চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এক বাবার করুণ আর্তি: ‘আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যান’

মাদকের ছোবল-১

দেশব্যাপী যখন চলছে মাদকবিরোধী অভিযান, ঠিক সেই সময় মাদকের মরণ ছোবল থেকে ছেলেকে বাঁচাতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন এক অসহায় বাবা। তার করুণ আর্তি; ‘আমি আর পারছি না, আমাকে বাঁচান। আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যান।’ 

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার ৩ নং মুলাদী ইউনিয়ন পরিষদের মধ্য তেরচর গ্রামের। সেই গ্রামের বাস করেন বাবা ইসমাইল হোসেন (ছদ্মনাম)। মাদকাসক্ত ছেলের হাত থেকে নিজে ও পরিবারকে বাঁচাতে সহায়তা চেয়েছেন পুলিশের।

মাদকাসক্ত ওই ছেলের কারণে ভালবাসা আর মমতায় ভরা ছোট্ট পরিবারটি আজ প্রায় নিঃস্ব। সন্তানের এ অধঃপতন সইতে না পেরে দু’বছর আগে ব্রেন স্ট্রোক করেছেন মা। সেই থেকে একদিকে অসুস্থ স্ত্রী আর অন্যদিকে মাদকাসক্ত ছেলে এবং ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন ইসমাইল।

চ্যানেল অাই অনলাইনের কাছে নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙ্গে পড়েছেন কান্নায়।

৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় রনি (ছদ্মনাম)। আর রনিকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন ছিলো আকাশছোঁয়া। ভাবতেন ছেলে পড়ালেখা শিখে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

মাত্র দু’বছর আগে ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা রনি স্কুলের গণ্ডি না পেরোতেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে বন্ধুদের সাথে কৌতূহলবশত একটু একটু করে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। এক সময় সব ধরনের মাদক হয়ে যায় তার নিত্যদিনের সঙ্গী। অার এর সবই ঘটে বাবা-মায়ের অলক্ষ্যেই।

তবে হঠাৎ করেই তা মা উপলব্ধি করেন ঘরের কোথাও টাকা রাখলেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপর কিছুটা সতর্ক হন বাবা-মা। টাকা রাখতে শুরু করেন আলমারিতে তালাবদ্ধ করে। কিন্তু সেই টাকাও উধাও হয়ে যায়। এভাবে হারিয়ে যায় তাদের প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা।

এক পর্যায়ে চিন্তায় পড়ে যান ইসমাইল দম্পতি। সিদ্ধান্ত নেন বাসায় টাকা না রাখার। বাজারে একটি দোকান আছে ইসমাইলের। সেখানেই রেখে আসতে থাকেন টাকা।

বিজ্ঞাপন

এরপর শুরু হয় নতুন উৎপাত। হারিয়ে যেতে থাকে বাসার মূল্যবান জিনিসপত্র। একে একে ইসমাইলের স্ত্রীর গহনাগুলো হারাতে থাকে। তবুও বুঝতে পারেন না বাবা-মা। তাদের অলক্ষ্যেই হয়ে চলেছে বড় সর্বনাশ।

তবে ছেলের কোনো আচরণেই কখনো সন্দেহ হয়নি তাদের। ছেলে-রাত করে বাসায় ফিরে সারারাত জেগে থেকে সরাদিন ঘুমোলে তারা ভাবতেন রাত জেগে পড়ালেখা করেছে। বন্ধুদের সাথে পড়ালেখা করায় বাসায় ফিরতে দেরি হয়েছে।

একদিন হঠাৎ করেই অভিযোগ আসতে থাকে এলাকার লোকজনের। ইসমাইল জানতে পারেন তার ছেলে বাসার জিনিস বিক্রি করছে এলাকার লোকজনের কাছে। কেউ কেউ আবার জানান, তার ছেলেকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখেছেন বিভিন্ন জায়গায়।

এসব জেনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ইসমাইলের। শুরু করেন ছেলেকে শাসন করা। কিন্তুু স্কুলপড়ুয়া ছেলের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন বাবা-মা। বাবা জীবিকার তাগিদে সকালে বাইরে বেরোলেই মায়ের উপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। টাকা না দিতে চাইলেই চলতো অকথ্য ভাষায় গালাগালি আর মারধোর। বাদ যায়নি ছোট দু’ভাইবোনও। সেইসাথে চলতে থাকে ভাঙচুর।

এ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং ছেলের দুশ্চিন্তায় ব্রেন স্টোক করেন ইসমাইলের স্ত্রী। শুরু হয় ইসমাইলের নতুন যুদ্ধ। দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন স্ত্রী কিছুটা সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনেক সময় লাগবে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক।

নেশার টাকা না পেলে নিজেই ছুরি কাচি দিয়ে কাটতে থাকে নিজের হাত-পা। সামান্য কথাতেই মা-বাবাকে তেড়ে আসতে থাকে দা-বটি নিয়ে। কষ্টের কথা লজ্জায় বাবা জানাতে পারে না কাউকে।  

এরপর নিজের ও ছেলের জীবন বাঁচাতে দ্বারস্থ হন পুলিশের। মুলাদী সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার কামরুল আহসানের কাছে গিয়ে খুলে বলেন সব। শুনে কামরুল আহসান তার ফোর্স দিয়ে থানায় নিয়ে আসেন রনিকে।

আহসানের ভাষায়: ‘খুব অস্থির সে। কোনো কথারই ঠিক মত উত্তর দেয় না। কখনো বলে আমাকে মেরে ফেলেন, কখনো বলে মায়ের কাছে দিয়ে আসেন।  কখনো বা বলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। খুবই অসংলগ্ন কথা বলে।’

সবকিছু দেখে পুলিশ কর্মকর্তা ইসমাইলকে পরামর্শ দেন ছেলেকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার। বর্তমানে রনি একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রয়েছে।

বাবা ইসমাইল স্বপ্ন; একদিন তার ছেলে সুস্থ হয়ে তাদের বুকে ফিরে আসবে। সমাজের অন্য দশজন মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে।