চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এভাবে বাড়ি থেকে পালালেও আমি কিন্তু জঙ্গি হইনি

পরিবারের নিখোঁজ সন্তান! এখন দেশের অন্যতম আলোচিত উদ্বেগের বিষয়! কারণ পরিবারের এমন কিছু নিখোঁজ সন্তান সম্প্রতি গুলশান আর শোলাকিয়ায় জংগী তাণ্ডব ঘটিয়েছে। এমন নিখোঁজদের নানা কাহিনী পড়তে পড়তে নিজে মাঝে মাঝে মনে মনে হাসি। কারণ আমার জীবনেও এমন দু’বার নিখোঁজ হবার গল্প আছে। হয়তো এমন অনেকের জীবনেই আছে, নিখোঁজ হবার সত্য গল্প!

বিজ্ঞাপন

আমার প্রথমবারের ঘটনা আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন। এক-আধটু কবিতা লিখি। কবি নজরুল আমার জীবনের আদর্শ পুরুষ। ক্লাস এইটে থাকতে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন নজরুল। রুটির দোকানে চাকরি করেছেন। নজরুলের মতো বড় কবি হতে হলে আমাকেও বাড়ি থেকে পালাতে হবে। রুটির দোকানে চাকরি করতে হবে! পরিকল্পনা মোতাবেক এক রাতে বাড়ি থেকে পালালাম! একটা চিরকুটে লিখে গেলাম, কে যেন আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে!

কুলাউড়া থেকে তখন ঢাকা যাবার একটি মাত্র ট্রেন। সুরমা মেইল। রাতের সে ট্রেনে চড়ে চলে এলাম ঢাকায়। কমলাপুর স্টেশনে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম বায়তুল মোকাররম এলাকায়। একটা গল্প সাজিয়ে রেখেছিলাম। সৎ মায়ের সংসার। টর্চার সহ্য করতে না পেরে চলে এসেছি। আমার একটা কাজ দরকার। বায়তুল মোকাররমের আশেপাশে যত রেষ্টুরেন্ট ছিল সেগুলোর চারপাশে ঘুরলাম সারাদিন। কিন্তু প্রেসটিজে লাগে! কাউকে এপ্রোচ করতে পারি না! এভাবে সারাদিন ঘুরে আবার রাতের ট্রেনে চড়েঙ ফিরে এলাম কুলাউড়ায়। বাড়িতে।

এভাবে আমি ঘরে নেই দেখে খুব স্বাভাবিক বাড়িতে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে যায়। উদ্বেগে মা-বাবার চোখে ঘুম নেই। সারারাত সারাদিন তারা একা একা আমাকে খুঁজেছেন। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে মুখ ফোটে কিছু বলেননি। কিন্তু এই যে আমি প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টার মতো বাড়ি ছিলাম না, কোথায় গেলাম কোথায় ছিলাম এ নিয়েতো একটা গল্প বলতে হবে। জ্বীন বিশ্বাস করতো আমার পরিবার। বললাম, হঠাৎ মনে হলো আমাকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে! আর কিছু মনে নেই! নিজেকে আবিস্কার করলাম ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে। সেখানকার লোকজনকে সব খুলে বললাম। তারা আমাকে ইমাম সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। ইমাম সাহেব নিশ্চিত হলেন ছেলেটিকে জ্বীনে নিয়ে এসেছে! তারা আমাকে খেতে দিলেন। আবার তুলে দিলেন রাতের ট্রেনে। এরপর থেকে আমার পরিবার বিশ্বাস করতো ছোটবেলা আমাকে জ্বীনে নিয়ে গিয়েছিল! বড় হয়ে যখন তাদের আসল গল্পটি বলেছি তা তারা বিশ্বাস করেনি। নকল গল্পটি এখনো তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ছেলেটাকে একবার জ্বীনে নিয়ে গিয়েছিল!

বিজ্ঞাপন

আমার অনেকদিন আক্ষেপ ছিল ক্লাস এইটে থাকতে নজরুলের মতো বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু রুটির দোকানে চাকরি করতে না পারায় আমি নজরুলের মতো বড় কবি হতে পারিনি! বাড়ি থেকে পালানোর দ্বিতীয় গল্পটি পলিটেকনিকে ফাইন্যাল পরীক্ষা দেবার পর! ফেনী পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট থেকে আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’এ ফাইন্যাল পরীক্ষা দেই। আমার এ পড়াশুনাটি ছিল বাবা’র ইচ্ছায়। আমার তা একদম ভালো লাগতো না। আমাদের সময়ে যেহেতু ছেলেমেয়েরা মা-বাবার ইচ্ছায় পড়তো তাই তখন স্বাধীন কিছুই করার ছিলো না। ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি গেলাম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’এ কোর্স কমপ্লিট সার্টিফিকেট নিয়ে তখন অনেক প্রাইভেট ফার্মে চাকরি পাওয়া যেতো। বাড়ি থেকে ঢাকা যাবার জন্য দু’শ চল্লিশ টাকা দিয়ে বলা হলো ঢাকা গিয়ে চাকরি খোঁজো। টাকাগুলো পকেটে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরুলাম।

কিন্তু আমি স্টেশনে না গিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম! পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমণ করবো। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল শামসুল আলম নিলু। সে শুধু জানলো বিষয়টি। আমাকে সে সেদিন বেশকিছু পথ এগিয়ে দিয়েছিল। এভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণে আমার সময় লেগেছিল আঠারো মাস! আমি একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের পেশা বা জীবন চাইনি। ইবনে বতুতা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এটিতো কারও পেশা হতে পারে না। আমার পেশা কী হবে বা আমাকে দিয়ে কী হবে তাও নিশ্চিত করে জানতাম না। আমি জানতাম না আমার জীবনের পথ। বলা চলে পথ খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। বাংলাদেশ ভ্রমণের সেই আঠারো মাস বাড়ির সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। আমাকে নিয়ে তখন প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হতো। একজন তরুণ পর্যটক কী করে মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস খুঁজতে সারাদেশ পায়ে হেঁটে চষে বেড়াচ্ছে এর বর্ণনা থাকতো সে সব রিপোর্টে।

মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস সংগ্রহের বিষয়টাও বাংলাদেশ ভ্রমণ শুরুর কয়েকদিন পর আমি চূড়ান্ত করি। মানুষ যখন একা একা হাঁটে তখন এমন অনেককিছু একান্তে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তখন আমাকে নিয়ে একেকদিন একেক পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপার পর আমার ভয় হতো! না জানি পথ থেকে বাড়ির লোকজন আমাকে ধরে আবার বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু রাগে-ক্ষোভে অথবা তথ্যের অভাবে কেউ আসেনি!

আজকের মতো মোবাইল ফোনসহ এতো কিছুতো ছিলো না আমাদের সময়ে। সারাদেশ ঘুরে ঢাকায় এসে পত্রিকায় কাজ হয়ে গেলো! আমার মতো আনকোরা একজনকে পথ থেকে ধরে নিয়ে চাকরি দিয়ে দিলেন মিনার মাহমুদ। তার ছোঁয়ায় সাংবাদিকতা হয়ে গেলো আমার পেশা। বিচিন্তার জনপ্রিয়তায় কারণে চারদিকে আমারও তখন বেশ নামডাক। ওই অবস্থায় ভয়ে ভয়ে এক ঈদে বাড়ি ফিরে গেলাম। যে ভয় ছিল তেমন কিছু ঘটলো না। আব্বা বকাবকি করলেন না। বাড়ির লোকজনও তখন যেন বুঝতে পেরেছে আমি আমার জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছি।

এভাবে বাড়ি থেকে পালালেও আমি কিন্তু জঙ্গি হইনি। এই বিষয়টিই আমরা তখন জানতাম না। আমরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতাম। আমাদের স্বপ্ন ছিল মানুষের জন্যে। মানুষকে নিয়ে। এখন যারা জঙ্গি ইসলামিক বিপ্লব বা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দ্যাখে তাদের সঙ্গে মানুষ নেই। মানুষ তাদের ভয় পায়। যে স্বপ্ন অথবা লক্ষ্যের সঙ্গে মানুষের সংশ্রব-সম্পর্ক নেই, সে স্বপ্ন-লক্ষ্যের জয়ী হবার কোন সুযোগ নেই। এমন মানুষবিচ্ছিন্ন লক্ষ্য-স্বপ্ন জিতবেও না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)