চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য দেশী পণ্যের প্রটেকশন দেয়া: পলক

জুনাইদ আহমেদ পলক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত ও সচেতন তরুণদের কেউ তার কথা জানেন না বা শোনেননি অথবা চেনেন না এমন কাউকে পাওয়া যাবে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট। পাঁচ ভাই-বোনের প্রত্যেকেরই নাম চোখের প্রতিশব্দ দিয়ে, যেমন- নয়ন, মণি, আঁখি, দৃষ্টি ও পলক। বাবা মরহুম ফয়েজ উদ্দীন ছিলেন একজন কৃষক। পাশাপাশি ছিলেন মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন নাটোরের সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মা জামিলা ফয়েজ একজন গৃহিনী। ১৯৮০ সালের ১৭ মে নাটোর জেলার চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন সিংড়া দমদমা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েই গড়ে তুললেন দূর্দম ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় তার সংগঠনকেন্দ্রিক পথচলা। এলাকার সকল কিশোরদের সংগঠিত করে খেলার মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট আর ভলিবল আয়োজন করা ছিল তার প্রায়শই কর্মকাণ্ড। শৈশব কৈশোরে তিনি বেড়ে উঠেছেন ঘুড়ি উড়িয়ে, কখনো মাছ ধরে আবার কখনো বা চলনবিলে সাঁতার কেটে। মাটি ও মানুষের সাথে তার নাড়ির সম্পর্কটা খুব ছোটবেলা থেকেই। বাবা মরহুম ফয়েজ উদ্দিনকে দেখেছেন; কিভাবে তিনি মিশে যেতেন সাধারণ মানুষের মাঝে, কিভাবে মানুষের সমস্যা সমাধানে উজাড় করে দিতেন নিজেকে। বাবার কাছে গল্প শুনে খুব অল্প বয়সেই বঙ্গবন্ধুকে নিজের মধ্যে ধারণ করে ফেললেন তিনি। যেন বঙ্গবন্ধু তার কাছে রুপকথার গল্পের মতো।

ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী পলক বিতর্ক, আবৃত্তি ও উপস্থিত বক্তৃতা করতেন। সম্পৃক্ত ছিলেন রোভার স্কাউটের সাথে। ১৯৯৪ সালে বয়েজ স্কাউট নাটোর জেলা দলের নেতৃত্ব দেন পলক। ১৯৯৫ সালে সিংড়া দমদমা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাঁচ বিষয়ে লেটার নম্বরসহ স্টার মার্ক নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন পলক। এরই মধ্যে তার বাবা ইন্তেকাল করেন কিন্তু থেমে থাকেননি পলক। বাবাকে হারিয়ে কঠিন জীবন সংগ্রামে বাস্তবতাকে সঙ্গী করে শুধুমাত্র স্থানীয় রাজনীতির প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকার কারণে মা এবং এলাকার মানুষের পাশে থাকার কথা চিন্তা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে এলাকায় ফিরে এসে ভর্তি হন বাড়ির পাশের গোল-ই-আফরোজ সরকারি কলেজে।

মূলত সেখান থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে জোরালো উত্থান শুরু হয় পলকের। ১৯৯৯ সালে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে ভিপি নির্বাচিত হন। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। ছাত্রজীবনে যখন ঢাকায় যেতেন তখন শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকতেন। নানা চড়াই উৎড়াই পার করে একে একে উপজেলা ও জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান করে নেন পলক। যার পেছনে বিরাট অবদান ছিল তার এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের। তিনি ২০০১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এমএসএস এবং ২০০৩ সালে ঢাকা ন্যাশনাল ল কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করে প্রথমে নাটোর জর্জ কোর্টে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে গণরাজনীতিতে পদার্পণ করেন তিনি। এরই মধ্যে, ২০০২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দলে সারাদেশের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসাবে সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ২৮ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন লাভ করে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর সিংড়া আসনে নৌকা প্রতীককে অর্ধলক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেন পলক। মেধা, নিষ্ঠা, কর্মশক্তি ও সুন্দর বাচন ভঙ্গির মাধ্যমে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ প্রজন্মকে সাথে নিয়ে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির প্রয়াস উপস্থাপিত করে দেশবাসীর নজন কাড়েন পলক। সুন্দর, মার্জিত, ভদ্র ও সাবলীল ভাষায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে তথ্যবহুল এবং যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করে টকশো’তে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পাশাপাশি আস্থা অর্জন করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের। যার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসাবে স্থান পান পলক। নিজ নির্বাচনী এলকায় প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষ রোপনের স্বীকৃতি স্বরূপ একই বছর তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় সম্মাননা হিসাবে প্রথম পুরস্কার গ্রহণ করেন। তার এই পথচলায় অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হচ্ছেন তার মা জামিলা ফয়েজ ও স্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা আরিফা জেসমিন কণিকা।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি অনুভব করতেন প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক ও মেধাবীরা যদি ছাত্ররাজনীতিতে না আসে; তাহলে আমাদের ৫২ বা ৭১ এর যে চেতনা সেটার বাস্তবায়ন কোনো ক্রমেই সম্ভব হবে না। ছোটবেলা থেকে মানুষের জন্য কিছু একটা করার তীব্র তাগিদ অনুভব করতেন তিনি। রাজনীতি ও তার পরিবার কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ নয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্যই কোনো না কোনোভাবে তার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। দেখা যায়, কখনো আওয়ামী লীগের কোন সম্মেলনে অতিথিদের ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে তার শিশু সন্তান অপূর্ব, অর্জন আর অনির্বাণ। রাজনীতিকে কখনোই তিনি নেশা বা পেশা হিসাবে নেননি। রাজনীতি হচ্ছে তার সাধনা যার মাধ্যমে তিনি জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। রাজনীতির কারণে কখনোই তাকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়নি। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেও রাতে পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি, মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক সংযুক্ত থাকার মাধ্যম হিসাবে প্রযুক্তিকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। তার প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যে কেউই অবগত হতে পারেন; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে। শত ব্যস্ততার মাঝেও ফেসবুকে আপডেট ও নিয়মিত মেইল চেক করা তার প্রতি মূহুর্তের অভ্যাস। যখন বর্ষায় চলনবিল পানিতে ভাসে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে, ঘূর্ণিঝড়ে কৃষকের পাকা ধান আর ঘর বাড়ি বিনষ্ট হয়ে যায়, তখনও দলীয় নেতা কর্মী আর প্রশাসনকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখেন, ‘আমি এলাকায় আছি, সার্বক্ষণিক যে কোনো সমস্যায় সরাসরি যোগাযোগ করুন। আমি সমস্যা সমাধানে সর্বাত্বক চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।’

২০১৩ সালের শেষের দিকে গুটিকয়েক সংসদ সদস্যের অশালীন, অসত্য ও অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারে জাতীয় সংসদ যখন তার পবিত্রতা হারাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে সংসদে সাহসী ও সময়োপযোগী বক্তব্য প্রদান করে সারাদেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৭০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১২ জানুয়ারি বর্তমান মন্ত্রিসভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপরই শুরু হয় তার নতুন পথচলা। মেধা ও প্রযুক্তি নির্ভর জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেরাচ্ছেন পলক। প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি দেশের সর্ববৃহত্তম কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কের উপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে হাইকোর্ট। তার হাত ধরেই বিআরটিসি বাস কখনো বা টিএসসি কখনো বা মধুর ক্যান্টিনে ফ্রী হয়েছে ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক। চলনবিলের প্রত্যন্ত এলকায় জন্ম নেওয়া প্রতিভাবান এই ছেলেটি আজ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কর্তৃক ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার ২০১৬’ নির্বাচিত হয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও অগ্রযাত্রাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। পথচলা এখনো অনেক বাকি। আমাদের প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে সামনে রেখে তিনি এগিয়ে যাবেন বহুদূর। সম্প্রতি তিনি সরকারের বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন।

জুনাইদ আহমেদ পলক

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন : এবারের প্রস্তাবিত বাজেটকে অর্থমন্ত্রী স্মার্ট বাজেট বলেছেন। কিন্তু যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তাদের জন্যে মনে হচ্ছে বাজেটে কোন সুখবর নেই।এই বছর স্মার্ট ফোন আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সিম কার্ড ১০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ কিনলে আয়কর রেয়াত পাওয়া যেতো তাও বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ১০০ কোটি টাকার স্টার্ট আপ ফান্ড মাননীয় মন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই প্রস্তাবিত বাজেট কেমন প্রভাব ফেলবে?

জুনাইদ আহমেদ পলক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ জানাচ্ছি- বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত নিজে বাজেট ঘোষণা করে পরের দিন প্রেস কনফারেন্স করে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল- একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজে বাজেট উত্থাপন করেন এবং সাংবাদিকদের সরাসরি প্রায় দুই ঘন্টার মত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। এবারের বাজেটের যে মূল বিষয়- আপনি যে কয়েকটি ইস্যু এখানে উত্থাপন করলেন আমার সামনে-সেখানেই আপনি আপনার প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়ে দিয়েছেন যে, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য দেশী পণ্যের প্রটেকশন দেওয়া। বিদেশি নির্ভরতা থেকে আস্তে আস্তে আমাদের দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে নিজের পায়ের উপরে দাঁড়ানো এবং পাশাপাশি তারুণ্য নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সেই তারুণ্যের জন্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। স্মার্ট ফোনের উপরে কেন আমদানী শুল্ক বাড়ানো হলো? আমি বলবো- এটি খুবই একটি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সিদ্ধান্ত মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন।কারণ আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে, আমাদের সামনে যে সাফল্যের দৃষ্টান্তগুলো দেওয়া হয় সেখানে যদি বলি- সাউথ কোরিয়া অর্থ্যাৎ ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপান জার্মানের শিল্প বিপ্লবের পরে আমরা যদি এখনকার তৃতীয় শিল্প বিপ্লব অর্থাৎ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ার যে দৃষ্টান্তগুলো-সাউথ কোরীয়া, ইন্ডিয়া এবং পাশের দেশ আমাদের চীন। এই দেশগুলোর যদি সাম্প্রতিক সময়ের ১০/২০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখবেন যে, ফিলিপাইন এবং ইন্ডিয়া তারা সার্ভিস বেইজড একটা ইকোনমি গড়ে তুলেছে অর্থ্যাৎ কলসেন্টার সেট আপ, সফটওয়্যার ডেভলপার, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং- এইগুলোর মাধ্যমে তাদের ইকোনমি গেলো ২০ বছরে সুদৃঢ় হয়েছে। অপরদিকে যদি সাউথ কোরীয়া এবং চায়নার দিকে খেয়াল করেন তারা কিন্তু এই ২০ বছরের মধ্যে ম্যানুফ্রাকচারার কিংবা অ্যাসেম্বিলার হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে।

স্যামসাং কিংবা চীনের হুয়াও ওয়ের দিকে যদি তাঁকিয়ে দেখেন তারা কিন্তু গেলো ২০ বছরে ধারাবাহিকভাবে তাদের দেশীয় শিল্পকে প্রটেকশন দিয়েছে। আমদানি নির্ভরতাকে তারা কমিয়েছে। ঠিক একই রকমভাবে লক্ষ্য করে দেখুন- যখন ১৯৯৬ সালে আজকের প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন কিন্তু ল্যাপটপের উপরে আমদানী শুল্ক সম্পুর্ণ কিন্তু তুলে দেয়া হয়েছিল। এই কারণে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার মানুষ ব্যবহার করতে পেরেছিল। একই রকমভাবে যদি বলি সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হওয়া। এগুলোর সবই কিন্তু দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাষ্ট্র নায়কোচিত সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে বাংলাদেশ কিন্তু ডিজিটাল রেভ্যুলেশনের সূত্রপাত করতে পেরেছিল। আর এখন কেন আমরা শুল্ক আরোপ করছি তার কারণ- আমরা ২০১৬-১৭ সালে ৯৪টি কম্পোনেন্টের ‘র ম্যাটেরিয়ালের উপরে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিয়েছিলাম। যার ফলে ১৭, ১৮ এবং ১৯-এই তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ওয়ালটন এখন তারা ল্যাপটপ উৎপাদন করছে, তারা স্মার্ট ফোন উৎপাদন করছে। এমনকি আমি শুধু বাংলাদেশী কোম্পানীর কথা বলছি না? ওয়ালটন, সিম্ফনি, উই- এগুলো তো করছেই। সাথে সাথে স্যামসং ইতিমধ্যে প্রায় হাফ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫ লক্ষাধিক মোবাইল হ্যান্ডসেট বাংলাদেশে অ্যাসেম্বেল করে এই দেশের মার্কেটে এনেছে। এর পাশাপাশি এলজি তাদের কোম্পানি সেট আপ করছে এই দেশে এবং হুয়াও ওয়েসহ বেশ কিছু কোরিয়ান চাইনীজ এবং অন্যান্য দেশীয় কোম্পানীগুলো বাংলাদেশে সেট আপ করছে। কেন করছে? এই সরকারের নীতির কারণে। কারণ মাননীয় আইসিটি উপদেষ্টা যিনি আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ। যিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন এবং বাস্তবায়ন করছেন। জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় এর নির্দেশনাতেই কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা সেই প্রস্তাবগুলো দিয়েছিলাম।

আমরা তিন বছর অপেক্ষা করেছি যে, আসলে কি আমাদের অ্যাসেম্বিলিং এবং ম্যানুফ্রাকচারিং এর জন্যে আমাদের কি সেই প্রসেস গড়ে উঠছে কিনা? যখন আমরা দেখেছি যে, হ্যাঁ- এখন লক্ষ লক্ষ মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট বাংলাদেশে অ্যাসেম্বেল হচ্ছে- তখন আমরা কিন্তু ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে আমদানির উপরে আস্তে আস্তে শুল্ক বৃদ্ধি করছি। এটা একটা টাইমিং অর্থাৎ তিন বছর অপেক্ষা করেছি আমাদের দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার জন্যে। একটা উদাহরণ দেই- রেফ্রিজারেটর। বাংলাদেশে এখন ২০ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হয়। আপনি চিন্তা করেন তো? যদি ওয়ালটন, ভিশন, মিনিস্টার এবং মার্সেল এই ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে গত ১০ বছরে তারা তৈরী না হতো- আমরা এদেরকে প্রটেকশন না দিতাম তাহলে আজকে ২০ লক্ষ ফ্রিজের মধ্যে ১৮ লক্ষ একা ওয়ালটন বিক্রি করছে। পাশাপাশি যমুনা, ভিশন এবং প্রাণ গ্রুপ যারা এখন ম্যানুফ্রাকচারিং এ আসছে বলেই বাংলাদেশে এর বিলিয়ন ডলারের মার্কেট তৈরী হয়েছে। এলইডি টেলিভিশন। আপনি যদি লক্ষ্য করে দেখেন-৪৬ এর বি ধারা এবং আরও কয়েকটাতে আছে। এখানে কিন্তু আমরা এমন এমন প্রডাক্টকে প্রটেকশন দিয়েছি ট্যাক্স হলিডে দেওয়া হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু হয়েছে কিংবা যেগুলো অ্যাসেম্বিলিং হচ্ছে। এবার আমি বলবো যে, অর্থ মন্ত্রণালয় বিশেষ করে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ এর চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ দেবে যে, তিনি এবারে উৎপাদনমুখি দেশীয় শিল্প রক্ষার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বিদেশ নির্ভরতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্যে এবারের বাজেট সত্যিই অসাধারণ করে তৈরী করেছেন। স্মার্ট ফোন এবং ল্যাপটপের উপরে আমদানি শুল্ক আরোপের কারণ একটাই- যে ব্র্যান্ডগুলো আমরা আমদানী করছি তাদেরকে আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যে, তোমরা এসে আমাদের দেশে অ্যাসেম্বিলিং প্ল্যান্ট সেট আপ করো, ম্যানফ্রাকচারিং প্ল্যান্ট সেট আপ করো। আমাদের এই যে, শুল্ক সুবিধাগুলো ট্যাক্স হলিডেগুলো সেগুলো বাংলাদেশে এসে উপভোগ করো। আমরা হাইটেক পার্ক ২৮টা করছি। আমাদের স্পেশাল ইকনোমিক জোন হচ্ছে। সেখানে যে প্রডাক্টগুলো এখন আমদানি করতে শুল্ক দিতে হবে- তারা যদি বাংলাদেশে এসে ফ্যাক্টরি সেট আপ করে তাহলে উল্টো তারা আরও সুবিধা পাবে। বাংলাদেশে এখন যেসব সুযোগ সুবিধাগুলো দেওয়া হচ্ছে এইগুলো পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই।এখান থেকে হার্ড ওয়্যার সফটওয়্যার সার্ভিস তারা যদি এক্সপোর্ট করে তাহলে এক্সপোর্ট এর উপরে ১০ শতাংশ ইনসেনটিভ অর্থাৎ ক্যাশ ব্যাক পাবে। এটি একটা বিরাট সম্ভাবনা তৈরী করেছে। এর পাশাপাশি স্টার্ট আপ এর জন্যে বলবো- এটি খুবই স্মার্ট একটা মুভ। কারণ আমরা শুধু চাকরি নির্ভর থাকতে চাই না।আমাদের তরুণরা চাকরি খুঁজবে না। ইয়ুথরা জব সিকার হবে না, জব ক্রিয়েটর হবে। তাই স্টার্ট আপ যে কোম্পানি বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন করতে যাচ্ছি ক্যাবিনেটে পাঠিয়েছি। আমরা আশা করছি- এই ১০০ কোটি টাকা স্টার্ট আপ এর জন্যে যে ফান্ড রাখা হয়েছে এটি ম্যাচিং ফান্ড হিসেবে আমরা ব্যবহার করবো এর সাথে ভেনচার ক্যাপিটাল কোম্পানিসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীরাও এর সাথে ম্যাচ করবে।

প্রশ্ন: হাইটেক পার্কে যদি কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করে তাহলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, না ১০ পারসেন্ট শুধু কর দিয়ে- এটি তো আইসিটি ইন্ডাস্ট্রির জন্যে অনেক বড় বুস্ট আপ হবে?

জুনাইদ আহমেদ পলক: আমাদের আইটি ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু নতুন। মাত্র ১০ বছরে আইটি ইন্ডাস্ট্রির যে গ্রোথ তা মোর দ্যান টু হানড্রেট পারসেন্ট। আমরা যে জ্ঞানভিত্তিক একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়তে পারি তার জন্যে কেউ আত্মবিশ্বাসী ছিল না। ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেওয়ার পরে গেলো ১০ বছরে মাননীয় আইসিটি উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় ভাই এর নির্দেশনায় আমরা পুরো আইসিটি’র ইকো সিস্টেমটা গড়ে তুলছি। হাইটেক পার্কের এই কনসেপ্টটা ২০০৯ এর আগে ছিল না। সফটওয়্যার এবং সার্ভিস এক্সপোর্ট এর কোনো অবকাঠামো বাংলাদেশে ছিল না। কারণ মাত্র ৫৬ লাখ ইন্টারনেট ইউজার ছিল ১০ বছর আগে। তখন ২৬ মিলিয়ন ডলার ছিল আইসিটি এক্সপোর্ট কিন্তু যখন ২৪ সাল পর্যন্ত এনবিআর এর পক্ষ থেকে আইটি এবং আইটিএস সেক্টর থেকে কর্পোরেট ট্যাক্স মুক্ত করা হয়েছে তখন কিন্তু এই সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ হয়েছে। এখন কিন্তু আমরা এক বিলিয়ন ডলার এক্সপোর্ট করি এবং আমাদের টার্গেট আগামি ৫ বছরে এটাকে ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। তার জন্যে কি দরকার? হাইস্পিডি ইন্টারনেট, ইন্টারনেটকে এক্সেস অ্যাবল, অ্যাভেলঅ্যাবল এবং অ্যাফোর্ডঅ্যাবল করা। এটা হয়ে গেছে। আমাদের একেবারে গ্রামের ইউনিয়ন পর্যন্ত ফাইবার অপটিক হাইস্পিডি ব্রডব্র্যান্ড কানেকটিভিটি চলে গেছে।

প্রশ্ন : বিনিয়োগ নেওয়ার মত পরিস্থিতি আছে কি?

জুনাইদ আহমেদ পলক: অবশ্যই আছে? কারণ আমাদের হাইটেক পার্ক ২৮ টা আছে। ইতিমধ্যে প্রায় শতাধিক বিনিয়োগকারী এখানে বিনিয়োগ শুরু করেছেন।একটা হলো দেশীয় উদ্যোক্তা আরেকটি হলো দেশী এবং বিদেশী যৌথ উদ্যোক্তা- এই সব ধরণের পরিবেশ আমাদের কালিয়াকৈর, বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, রাজশাহী, সিলেট, যশোরে শেখ হাসিনা টেকনোলজি পার্ক-এই সব মিলিয়ে আমাদের আইটি সেক্টরে কিন্তু ১০ লাখ ছেলেমেয়ে কাজ করছে। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আছে- আগামি ৫ বছরে এনবিআর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় হাইটেক পার্কগুলোতে ৩ লক্ষ প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান এবং হাইটেক পার্ক এর বাইরে সবকিছু মিলিয়ে ১০ লক্ষ তরুণ তরুণীর কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা আছে। এসব হাইটেক পার্ক এখন বিনিয়োগের জন্যে তৈরী। এর অবকাঠামো, কানেকটিভিটি, ইউটিলিটি এবং যোগাযোগ এই সবই কালিয়াকৈর থেকে শুরু করে যশোর, রংপুর, সিলেট ও রাজশাহী প্রতিটি জায়গায় তৈরী। ২৮ টার মধ্যে ৪ টা প্রস্তুত।কারওয়ান বাজার, কালিয়াকৈর, সিলেট প্রায় রেডি, রাজশাহী রেডি আর চট্টগ্রামে কাজ চলছে। আমরা আশা করছি আগামী ৫ বছরের মধ্যে হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি অর্থাৎ ডিজিটাল ইকনোমির দিকে বাংলাদেশ আস্তে আস্তে অগ্রসর হবে। পুরো পৃথিবীর ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের যে একটা বিরাট ধাক্কা আসছে তার জন্যে এবারের বাজেটে তিনটা ইন্টারেস্টিং বিষয়- একটা হলো ১০০ কোটি টাকার স্টার্ট আপ ফান্ড, দ্বিতীয়ত হলো দেশীয় শিল্পের প্রটেকশন এবং তৃতীয়ত হলো ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, রোবোটিক্স- এইগুলো কিন্তু আগে কখনো ভাবা হয়নি কিন্তু এখন আমরা এই বিশেষায়িত গবেষণা এবং এর পাশাপাশি আমাদের যে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ধাক্কা সেটাকে সামলে আগামী দিনে একটি জ্ঞান ভিত্তিক গঠনের দিকে এবারের বাজেটে নির্দেশনা আছে।

প্রশ্ন: ম্যাচিং ফান্ড স্টার্ট আপ ক্যাপিটাল নিয়ে সংক্ষেপে আরও কিছু বলুন?

জুনাইদ আহমেদ পলক: এখন আমরা যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট এনজয় করছি অর্থাৎ ১৬ কোটি মানুষের দেশ এবং এর মধ্যে ৭০ শতাংশ তরুণ যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এরাও আগামী দশ বছরের মধ্যে কাজে প্রবেশ করবে। প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ এবং তরুণী কাজের বাজারে প্রবেশ করছে। কোন সরকার আগে কোন প্রধানমন্ত্রী এইভাবে পরিককল্পনা করেনি যে- প্রতি বছর, প্রতি ৫ বছর, প্রতি ১০ বছর কিভাবে কতো লক্ষ শিক্ষার্থীকে কাজের জন্যে প্রস্তুত করা হবে। এইরকম দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা জননেত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন। আমরা চেষ্টা করছি সকল তরুণ তরুণী যেনো চাকরির পেছনে না দৌড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে দুটে উদাহরণ দেই- পাঠাও, সহজ ডট কম এই রাইড শেয়ারিং অ্যাপ এর মাধ্যমে কিন্তু প্রায় ২ লক্ষ মানুষের কাজের ক্ষেত্রে তৈরী হয়েছে। বিকাশ, রকেট এই ধরণের মোবাইল ব্যাংকিং এর এজেন্টসহ লক্ষ লক্ষ মানুষের কাজের পরিবেশ তৈরী হয়েছে। স্টার্ট আপ নতুন ধরণের ধারণা। ২০১৬ সাল থেকে স্টার্ট আপ বাংলাদেশ ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলাম। এখন ইনোভেশন ডিজাইন এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমী অর্থাৎ উদ্যোক্তা তৈরী একটি একাডেমি স্থাপন করেছি। আমরা এই ১০০ কোটি টাকা স্টার্ট আপ কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড এর মাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেব এবং আশা করছি তাদের কাজের ক্ষেত্র আমরা নিশ্চিত করতে পারবো ।