যান। কিন্তু তার বড় অংশই লোকদেখানো, মেকি এবং ভোটের রাজনীতি। আনিসুল হকও ভোটের রাজনীতি করেছেন। কিন্তু দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে যেভাবে ভালোবাসতো এবং পছন্দ করতো এবং তারউপর নির্ভর করতো—সেটি এক বিস্ময়। মানুষকে কাছে টানার এক অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা তার ছিল। ধারণা করি, নানা কারণে তার সমালোচনা করেছেন এমনও অনেকে হয়তো তার কাছে গিয়ে, তার সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলার পরে তার ভক্তে পরিণত হয়েছেন। তিনি জানতেন হাউ টু ডিল উইথ পিপল। হাউ টু ডিল উইথ জার্নালিস্ট।

রাজনীতির জটিল-কুটিল বৃত্তের ভেতরে থেকেও নিজেকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নাগরিকের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া শুধু সাহসিকতারই বিষয় নয়, বরং যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব লাগে—তা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল আনিসুল হকের। কিন্তু তারপরও ঢাকাকে বদলে দেয়ার মিশনটি তিনি শেষ করতে পারলেন না।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে এখন সুদৃশ্য, পরিপাটি যেসব পাবলিক টয়লেট দেখা যায়, আনিসুল হক মেয়র হওয়ার আগে আমরা এরকম পাবলিক টয়লেট দেখেছি দেশের বাইরে, বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রে। ঢাকার আকাশ এখন বিলবোর্ডের জঞ্জালমুক্ত। কারওয়ান বাজার রেল ক্রসিং থেকে সাতরাস্তার মোড় পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের পথটুকুতে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা জানেন এখানে একটা সময় কী বীভৎস অবস্থা ছিল। রাস্তার উপর ট্রাকের পর ট্রাক, ময়লা, ধুলা, দুর্গন্ধ। কিন্তু ট্রাক মালিক-শ্রমিকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তিনি কীভাবে এই রাস্তাটি পরিস্কার করেছেন এবং ডিভাইডার দিয়ে পুরো এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছেন, সেটির প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজে। কারণ প্রতিদিন এ পথেই অফিসে যাতায়াত করি।

গুলশান-বারিধারার মতো অভিজাত এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে তিনি যেসব অভিযান চালিয়েছেন, যেভাবে ক্ষমতাবানদের চ্যালেঞ্জ করছেন, জনগণের ওপর আস্থা না থাকলে এবং তার ওপর মানুষের ভরসা না থাকলে এটি সম্ভব হতো না।

আনিসুল হকরাজধানীর অন্যতম বড় সমস্যা যে যানজট—সেটি দূর করতে তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি আনিসুল হকের সেইসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যে কমিটি হয়েছে, তার প্রধান করা হয়েছে দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকনকে। তিনি যদি এই কাজে সফল হন, তাহলে সেটিই হবে আনিসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।

জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা, শ্রদ্ধেয় আনিসুল হক, প্রিয় আনিস ভাই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)