চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ওহ মাই ফেয়ার লেডি! আনঅ্যান্ডিং লাভ ও বাংলাদেশ

‘পাশ্চাত্যে বসে আমরা জানি যে বাংলাদেশ বন্যা আর দুর্যোগের দেশ। কিন্তু আমার কাছে বাংলাদেশ মানে কবিতা আর সৌন্দর্যের দেশ।’ ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে ৬ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে এমনটি বলেছিলেন ফেয়ার লেডি। মাই ফেয়ার লেডি। আমাদের ফেয়ার লেডি। লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসের সে সময়ের প্রকাশিত সংবাদ এমন সাক্ষ্য দেয়।

বিজ্ঞাপন

অড্রে হেপবার্ণের সঙ্গে ১৯৮৯ সালের পোলিও নিধন কর্মসূচিীতে শাবানা ও ববিতা

রোমান ছুটি কাটানো রাজকন্যা তথা আমৃত্যু ইউনিসেফ এর দূত অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ণ মন জয় করে নিয়েছিলেন পুরো বাংলাদেশের। জাতিসংঘের হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি৷ হেপবার্নের কাজের প্রতি সম্মান জানাতে নিউ ইয়র্কে ইউনিসেফ-এর সদর দপ্তরে একটি প্রতিমূর্তি স্থাপন করেছে জাতিসংঘ৷ ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন অড্রে হেপবার্ন। ঢাকায় তিনি আসেন ১৯৮৯ সালের ১৮ অক্টোবর। এক সপ্তাহ থেকে চলে যান ২৪ অক্টোবর। বাংলাদেশে ইউনিসেফের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখেন তিনি। আজো সেই স্মৃতি আকড়ে আছেন চিত্রনায়িকা শাবানা এবং ববিতা। যারা তখন তার সঙ্গে সেসব কর্মসূচির অংশ হয়েছিলেন।

ওহ! মাই ফেয়ার লেডি

সেই অড্রে হেপবার্ন। শুধু হলিউড নয়, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় কেড়ে নিয়েছিলেন অড্রে হেপবার্ন তাঁর সৌন্দর্যর স্নিগ্ধতা এবং অনুপম অভিনয় শৈলীতে। ২০ শতকের হলিউডের বিশুদ্ধ প্রতিমা। তাঁর অভিনয় অসাধারণ করেছে ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’, ‘শ্যারেড’, ‘দ্য চিলড্রেন্স আওয়ার’, ‘প্যারিস হোয়েন ইট সিজলস’, ‘দ্য নানস স্টোরি’, ‘ফানি ফেস’, ‘হাউ টু স্টিল আ মিলিয়ন’, ‘মাই ফেয়ার লেডি’র মতো ছবিকে।

১৯৮৯ সালের বাংলাদেশে ‘মাই ফেয়ার লেডি’ অড্রে হেপবার্ণ

২০১০ সালের একটি জরিপে গত শতাব্দীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। কিউভিসি নামে সবচেয়ে বড় বিপণি চ্যানেলের সেই জরিপে গত শতাব্দীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন হেপবার্ন। অপর হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো হয়েছেন তৃতীয়। ওই জরিপে থাকা অপর কয়েকজন হলেন, অ্যাঞ্জলিনা জোলি, গ্রেস কেলি, স্কারলেট জোহানসন, হেলি বেরি, প্রিন্সেস ডায়ানা, কেলি ব্রুক ও জেনিফার অ্যানিস্টোন।  তাছাড়া এক জরিপে সর্বকালের সেরা ১০০ সিনেমার মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে তার অভিনীত সিনেমা। আমেরিকান ফিল্ম   ইন্সটিটিউট-এর তালিকায় তিনি মার্কিন সিনেমা ইতিহাসের তৃতীয় নারী কিংবদন্তী। আর ফ্যাশনে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের অন্যতম আইকন। যার ছবি ছিল ‘ভোগ’ এবং ‘হারপার বাজার’-এর প্রচ্ছদে।

‘রোমান হলিডে’তে অড্রে হেপবার্ণ ও গ্রেগরি পেক

সিনেমাপ্রেমী কিন্তু রোমান হলিডে (১৯৫৩) দেখেননি, এমনটি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই রাজকুমারী এবং সাংবাদিকের নির্মল সম্পর্ক, ভালোবাসার অনুভূতি এবং শ্রেণির বাঁধা। গ্রেগরি পেক আর অড্রে হেপবার্নের অমর অভিনয়। আকাশচুম্বি সাফল্য। ‘রোমান হলিডে’ অড্রে হেপবার্নকে প্রথম অভিনেত্রী হিসেবে এক সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কার জেতায় ১৯৫৪ সালে। ছবিতে তিনি প্রিন্সেস অ্যান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

এই সাফল্যের পর তিনি ১৯৫৪ সালে সাবরিনা ছবিটি করেন। এ ছবিতে কাজের জন্য একই সঙ্গে অস্কার এবং বাফটার জন্য মনোনীত হন। তবে জিততে পারেননি। ‘সাবরিনা’ কেবল তাকে খ্যাতির শীর্ষেই পৌঁছে দেয়নি, তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় তার প্রিয় ডিজাইনার এবং সফলতম ডিজাইনার ব্র্যান্ড ‘গিভেন্সি’র কর্নধার হিউবার্ট ডি গিভেন্সির সঙ্গেও। এর পর থেকে গিভেন্সি হেপবার্নের ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর পোশাক, অনুষঙ্গ সবকিছুর দায়িত্বেই ছিল গিভেন্সি। ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ ছবিতে হেপবার্নের পরা কালো পোশাক আর চুলের স্টাইল বিশ্বের নারীদের মন জয় করেছিল৷ সেসময় অনেকেই সেরকমভাবে নিজেদের সাজাতেন৷

১৯৫০- ৬০-এর দশকজুড়ে মাতিয়েছেন হলিউড হয়ে সারা বিশ্ব। একই সঙ্গে সাদাকালো ও রঙিন—দুই পর্দার নায়িকাই ছিলেন অড্রে হেপবার্ন। ‘সাবরিনা’ (১৯৫৪), ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ (১৯৫৬), ‘গ্রিন ম্যানশন্স’ (১৯৫৯), ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’ (১৯৬১) ছবিগুলোতে নিজের অভিনয় প্রতিভার পাশাপাশি নিজস্ব ফ্যাশন তৈরি করেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও অড্রে গাঁথা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেসময় তিনি ছিলেন মায়ের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসে। এর আগে ছিলেন ব্রিটেনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখেছিল। নেদারল্যান্ডস নিরাপদ ভেবে ব্রিটেন থেকে নেদারল্যান্ডসে যান অড্রের মা। কিন্তু নাৎসিরা নেদারল্যান্ডস আক্রমণ করে বসে। তাঁদের আক্রমণে অড্রের কিছু আত্মীয়ও মারা যান। ১৬ বছর বয়সী অড্রে নেদারল্যান্ডসের প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগ দেন। ব্যালে শেখার ছলে গোপন তথ্য চালাচালি করেছেন। প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য অর্থও জোগাড় করতেন দলের সঙ্গে নেচে। এই সব করতে গিয়ে একবার প্রায় ধরাও পড়ে গিয়েছিলেন নাৎসিদের হাতে। পরে অল্পের জন্য বেঁচে যান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেবিকা হিসেবেও কাজ করেছেন অড্রে হেপবার্ন। নেদারল্যান্ডসের শহর আর্নেমে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন মিত্র বাহিনীর আহত যোদ্ধাদের সেবা করেছেন তিনি। এদের মধ্যে একজন ছিল তরুণ ব্রিটিশ সেনা টেরেন্স ইয়াং। অড্রের সেবায় তিনি জীবন ফিরে পান। মজার বিষয়, পরে এই ব্রিটিশ সেনাই চিত্রনির্মাতা হন। ২০ বছর পরে তাঁর পরিচালিত ‘ওয়েইট আনটিল ডার্ক’ ছবিতে অভিনয় করেন অড্রে হেপবার্ন।

১৯২৯ সালের ৪ঠা মে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে জন্মগ্রহণ করেন অড্রে হেপবার্ন৷ তবে তাঁর নাগরিকত্ব ছিল ব্রিটেনের৷ আসল নাম অড্রে ক্যাথেলিন রুস্টন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইডা ভ্যান হেমস্ট্রা নামের ছদ্মনাম ধারণ করেন। কারণ তার পরিবার মনে করেছিলো, ব্রিটিশ নাম নিয়ে যেকোন সময়েই তিনি জার্মান নাৎসি বাহিনির রোষের মুখে পড়তে পারেন।

ছয়টি ভাষা জানতেন এই হলিউড অভিনেত্রী৷ ইংরেজি, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ ও জার্মান৷ পাঁচ বছর বয়স থেকে শিক্ষা নিয়েছেন ব্যালে নাচের। কারণ অড্রে চেয়েছেন একজন ব্যালে নৃত্যশিল্পী হবেন। ওয়েস্ট এন্ড মিউজিকাল থিয়েটারের হয়ে নেচেছেনও একসময়। পোল্যান্ডের বিখ্যাত ব্যালে নৃত্যশিল্পী মারি র‍্যাম্বার্টের অধীনে লন্ডনে ব্যালে শিখেছিলেন অড্রে। কিন্তু ব্যালে নাচের জন্য তিনি ছিলেন বেশি লম্বা। এ নাচে নারী নৃত্যশিল্পীদের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। সেখানে অড্রে ছিলেন ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বহুদিন অপুষ্টিতে ভুগেছিলেন তিনি। সে কারণে প্রায়ই তাঁর শরীর খারাপ থাকত। ফলে ব্যালে আর চালিয়ে যেতে পারেননি।

সাধ ছিল মা হওয়ার। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপুষ্টি তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। অতিরিক্ত কাজের চাপও ভোগায় ভীষণ। পরপর পাঁচবার তাঁর গর্ভপাত হয়। তবু তিনি চেষ্টা করে যান মা হওয়ার। এ জন্য নিজের ক্যারিয়ার থেকে বিরতিও নেন তিনি। শেষমেশ তাঁর দুটি পুত্রসন্তান হয়—শান হেপবার্ন ফেরার ও লুকা ডটি।

… এবং রবীন্দ্রনাথ

পর্দায় উচ্ছ্বসিত, কিন্তু বাস্তবে আত্মকেন্দ্রীক এক অনন্য ব্যক্তিত্বের চরিত্রের অধিকারী হেপবার্ন বইয়ের পোকা ছিলেন। ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

‘রোমান হলিডে’ কিংবদন্তী অড্রে হেপবার্নের অন্যতম প্রিয় কবিতা ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘অনন্ত প্রেম’ তথা এর ইংরেজি অনুবাদ ‘আনএন্ডিং লাভ’৷ তাই তো হেপবার্নের মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু ও রোমান হলিডে ছবিতে হেপবার্নের নায়ক গ্রেগরি পেক কান্নাভেজা চোখে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন৷

১৯৯৩ সালের ২০শে জানুয়ারি বিরল তলপেটের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যে মারা যান তিনি৷ সুইজারল্যান্ডের এক ছোট্ট শহরে তাঁকে সমাহিত করা হয়৷ ঐ শহরেই তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন৷

আজ ‘মাই ফেয়ার লেডি’র ৯০তম জন্মদিন। কিংবদন্তি ইংরেজ অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নকে জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।