চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেন শিক্ষিত যুবরা জঙ্গি হচ্ছে

জঙ্গিরা তাদের কৌশল পাল্টে গত কয়েক বছর থেকেই বড় ধরনের টার্গেটের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। আগে তাদের টার্গেট ছিল ব্যক্তিবিশেষ, এখন তাদের টার্গেট হচ্ছে ব্যক্তিসমষ্টি ও প্রতিষ্ঠান।

বিজ্ঞাপন

জঙ্গিরা তাদের কৌশল পাল্টালেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী শত্রুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের প্রতিহত বা মোকাবিলার জন্য পাল্টা কৌশল রচনা করতে পারেনি; অন্য কথায় ব্যর্থ হয়েছে। যেমনটি ঘটেছে শ্রীলঙ্কায়।

শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলার কারণ নিয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে। তবে এই হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সংযোগ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সাধারণভাবে আমরা দেখেছি, পশ্চিমা দেশ আর খ্রিস্টানদের গির্জাগুলো আইএসের নিশানা।

ইরাক আর সিরিয়ার ঘাঁটি থেকে আইএস-কে উৎখাত করেছে পশ্চিমা দেশগুলোর একটা জোট। আইএস মনে করে, পশ্চিমা দুনিয়াকে আদর্শগত ভাবে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে খ্রিস্টধর্ম। শ্রীলঙ্কা-সহ সারা বিশ্বেই স্থানীয় শাখাগুলোকে ব্যবহার করে মুসলিমদের মৌলবাদের পথে চালিত করছে আইএস।

তারা যখন যেখানে সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে হোলি আর্টিজান হামলার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। পশ্চিম-খ্রিস্টান আর ইসলামি মৌলবাদ— এই দুইয়ের একটা সংঘাত চলছে দুনিয়া জুড়ে।

শ্রীলঙ্কার গির্জায় হামলা, নিউজ়িল্যান্ডে মসজিদে হানা—সবই এই সংঘাতের ফসল বলে মনে করছেন অনেকেই। শ্রীলঙ্কার এক মন্ত্রীও বলেছেন, ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকাণ্ডের বদলাই হয়তো কলম্বোর গির্জায় হামলা।

কলম্বোর তিনটে পাঁচতারা হোটেলে হামলার ব্যাপারটাও নজর করার মতো। শাংগ্রি-লা, সিনামন গ্র্যান্ড, কিংসবেরি— সবই পশ্চিমা নাগরিকদের পছন্দের হোটেল। জঙ্গিরা জানত, বিশ্ববিখ্যাত এই হোটেলগুলোয় হামলা চালালে প্রচার যেমন পাওয়া যাবে, তেমনই ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে পশ্চিমা নাগরিকদের মধ্যে।

শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেওয়া তরুণ-যুবকদের অধিকাংশই উচ্চ-শিক্ষিত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তারা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট স্বাবলম্বী। হামলাকারীদের একজন ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলো।

যে আটজন আত্মঘাতী হামলাকারীকে এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজন সহোদর। এই দুই ভাই কলম্বোর ধনী এক মসলা ব্যবসায়ীর ছেলে। এই দুই ভাই কলম্বোর দুটো হোটেলে হামলা চালায়। এক ভাইয়ের নাম-ঠিকানা পাওয়ার পর তার বাড়িতে কমান্ডো পুলিশ গেলে ভেতরে এক ভাইয়ের স্ত্রী বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণে ঐ নারী এবং তার দুই ছেলে মারা যায়। সাথে নিহত হয় তিনজন পুলিশ কমান্ডো।

তার মানে পুরো পরিবারটিই জঙ্গি মতবাদের দীক্ষিত হয়েছিল।  স্বচ্ছল পরিবারের বিদেশে পড়াশোনা করা উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের নাম জড়াচ্ছে বিস্ফোরণের চক্রান্তে, যা খুবই উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো খবর। যাদের এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা তারাই যদি জঙ্গি হয়ে ওঠে তাহলে জঙ্গি হামলা ঠেকানো যাবে কীভাবে? বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই প্রধানত এ ধরনের সহিংস সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের মাত্র দুজন বাদে সবাই বিদেশে লেখাপড়া করেছিল।  বাংলাদেশের পুলিশও বিভিন্ন সময় বলেছে, ধর্মীয় উগ্রপন্থায় জড়িতদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, ধনী ঘরের সন্তান। প্রশ্ন হলো, কেন এই প্রবণতা? এর একটা কারণ নিঃসন্দেহে পশ্চিমা রাজনীতি। মুসলিম বিদ্বেষ। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খুবই গরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি তৎপরতার পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি রয়েছে।

এই আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় বন্ধু দেশগুলো দ্বারা। আর তাদের সঙ্গে মিত্র হিসেবে কাজ করছে আরবের রাজতন্ত্রগুলো ও ইসরায়েল।  এটা আজ আর কারও অজানা নয় যে, মিথ্যা অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যে পশ্চিমা আগ্রাসী অভিযান চলে তা-ই জন্ম দিয়েছে আজকের আন্তর্জাতিক জঙ্গি তৎপরতা।

ভৌগলিক ও মুসলমানপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে আমাদের দেশ টার্গেট হয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি কর্মকাণ্ডের। আর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষের সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে। অনেক সময় ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ বা আত্মপরিচয়ের সঙ্কট থেকেও এই ধর্মীয় উগ্রপন্থায় দীক্ষার সূচনা হয়।

এই সংকটের সুযোগে বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী তাদের জিহাদী মতবাদ নিয়ে হাজির হয়। ধনী ঘরের অনেক সন্তান জীবনের একটি পর্যায়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করে। অনেক সময় ধর্মবাদের প্রভাবে তাদের মধ্যে অনুশোচনাবোধ তৈরি হয়।

আত্মশুদ্ধির চিন্তা ঢোকে তাদের মাথায়। এই অবস্থায় তাদেরকে ধর্মীয় উগ্রবাদে দীক্ষিত করা সহজ হয়ে পড়ে। আর বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যারা জেহাদি ‘রিক্রুট’ করার কাজে লিপ্ত, তারা বিভিন্ন দেশের মুসলিম সমাজের এই ধরনের উচ্চবিত্ত পরিবারের মানসিকভাবে নাজুক অবস্থায় পড়া তরুণ-যুবকদের টার্গেট করে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের বিভিন্ন সঙ্কট সম্পর্কে বিকল্প ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অভাবে অনেক মুসলিম তরুণ যুবক ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দেওয়া ন্যারেটিভে আকর্ষিত হয়ে পড়েছে।

কেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা জঙ্গি আইএস ও আল-কায়েদার প্রচারণায় আকৃষ্ট হচ্ছে, তা বিরাট গবেষণার বিষয়

তবে আইএস ও আল-কায়েদার প্রচারণা ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, যা কেবল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরাই ব্যবহার করতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুসলমানদের একটা অংশ কেন খিলাফত যুগে ফিরে যেতে চায় তা অবশ্য ভাববার বিষয়।

যাহোক, সোশ্যাল মিডিয়া এমনই শক্তিশালী মাধ্যম যে হাজার হাজার মাইল দূরে বসে একজন আরেকজনের সঙ্গে বার্তা বিনিময় ও আলাপ-আলোচনা করতে পারে। সশরীরে উপস্থিত না থেকেও কার্যকরভাবে বার্তা ও মতবিনিময় করা যায়, যা পরস্পরের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

সুতরাং সশরীরে বা সাংগঠনিকভাবে উপস্থিত না থেকেও আইএস বা আল-কায়েদা তার অনুসারীদের মাধ্যমে কর্মকাণ্ড চালাতে সক্ষম। এদের বলা হলা হচ্ছে home-grown বা দেশজ জঙ্গি।

শ্রীলংকায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় বিভিন্ন কট্টর মুসলিম সংগঠনের জড়িত থাকার ঘটনার কথা প্রচার মাধ্যমে আসায় ভয়াবহ সংকটে পড়েছে সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রোষের মুখে পড়ার ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন তাঁরা। পাল্টা হামলার ভয়ে শুক্রবার তারা মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় থেকে বিরত থেকেছেন।

শ্রীলঙ্কার ২ কোটি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১০ শতাংশ মুসলিম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুদের পরেই রয়েছে মুসলিমরা। জনসংখ্যার সাত শতাংশ খ্রিস্টান। সংখ্যাগরিষ্ট অংশ বৌদ্ধ সিংহলি। ২০০৯ সালে শ্রীলংকায় প্রায় দুই যুগ ধরে চলা ভয়াবহ রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের অবসান হয়।

যদিও গোষ্ঠী হিংসার অবসান হয়নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালে মুসলিমদের দোকানপাটে হামলা চলেছে। হামলা চলেছে গত বছরও।

এমনকি গুজব ছড়িয়েছিল, সিংহলিরা মুসলিমদের দোকান থেকে খাবার কিনে খেলে বন্ধ্যাত্বের শিকার হবেন। কিন্তু সেসব ঘটনা রক্তক্ষয়ী কোনো পরিস্থিতির জন্ম দেয়নি।

এবারের ঘটনা স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। গির্জা ও হোটেলে ধারাবাহিক হামলার পর থেকে শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্ব রক্ষার ডাক দিয়ে আসছেন শ্রীলঙ্কার নেতারা। কিন্তু সম্প্রীতি রক্ষার এত চেষ্টা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি অন্য কথা বলছে।

এই নারকীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তীব্র আবেগ কাজ করছে মানুষের মধ্যে। যারা জিহাদ কিংবা প্রতিশোধের নামে গির্জা, হোটেল, পশ্চিমা জনগোষ্ঠী কিংবা খ্রিস্টানদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করছে, তারা যে নিজ স্বজাতিদের কী ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।

কাজেই শ্রীলঙ্কায় ‘ভিন্ন ধর্মের লোকেরা মরেছে’ বলে আত্মতুষ্টির বা নিশ্চিন্তে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের দেশে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে আরও ব্যাপক ও কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় বয়ান প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিঙ্গাপুরে ‘সৌহার্দ্য আইন’ নামে একটি আইন চালু আছে দীর্ঘদিন ধরে। এই আইনের আওতায় বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা ও উস্কানিমূলক কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ১৯২২ সালে সিঙ্গাপুরে এই আইন পাশ হয়েছিল। এই আইনের আওতায় প্রয়োজন পড়লে যে কোনও ধর্মগুরু বা নেতার ‘উস্কানিমূলক’ ধর্মীয় জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

অন্য ধর্মের সমালোচনা করে কোনও বার্তা ছড়ানোর চেষ্টা হলেই তা ‘সৌহার্দ্য আইন’ লঙ্ঘন করার চেষ্টা হিসেবে ধরা হয়।  এই আইনটি আমাদের দেশেও প্রবর্তন করা জরুরি। তাতে উস্কানিমূলক ভাষণকে অপরাধের তকমা দেওয়া যাবে। আমাদের দেশেও ধর্মের নামে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত বিদ্বেষ ও উস্কানি ছড়ায়। তাদের এই বক্তব্যে অনেকে উদ্বুব্ধও হয়।

এ্ ধরনের বক্তব্যকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা হলে হয়তো অনেক যুবককে কট্টর মতাদর্শ থেকে সরিয়ে আনা যাবে।  অন্যের বিপদে আমরা সহমর্মিতা জ্ঞাপন করতে চাই। একইসঙ্গে নিজেরা যেন সে ধরনের বিপদের মধ্যে না পড়ি সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)