চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঐতিহাসিক বদর: হক-বাতিলের সম্মুখ সমর

৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ। হিজরি ২য় বর্ষের সমাপনী পর্ব পার করছে মদিনার শান্তিপ্রিয় আনসার-মুহাজিরগণ।  ইসলামের জয়জয়কার পরিস্থিতি বিরাজমান। ইতোমধ্যে মদিনা সনদের মধ্য দিয়ে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহত্তর একটি অনুগত জাতিসত্তার ভিত্তি দিয়ে মদিনাকে ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের প্রয়াস পান।

বিজ্ঞাপন

তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে একসময়কার ইয়াসরিবের আউস-খাযরাজ গোত্রের মধ্যকার চলমান গোত্রীয় দ্বন্দ্ব নিরসন করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি ও স্থায়ীভাবে হানাহানি-মারামারি বন্ধ করায় তাঁর প্রভূত্ব মেনে দিতে স্বতঃস্ফূর্ত বাধ্য হলেন তারা। আর মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল ওহী-প্রত্যাদেশের মর্মবাণী।

এরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে ২য় হিজরির ১৭ই রমজান মদিনার ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত বদর নামক উপত্যকায় গিয়ে যুদ্ধে উপনীত হওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে এই প্রথম।  মুসলিম সৈন্যদল ও মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশদের মাঝে এ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ নিহিত রয়েছে।

তবে ঐতিহাসিক মুহাম্মদ আলী কর্তৃক চিহ্নিত কারণটিও প্রনিধানযোগ্য।  তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তি ধ্বংস সধন করার কুরাইশদের উদ্বেগই বদর যুদ্ধের অন্যতম কারণ।” মক্কার কুরাইশ দলপতি আবু জেহেল আবু সুফিয়ানকে সাহায্যের পাশাপাশি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মদিনাবাসী মুসলমানদেরকে ধরাধম থেকে চিরতরে মূছে ফেলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এক হাজার পৌত্তলিক সৈন্যসহ মদিনা অভিমুখে রওয়ানা করে।

মক্কার বিখ্যাত গোত্রপতি ও কাফির সর্দার উতবা, শায়বা, ওয়ালিদ, খাকনা, উবাইদা, মুনাব্বা, নওফিল প্রমুখ এ বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিল। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বাহিনীর যাত্রার সংবাদ যথাসময় পেয়ে গেলেন; বিশাল এ বাহিনীর কীভাবে মোকাবেলা করবেন, সে ব্যাপারে একটু চিন্তিত হলেন। মক্কাজীবনে ১৩ বছর কালব্যাপী যুদ্ধের বিধান অবতীর্ণ হয়নি বরং কুরইশদের মদিনা আক্রমণে রওয়ানার পরই এ বিধান অবতীর্ণ হয়।

অধিকাংশ নও মুসলিম আবার এঁদের অনেকে এমনও আছেন, যাঁরা পারিবারিক সূত্রে সম্ভ্রান্ত হওয়ায় যুদ্ধ বিগ্রহে উপনীতি হওয়ার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাহসীকতার দীক্ষার্জন করার সুযোগ পাননি। এমনকি মুসলমানরাও ইতিপূর্বে কাফেদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মুখোমুখি হননি। সর্বোপরি ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে মদিনা এখনো শৈশব পার করছে। জনবলের একটি ব্যাপক ঘাটতি রীতিমতই।

তবে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব পিছুটান পেছনে রেখে ঐশীবাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মদিনার শিশু ইসলাম রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন-“আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো সাথে বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল্ বাক্বারা- ১৯০)

মহান আল্লাহর ওহী নির্দেশে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় সহায় সম্বল রেখে আসা ৬০ জন মুহাজির এবং তাঁদেরকে মদিনায় সাহায্যকারী ২৫৩ জন আনসারসহ মোট ৩১৩ (তিনশত তেরো) জনের একটি ছোট্ট কাফেলা নিয়ে হিজরতের ঊনিশতম মাস ৮/১২ রমযানের ফরয রোযা রাখা অবস্থায় বদর উপত্যকায় রওয়ানা হন। ইসলামের ইতিহাসে এটিই “বদর যুদ্ধ” নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসে আনসার-মুহাজিরের যৌথ অংশগ্রহণে মুসলমান এবং কাফেরের সাথে সংঘটিত প্রথম সম্মুখযুদ্ধ এটি।

বিজ্ঞাপন

মক্কার বৃহত্তর কুরাইশ বাহিনীর তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল এক-তৃতীয়াংশ; কিন্তু যুদ্ধ সরঞ্জামের দিক থেকে মুসলমানরা তাদের একশতাংশও ছিলেন না। কুরাইশ কাফেরদের সবাই ছিলো বর্ম পরিহিত এবং প্রত্যেকে বয়সে ছিলো যুবক। পক্ষান্তরে মুসলমানদের সাধারণ অবস্থা ছিলো তাঁরা রোযাদার, ক্ষুধায় কাতর, দুর্বল, অসুস্থ ও ক্ষীনকায়। সকলের কাছে মামুলী হাতিয়ারও পুরোপুরি ছিলো না।

কারো কাছে হয়ত তলোয়ার আছে, কিন্তু বল্লম বা ধনুক নেই, কারো কাছে বল্লম আছে, কিন্তু তলোয়ার নেই। অপরদিকে কুরাইশ বাহিনীতে ছিলো ৭০০ উষ্ট্রারোহী, ১০০ অশ্বারোহী এবং ২০০ পদাতিক সৈন্য। আর মুসলমানদের ছিলো মাত্র ৭০টি উট এবং ৩টি ঘোড়া।  প্রতিটি উট-ঘোড়ায় ছিলেন তিন-তিন জন চার-চার জন আরোহী। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উটটিতে আরোহণ করেছিলেন, তার পিঠে আরো দু’জন সাহাবি আরোহী হন। (আসাহহুস সিয়র-৮৪ পৃ.)

যুদ্ধ সরঞ্জাম জনবল কাফেরদের তুলনায় অপ্রতুলতাকে উপেক্ষা করেই মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান প্রতিপালকের দরবারে ফরিয়াদ করে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের শুনিয়েছেন আশার বাণী, জুগিয়েছেন তাঁদের অন্তরে একরাশ সাহস-উদ্দীপনা। দিয়েছেন অভয় ও সান্ত্বনার অমোঘ ঘোষণা।  শিখিয়ে দিলেন যুদ্ধনীতি।

চিরচারিত নিয়ম-অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হয় দ্বন্দ্বযুদ্ধ বা মল্লযুদ্ধ। সর্বকালের সেরা সমরনায়ক বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নির্দেশে মল্লযুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হন হযরত আমীর হামযা (রা.), হযরত আলী (রা.) ও হযরত আবু ওবাইদা (রা.) এবং কাফেরদের পক্ষ থেকে কুরাইশ নেতা উতবা, শায়বা এবং ওয়ালিদ বিন উতবা।

ভাগ্যক্রমে প্রাথমিক পর্যায়ের এ যুদ্ধে কুরাইশ নেত্রীবৃন্দ পরাজিত ও নিহত হয়। উপায়ান্তর না দেখে কুরাইশ সেনাপতি আবু জেহেল তার বাহিনীসহ মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের ময়দানে দু’পক্ষই বিরত্বের পারাকষ্ঠা প্রদর্শন করে। একপর্যায়ে কুরাইশরা মুসলমানদের প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থায়ও সংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর মোকবেলা করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি।

যার ফলে কুরাইশদল তাদের ৭০ জন বীরের শবদেহ এবং আরো ৭০ জনকে বন্দী অবস্থায় ফেলে রণে ভঙ্গ দিয়ে মুসলমানদের নাগাল থেকে পালায়ন করে। আর এই যুদ্ধে মক্কার বিখ্যাত কাফের সর্দার আবু জেহেল, উতবা ও শায়বাসহ আরো অনেকেই নিহত হয়। অপরদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অল্প সংখ্যক মুসলমানদের মোকাবেলায় কুরাইশের বিশাল বাহিনীর পরাজয় বিস্ময়ের অন্যতম প্রকৃষ্ট নিদর্শন। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামরিক অভিজ্ঞতা, দূরদর্শী বিচক্ষণতা, কাফেরদের প্রতি উত্তম ব্যবহারের নির্দেশনা এবং মুসলিম বাহিনীকে সাহস ও হিম্মত দান ছিল এ যুদ্ধে মুসলিম বিজয়ের অন্যতম প্রেরণা শক্তি।

সবিশেষ মহান আল্লাহর অদৃশ্য শক্তির বহিঃপ্রকাশও মুসলমানদেরকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। পবিত্র কুরআনের বাণী : “বস্তুত: আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যখন বলতে লাগলেন মুমিনগণকে- তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের সাহায্যর্থে তোমাদের পালনকর্তা আসমান থেকে অবতীর্ণ তিন হাজার ফেরেশতা পাঠাবেন? অবশ্য তোমরা যদি ধৈয্যধারণ কর এবং বিরত থাক আর তারা যদি তখনই তোমাদের উপর চড়াও হয়, তাহলে তোমাদের পালনকর্তা চিহ্নিত ঘোড়ার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা তোমাদের সাহায্যে পাঠান।

বস্তুত এটি তো আল্লাহ তোমাদের সুসংবাদ দান করলেন, যাতে তোমাদের মনে এতে সান্ত্বনা আসতে পারে। আর সাহায্য শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে। যাতে ধ্বংস করে দেন কোনো কোনো কাফেরকে অথবা লাঞ্চিত করে দেন- যেন ওরা বঞ্চিত হয়ে ফিরে যায়।”(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১২৩-১২৭)।