চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কবে, আরেকটা সুবর্ণ সময়

ঠিক ঢাকায় যখন চলছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের উৎসব, তখন হতাশার বাণীটি দিলো এই শহরের সংস্কৃতির আভিজাত্যের সঙ্গে নিবিড় জড়িয়ে থাকা মধুমিতা সিনেমা হল। ‘নতুন ছবি নেই। তাই ব্যবসা চালু রাখার জন্য পুরোনো সাতটি ব্যবসাসফল ছবি দিয়ে মধুমিতা মুভিজ চলচ্চিত্র সপ্তাহের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চলচ্চিত্র প্রদর্শন প্রতিষ্ঠান মধুমিতা’(প্রথম আলো, ১৭ জানুয়ারি)

বিজ্ঞাপন

১৮ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে সাতদিন চলবে সাতটি এদেশীয় বাংলা সিনেমা। নিশান, সুজন সখী, দূরদেশ, মিস লংকা, এক মুঠো ভাত, নাচের পুতুল ও চাওয়া থেকে পাওয়া। একমাত্র ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ বাদে সবগুলো সিনেমা দেখা আছে আমার। নিশান হিন্দি সিনেমার কাট টু কাট। এক মুঠো ভাতও তাই। আর যদি এটা হয় খান আতার সুজন সখী; সাদাকালোয়- তাহলে আমাদের নিজেদের গল্প। এই সিনেমার নায়ক, ফারুক(এখন তিনি সংসদ সদস্য), নায়িকা, মিষ্টিমেয়ে খ্যাতি পাওয়া কবরী (তিনি ফারুকের আগেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন)। খান আতা মানে, খান আতাউর রহমান, যিনি ছিলেন টোটাল সিনেমাওয়ালা, তিনি অন্যরকম ভালোবাসায় নির্মাণ করেছিলেন সুজন সখী। তখনও ছবিটি ব্যবসা করেছে। আর এতো দিন পর মধুমিতা হল কর্তৃপক্ষ আশা করছেন এই আকালের দিনেও সুজন সখী ব্যবসা করবে। একই আশা সে সময়ের যৌথ প্রযোজনার ছবি দূর দেশ আর মিস লংকা-কে নিয়েও। আর এই বিশেষ সপ্তাহে ঢাকার সিনেমা দর্শকরা খুঁজে পাবেন বড্ড অসময়ে চলে যাওয়া নায়ক জাফর ইকবালকে-এক মুঠো ভাতে। পাওয়া যাবে জাভেদ নামে একজন নায়ক যে ছিলেন, তাকেও-নিশান ছবিতে।

কথা এখানে নয়, কথা হলো- মধুমিতা মুভিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলছেন, ‘হলে চালানোর মতো নতুন কোনো ছবি পাচ্ছি না। হল খোলা রেখে কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন

সংকটটা বোঝা যাচ্ছে? টের পাওয়া যাচ্ছে আঁধারটা কোথায়? শহরজুড়ে প্রতিদিন মানুষ বাড়ছে। মানুষ বাড়ছে দেশ জুড়ে। অথচ বাড়ছে না একটিও সিনেমা হল। পরন্তু কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিন একটা একটা করে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । আর ‘মধুমিতা’ হয়ে মধুমিতার মতো যে কয়েকটি টিকে আছে তাদেরও মরণদশা। হল চালানোর মতো ভালো, মানে ব্যবসাকরা সিনেমা পাওয়া যাচ্ছে না।
অথচ দেখুন, এখানে সেখানে সিনেমা নিয়ে কত কথা, কত হৈ চৈ। প্রতিবছর ভালো সিনেমার জন্য অনুদানও দিচ্ছে। তারপরও…।

নানা কারণে বাধ্য হয়ে উত্তরায় থাকি অনেক বছর। শহরের ভেতরে এতো বড় একটা শহর। নাম দেয়া হয়েছে ‘মডেল টাউন’। যদি আমি জানি না কোন বিবেচনায় উত্তরার নাম দেয়া হয়েছে মডেল টাউন। কতগুলো শপিংমল, খাবার হোটেলে আর আগাছার মতো বেড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া কী আছে এখানে! এতো দিনেও একটি সিনেমা হল হয়নি। নেই একটি মঞ্চ, নাটক বা থিয়েটারের জন্য। একটা সিনেমা দেখার জন্য পথের ক্লান্তি আর জ্যাম ঠেলে যেতে হবে বহুদূর। তাহলে আলোটা আসবে কী করে?

তারপরও আমরা বলি, আমরা চাই, চাইবোই- যেন বন্ধ হয়ে না যায় শহরের একটি সিনেমা হলও। সিনেমাওয়ালারা যেন স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলেন। ভালো সিনেমার জন্য যে আরো বেড়ে যায় সরকারি এবং বেসরকারি অনুদানের পরিমাণ। প্রতি সপ্তাহে না হোক, অন্তত প্রতি মাসে যেন একটা ভালো, একটা আলোচিত এবং ব্যবসা করার মতো সিনেমা নির্মিত হয়। অনেক অনেক সিনেমা হোক না, তার মধ্যে মন্দ ছবিও হোক। তবে মাঝে মাঝে এমন ছবি হোক যা বার বার দেখেও মনে হবে নতুন- উদাহরণ দিচ্ছি; জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাচালী, হীরক রাজার দেশে, কাঞ্চন জঙ্ঘা, ঋত্বিক কুমার ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা, সালাউদ্দিন জাকির ঘুড্ডি। আর একথাতো ঠিক যে, পশ্চিম বাংলায় বাংলা সিনেমার যখন সুদিন তখন বাংলাদেশেও সুবর্ণ সময় ছিলো। নায়ক রাজ্জাক, রহমান, সোহেল রানা, ফারুক, জাফর ইকবাল, আলমগীর, কবরী, সুজাতা, শাবানা, ববিতারা অনেকদূর টেনে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের সিনেমাকে।

তেমন ভালো সময়, সুবর্ণকাল ফিরে আসুক না অন্যভাবে; কেনো না, সিনেমা নিয়ে আমাদের আগ্রহ এখনো ফুরিয়ে যায়নি; যতই ঘরে ঘরে হানা দিক স্যাটেলাইট হাওয়া আর ইউটিউব!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)