চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কী ছিলো জার্মানির সেই গবেষণা প্রতিবেদনে?

বাংলাদেশ স্বৈরতান্ত্রিক নয়

জার্মান বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ গত ২৩ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ১২৯টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীনে এবং ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সাথে বাংলাদেশকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিষয়টি নাড়া দিয়েছে বাংলাদশের প্রত্যেকটি দেশপ্রেমী জনগণকে। এমনকি জাতীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকেরা এ প্রতিবেদনের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, যখনই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করছে এবং দেশের মানুষ আনন্দ উল্লাস করছে ঠিক সেই মুহূর্তে এই আনন্দকে ম্লান করার জন্য এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলেও দাবি করেন তারা।

অপরদিকে, জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’-এর সমীক্ষায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে তা বিএনপির এত দিনের বক্তব্যের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, ‘জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান “বেরটেলসম্যান স্টিফটুং” এর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীনে। নিচের দিক থেকে ৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি, যেখান থেকে গণতন্ত্র বিদায় নিয়েছে এবং স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, আমরা যারা যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম, তারা অত্যন্ত লজ্জাবোধ করছি। একইসঙ্গে এর নিন্দা জানাচ্ছি। সরকার স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে দেশেকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমরা (বিএনপি) এতোদিন বলে আসছি- দেশে গণতন্ত্র নেই। সেটা আজ বিশ্বে স্বীকৃত হয়েছে এবং এর প্রতিফলন হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের মাধ্যমে।’

‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ জার্মান ভিত্তিক একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।প্রতিষ্ঠানটি গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক রুপান্তরের পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার গুণগত বিচার বিবেচনা করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এই রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে।

বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিষয়টি বিস্তারিত জানার আগ্রহ থেকে এ প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি, গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কিত বেশ কিছু প্রশ্ন করে জার্মান প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ কে চিঠি লিখি গত ২৪ মার্চ শনিবার। তারা চিঠির উত্তর পাই ২৬ মার্চ সোমবার। তাদের উত্তরে বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্রটি খুব ইতিবাচক ভাবে তারা উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি বিগত ২০১৫ থেকে ২০১৭ এর সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি লেখেন। তারা ৩৫ পাতার বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং তাদের গবেষণা পদ্ধতির স্বচ্ছতার বিষয়টি উল্লেখ করে নির্ভরযোগ্য লিঙ্ক পাঠান। তাদের পাঠানো বিস্তারিত প্রতিবেদনটি পড়ে বিষয়টি সকলের নজরে আনার তাগিদ অনুভব করলাম। চলুন দৃষ্টি দেয়া যাক, জার্মান গবষেণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’-এর বাংলাদেশ নিয়ে লেখা ৩৫ পাতার প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তুর দিকে।

বাংলাদেশ নিয়ে লেখা প্রতিবেদনের রুপান্তরের সূচকের সময়সীমা ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ থেকে ৩১ জানুয়ারী ২০১৭ পর্যন্ত। রিপোর্ট এর শুরুতে নির্বাহী সারসংক্ষেপ অংশের আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড , অরাজকতা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

দ্বিতীয় বাক্যটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর সারা দেশ ব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ১৯৭ জনের মৃত্যু, ৭২ জনের জীবিত অবস্থায় আগুনে পোড়ার ঘটনার জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করা হয়েছে। সাধারণ জনগনের আস্থা হারিয়ে এবং সহিংসতার জন্য সাধারন জনগণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে ৯২ দিনের মাথায় তথাকথিত হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করার বিষয়ে বলা আছে।

এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয় বলে তারা মত প্রকাশ করেছে। বিশেষত পোশাক শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী সেসময় পোশাক খাতের দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৮.৪২ কোটি টাকা, যাতায়াতে ৩০০ কোটি টাকা, শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনে ১০০ কোটি টাকা, কৃষিতে ২৮৮ কোটি টাকা, আবাসন শিল্পে ২৫০ কোটি টাকা এবং পর্যটনে ২১০ কোটি বাংলাদেশি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে এসময় দায়ের করা অসংখ্য মামলা এবং বিনপি ও জামায়াতে ইসলামি নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ আছে।

বিজ্ঞাপন

তখনকার প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার নামে এসময় প্রচুর দুর্নীতি মামলার বিষয় প্রতিবেদনে লেখা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান ২ দলের মধ্যেকার উদ্ভুত এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাহত করছে বলে তারা মতামত দিয়েছেন। এর পাশাপাশি দেশে ব্লগার হত্যা, গুম হওয়া, গুলশান অ্যাটাকের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে উঠে এসেছে।

নির্বাহী সারসংক্ষেপের পরবর্তী অংশটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকটি জোরালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ৭.১১ প্রবৃদ্ধির হার ও মাথাপিছু জিডিপি ৯৭২.৮৮ মার্কিন ডলার নিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মাথাপিছু জিডিপির ১৮ বিলিয়ন বাংলাদশি টাকায় উন্নীত হওয়ার পেছনে শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন, কৃষি, যাতায়াত ও সেবা খাতকে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈদেশিক রপ্তানি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি বিষয়গুলো ইতিবাচক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের বেকারত্বের চিত্রটিও ফুটে উঠেছে।

পরবর্তী অংশে রুপান্তরের প্রেক্ষাপট হিসেবে ১৯৭১ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইতিহাস বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। রুপান্তরের অবস্থাকে রাজনৈতিক রুপান্তর, অর্থনৈতিক রুপান্তর, শাসন ব্যবস্থার রুপান্তর, রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান, জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ বিস্তারিত আলোচনায় এসেছে।

প্রতিবেদনটি পড়ার পর আমার কোন দিক থেকেই মনে হয়নি কেবল এই মানদণ্ডগুলো দিয়ে একটি দেশেকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচয় দেয়া যায়। তবে তাদের আলোচ্য বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই বলে এ নিয়ে দোষারূপের রাজনীতির দিকে ধাবিত হওয়া ঠিক নয়।

একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট নিয়ে সেটাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে কোন দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে কোন উপসংহারে যাওয়া ঠিক নয়। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে আমাদের চিলের পেছনে ছুটলে চলবে না। পাশাপাশি নিউজটি শেয়ার দেয়ার নামে নিজের দলগত স্বার্থে দেশের ইমেজকে খারাপ করা উচিত না।

একটি গবেষণা রিপোর্ট এর উপর ভিত্তি করে অন্য একটি দেশকে নিয়ে বিরুপ মন্তব্য, ট্রল করে তাদের এবং নিজেদের অপমান থেকে বিরত থাকুন। বাংলাদেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এটি অবশই বর্তমান সরকারের একটি বিশাল অর্জন। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এই ইতিবাচক দিকটিও উঠে এসেছে। তাই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের অন্যদের মতামতের প্রতিও সহনশীল হতে হবে।

আবার বর্তমান সরকারের আমলে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন শুধু বর্তমান সরকারের সময়কেও নির্দেশ করে না। এর জন্য এককভাবে বর্তমান সরকার দায়ী হতে পারে না। এর সাথে বিরোধী দল, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশের মানুষ সম্পর্কিত।

এত কথা বলার একটিই কারণ, তা হল চলুন আমরা আর একটু জানাশুনা, পড়াশুনা বাড়াই। সমালোচনা গ্রহণের মন মানসিকতা তৈরি করি। যৌক্তিক জায়গা থেকে কথা বলি। প্রয়োজনে তীব্র সমালোচনা করি। জবাবদিহীতা চাই। যৌক্তিকভাবে প্রতিবাদ জানাই। এই দেশ আমার মা। আমরা আমাদের মায়ের সুন্দর মুখচ্ছবি দেখতে চাই। তাই দেশের ইমেজ এর প্রশ্নের সাথে কোনো ছাড় দেয়া চলবে না। সকলের এক দেশমাতার আঁচলে থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

সরকারের সুনির্দিষ্ট মহলের কাছে অনুরোধ, আপনারা জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে দয়া করে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে তাদের কাছে আমাদের যুক্তিগুলো উপস্থাপন করুন। আপনাদের কোন রকম সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে আমি অবশ্যই আপনাদের পাশে থাকব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।