চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ওয়াহিদুল হক: সাংস্কৃতিক জাগরণের অগ্রপথিক

আসিফ: ১৯৮৮ সাল। বই খুঁজে বেড়ানোর দিনগুলো। কর্মক্লান্ত এক সন্ধ্যায়। দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত সাময়িকীর একটি সংখ্যা (১৯৮৮, ২০ অক্টোবর) আমার চোখের সামনে দেখতে পাই। ক্লান্তচোখে আমি এটা নিয়ে নড়াচড়া করি। বিশাল একটি প্রবন্ধের দিকে বিরক্তিভরে তাকাই। শিরোনামটি ‘বিজ্ঞানীর’ শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেটাই কিছুটা উৎসাহ জোগালো মনোযোগে। এক প্যারা পড়ার পর আরেকটি প্যারা যেন টেনে ধরলো, আর ছুটতে পারলাম না। যেমন: সেখানে প্রথম প্যারায় লেখা রয়েছে: আপনার সংস্কৃতি বড়, তারটি ছোট- ভালবেসে তাকে কিছু জায়গা ছাড়বেন আপনি? বড়ো বলে এই অহঙ্কার আসে কোথা থেকে- সংস্কৃতি কি জায়গাজোড়া ভল্যুমেট্রিক ঘটনা, না ছড়িয়ে পড়া কাপড়ের মতো আয়তনভিত্তিক বর্গমিটারের ব্যাপার?… আবার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের একটা জায়গায় আছে: অঙ্ক করবার একটা ঘোর আছে, শিল্প গড়বারও ঠিক তাই থাকে, নিজের ভিতর নিজে ডুবে যাবার ঘোর।

বিজ্ঞাপন

আকর্ষণ অনুভব করলাম, আমার মনোযোগও বেড়ে গেল। প্রবন্ধে এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা বলা হচ্ছে, যিনি তখন লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে আসীন। এই আসনে নিউটনও ছিলেন।… আমি আটোসাটো হয়ে বসি। পড়তে থাকি গভীর মনোযোগে। তারুণ্যের প্রারম্ভে ওই সন্ধ্যায় হালকা ফ্যানের বাতাসে আমি যুক্ত হয়েছিলাম অসাধারণ এক অভিজ্ঞতার। রুদ্ধশ্বাসে সম্পূর্ণ পাঁচ হাজার চারশ শব্দের প্রবন্ধটি শেষ করলাম। এইবার প্রথম প্রবন্ধের শিরোনামের দিকে তাকালাম, বিজ্ঞানীর নৈঃসঙ্গ আর লেখক হচ্ছেন ওয়াহিদুল হক। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে লেখকের সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছিল। পরিচয় ঘটেছিল ‘চেতনা ধারায় এসো’ বইটির সঙ্গে। তারই কল্যাণে চিনতে পেরেছিলাম দুটো অসাধারণ চরিত্র: জ্যোতির্বিদ ইয়ান শেলটন ও পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং।

একটি লেখায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, সঙ্গীত আর রাজনীতি এভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ছিল এটি। প্রবন্ধটি আমাকে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। পরে জেনেছিলাম, তিনি রবীন্দ্রকাব্য ও সঙ্গীতচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ এক নিরলস কর্মী ও শিক্ষক ছিলেন। এ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক বোদ্ধা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। এসব কিছুর পাশাপাশি সমকালীন বৈজ্ঞানিক ভাবনাগুলোও তাকে তাড়িত করত।

এই লেখাই আমাকে তার সঙ্গে সাক্ষাতে ভীষণভাবে আগ্রহী করে তোলে। তার ১০ বছর পর বিজ্ঞান বক্তৃতার সুবাদে ডেইলি স্টার অফিসে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। এক ধরনের যাতায়াত এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। তাকে মির পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত একটি বই ‘স্পেস টাইম অ্যান্ড গ্র্যাভিটেশন’ পড়তে দেই। সপ্তাহ দুই তিনেক পরে দেখা করতে গেলে উনি আমাকে দেখে ভীষণভাবে উচ্ছ্বসিত হন। বলেন, আসিফ আমি ক্লিফোর্ডের নাম জানতামই না। তুমি এ ব্যাপারটায় আমাকে ঋণী করেছ।

এরও বছর দশেক পর তিনি আমাকে একদিন নালন্দা স্কুলে নিয়ে গিয়ে বললেন, এখানে তোমার সময় দিতে হবে। সেই থেকে ছায়ানটের নালন্দা স্কুলের সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়ি; শিশুশিক্ষাও আমার একটি বিষয় হয়ে পড়ে; মস্তিষ্ক বিবর্তনের অসংগতিগুলো দূর করার উপায়গুলো নিয়ে ভীষণভাবে ভাবতে থাকি। লোকায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাকে যুক্ত করার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হতে থাকে।

১ বৈশাখকে আমাদের জাতীয় উৎসবে রূপ দেবার স্বপ্নদ্রষ্টাদের মধ্যে ওয়াহিদুল হক ছিলেন নেতৃত্বস্থানে। আজ এদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা তার মূলে আছেন তিনি। দ্বিজেন শর্মার ভাষায়, ‘পূর্বোক্ত বাঙালির আত্মপরিচয়গত বিভ্রান্তি যারা ঘুচিয়েছেন তাতেও ‘যেসব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী’ কবিতার লেখক আবদুল হাকিমের মতো মনীষীদের সাথে চিরদিন উচ্চারিত হতে থাকবে ওয়াহিদুল হকের নামও।’

দ্বিজেন শর্মা ২০০৭ সালে সায়েন্স ওয়ার্ল্ডের মার্চের সংখ্যায় ‘সন্তের কথা’ শিরোনামে ওয়াহিদুল হকের ওপর একটি লেখা লেখেন। তিনি সেখানে বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়াননি কোনোদিন। হেলায় ফেলায় বিএটা পাস করেছিলেন। তা না করলেও পারতেন। পৃথিবীর সব পণ্ডিতই আসলে স্বশিক্ষিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাদের বিশেষ সহায়তা দেয় না। এমন পণ্ডিতরা বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, কেউ তাদের ডিগ্রির খোঁজ নেয় না; কিন্তু ভারত উপমহাদেশে ব্যাপারটা উল্টো। তারপরও এই সব বাধা অতিক্রম করে তিনি উঠে এসেছিলেন। পরিণত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অচ্ছেদ্য অংশে।

বিজ্ঞাপন

ওয়াহিদুল হককে সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) ২০০৮ প্রদান করা হয়। তিনি কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট স্বর্ণ পদক লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ২০০০ সালে বাংলা একাডেমী সম্মানসূচক ফেলোশিপ পান। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় ওয়াহিদুল হককে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১০’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। তার প্রকাশিত বইসমূহ হচ্ছে- চেতনা ধারায় এসো, গানের ভিতর দিয়ে, সংস্কৃতিই জাগরণের প্রথম সূর্য, প্রবন্ধ সংগ্রহ, ব্যবহারিক বাংলা উচচারণ অভিধান সংস্কৃতির ভুবন। ২০০০-২০০১ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুণী বাঙালি হিসেবে দু’জনকে পুরস্কৃত করা হয়; ওয়াহিদুল হক ছিলেন তাদের একজন। ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ নামে তার সারাজীবনে একটি মাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত অ্যালবাম ছিল।

রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, চিত্রকলাসহ অনেক বিষয়ে তার উৎসাহ সমান ছিল। এ উৎসাহের মধ্যে দিয়ে নিজেকে যেমন বিকশিত করতে চেয়েছিলেন, অন্যকেও করে গেছেন উদ্বুদ্ধ। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছায়ানটকে দাঁড় করিয়েছেন, তাই তাকে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও বলা হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সবসময় অগ্রভাগেই থাকতেন। কণ্ঠশীলনসহ বহু সংগঠনের সঙ্গেই তিনি জড়িত ছিলেন। সংস্কৃতিকে বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্যের একীভূতরূপে দেখেছেন। বিজ্ঞান বোধহীন সমাজে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ কীভাবে মানুষকে নিস্ক্রিয় করে দেয় সে বিষয়ে নিজে সজাগ ছিলেন, অন্যকে সতর্ক করে গেছেন। উপলব্ধি ছাড়া জ্ঞান কখনো কখনো বিপজ্জনক হতে পারে- সমাজ সংস্কৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির এ বিকাশ তারই ইঙ্গিত। ‘গণিত, সমাজ ও বাস্তবতা’ শিরোনামে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন।

ওয়াহিদুল হক সঙ্গীত ও শিল্পকলাকে বিশেষ বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে একই তালে মিলিয়ে দিতে চেয়েছেন। এবং ভেবেছিলেন এগুলো একীভূতভাবে সংযুক্ত করতে পারলেই শিক্ষা মানবিক হয়ে উঠবে। কেননা এ বিষয়গুলো মানবজাতির আদি বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। যা অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের ভাবনায়ও প্রবলভাবে লক্ষ্য করি। ১৯৩৩ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা জেলার ভাওয়াল মনহরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন মাজহারুল হক এবং মাতা মেওয়া বেগম। পিতা মাজহারুল হক ১৯৪৬ সালে ঢাকার নওয়াব হাবিবুল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ‘স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা’র প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করেছেন প্রবলভাবে। তার অন্যতম কারণ হলো, ’৪৭-এর দেশ বিভাগে আমাদের সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞানে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে যে বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছিল, সেটিকে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও তার চিন্তার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জোড়া লাগাতে চেয়েছিলেন।

পেশা হিসেবে সাংবাদিক হলেও ওয়াহিদুল হক ছিলেন একজন সংগঠক। তার আসল কর্মক্ষেত্র ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৯৯ থেকে আমৃত্যু সহ-সভাপতি ছিলেন। আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠশীলনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিকে ‘অভয় বাজে হৃদয় মাঝে’ ও ‘এখনও গেল না আঁধার’ শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন দৈনিক জনকণ্ঠ ও দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ১০ বছরেরও বেশি সময় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। আমার বিজ্ঞান বক্তৃতার বিষয়টি নিয়ে ৪টি লেখা লিখেছিলেন: ডেইলি স্টার, জনকণ্ঠ ও ভোরের কাগজে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার সময় আমরা ছিলাম। তখন আমি দেখেছি তার ছাত্র, অনুসারীরা কীভাবে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ছে। ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বারডেম হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আমরা অনুভব করেছি, বাংলাদেশ এক মহান শিক্ষককে হারাল, যিনি বাংলার সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখতে ঘুরে বেড়িয়েছেন অতীশ দীপঙ্করের মতো, কখনও হোমারীয় চারণ কবিদের মতো শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামে। আর কখনও গান, কখনও আলোচনার মাধ্যমে শুনিয়েছেন মানবতার সেই মর্মবাণী: মানুষ অশুভ শক্তির দাস নয়, তারও কিছু করার আছে। তিনি অজস্র মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষেরই শক্তি আর ভালোবাসার কথা বলেছেন।
মানুষকে পরিকল্পনার ইচ্ছাহীন গুটি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকা এই ভয়ঙ্কর করপোরেট সংস্কৃতি ও বিজ্ঞাপন নিপতিত সমাজে একাকী ছোট্ট ঝোলা নিয়ে হেঁটেছেন নিষ্ঠুর কংক্রিটের মধ্য দিয়ে। আর হেসেছেন এই ভেবে, জীবনের সরলতার অন্যরকম অর্থ আছে তা খুব কম মানুষই অনুভব করে।

বিখ্যাত বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ব্যাখ্যাকার জ্যাকব ব্রনোওস্কি বলেছিলেন, মানুষ অনন্য সেই কারণে নয় যে সে বিজ্ঞান জানে, মানুষ অনন্য সেই কারণেও নয় যে শিল্পকলা বোঝে, মানুষ অনন্য সেই কারণে যে সে বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মাধ্যমে এক বিপুল সম্ভাবনাময় জীবনধারা গড়ে তোলে। ওয়াহিদুল হক তার জীবনকে সে ধারায় প্রবাহিত করেছিলেন। আর এরই মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন সাংস্কৃতিক জাগরণের অগ্রপথিক। যে জাগরণের ওপর নির্ভর করছে আমাদের অস্তিত্ব।

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা।