চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একজনই বেগম রোকেয়া নাকি অনেক বেগম রোকেয়া এখন?

বেগম রোকেয়ার পর তার মতো আর কেউ কি নেই? নাকি সবক্ষেত্রে নারীর যে এগিয়ে চলা সেখানে সকল নারীই একেকজন বেগম রোকেয়া? ১৯১৬ সালে মুসলিম নারীদের জাগরণের জন্য বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠার একশ বছর অর্থাৎ তার সাংগঠনিক আন্দোলনের শতবর্ষ পূর্তিতে নারী আন্দোলনকারী, গবেষক এবং বিশ্লেষকরা এ বিষয়ে দু’রকম মত দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তাদের কেউ বলেছেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়া ব্যক্তিগতভাবে, সাংগঠনিকভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। ওই অবস্থানটা হয়তো এখন আর নেই; আবার পরিস্থিতি যে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে সেটাও না। যে কারণে দু’দিক থেকেই বিষয়টা দেখলেও এক ধরণের অগ্রগতির চিত্র পাওয়া যায়।

তবে তারা এও বলেন, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়ে সামাজিক রীতিনীতি যেখানে আসা উচিৎ ছিলো সেই পরিবর্তনটা এখনো আসেনি, বা আমরা করতে পারিনি। শৃঙ্খলিত অবস্থান থেকে পড়াশুনার জায়গায় কর্মক্ষেত্রে মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীরা ওই অবস্থানে যেতে পারেনি।

কেউ কেউ আবার বলেছেন, বেগম রোকেয়া বা সুফিয়া কামাল অনেক সামর্থ্যবান পরিবারের সদস্য ছিলেন। এখন আমরা ব্যক্তি উন্নয়ন, ব্যক্তিগত লাভটা বেশি দেখি। এরকম নানা কারণে নারীর মুক্তির জন্য সংগ্রামের নেতৃত্বে একটা শূন্যতাও তৈরি হচ্ছে।

শিরিন আক্তার

তবে নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী শিরিন আক্তার মনে করেন, এখন অনেক অনেক রোকেয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অনেক রোকেয়া আজ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বেগম রোকেয়া চোখ খুলে দিয়েছিলেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘বুক ঠুকিয়া বল মা আমরা মানুষ।’ বুকের ভেতরে তিনি এ শক্তি যুগিয়েছিলেন। এই শক্তি থেকেই আজ নারীরা সমঅধিকারের জন্য লড়াই করছে। সমতার জন্য লড়াই করছে।

তার মতে, কেবল শিক্ষা নয়; কর্মের সকল ক্ষেত্রে, সকল পেশায় নারীরা সংগ্রাম করছে। এমনকি ঘরের ভেতরেও নারীরা সংগ্রাম করছে। সেই সংগ্রামের মূল উৎসারিত শক্তিই হচ্ছেন বেগম রোকেয়া। বেগম রোকেয়ার যে চেতনাবোধ সেটা একজন নারীকে কেবল নারী নয়, মানুষ হিসেবে সকল ধরণের নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং সকল ধরণের অধ:স্তনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করছে। ধর্মকে কেন্দ্র করে এবং ধর্মের নামে যে নির্যাতন তার বিরুদ্ধেও নারীরা লড়াই করছে, সে যুগে বেগম রোকেয়ার যে লড়াই সেটা আজকের এ যুগেও চালিয়ে যাচ্ছে নারী।

যুগে যুগে বড় ধরণের কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন গুটিকতক মানুষ। তবে, সেই পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়, যখন আরো অনেক মানুষ সেই চিন্তা ও কাজ অনুসরণ করেন ও এগিয়ে নিয়ে যান।

‘সব শক্তির লড়াইয়ে আমরা বার বার করে বেগম রোকেয়াকে দেখছি। তার দেয়া সাহস, প্রেরণা নিয়ে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।’

গীতি আরা নাসরীন

গবেষক এবং  গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেছেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে কিন্তু দেখতে পাবো, যুগে যুগে বড় ধরণের কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন গুটিকতক মানুষ। তবে, সেই পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়, যখন আরো অনেক মানুষ সেই চিন্তা ও কাজ অনুসরণ করেন ও এগিয়ে নিয়ে যান। আবার, বড় কোন পরিবর্তন তখনই চোখে পড়ে, যে পরিবর্তনটি আগের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, বা খোল-নলচে বদলে দেওয়ার।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সেই বড় ধরণের পরিবর্তনটি ঘটিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্ক আছে তার দৃঢ় মানসিকতা, নিজ লক্ষ্যে অটল থাকতে পারা, সমালোচনায় পিছপা না হওয়ার মতো নানা জোরালো গুণ।

নারী উন্নয়ন কর্মী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী বনশ্রী মিত্র মনে করেন, নির্দিষ্টভাবে বেগম রোকেয়ার পর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আবার তার পর লম্বা সময় পার হয়েছে। তাদের লড়াইটা এককেন্দ্রিক ছিলো। এখন লড়াইটা বহুমাত্রিক। এই বহুমাত্রিক লড়াই করে এখন আমাদের এগোতে হচ্ছে, মোকাবেলা করতে হচ্ছে, প্রতিযোগিতা করে আমাদের অবস্থান তৈরি করে নিতে হচ্ছে। এসব কিছু মিলে নারীদের যারই যা ইচ্ছা থাকুক না কেন ওই জায়গায় পৌঁছাতে আবারও বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আজ যে পাহাড়-পর্বত জয় করেছে সে নতুন বেগম রোকেয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একজন নারী গার্মেন্টস কর্মী সে যখন তার সমস্ত নির্যাতন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্য ১০ জনকে পথ দেখাছে সে কিন্তু একজন নতুন বেগম রোকেয়া হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

বেগম রোকেয়ার সময়ে আর কেউ ছিল না। তার সময়ে তিনি যেভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন ওই বেরিয়ে আসার পরিস্থিতি এখন আর ওইরকম নেই। তবে, তিনি যে পথটা তৈরি করে দিয়েছেন সে পথে তখন থেকেই হাঁটা শুরু হয়েছে। সে পথ আরো প্রশস্ত হয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নারীরা নিজেদের উন্নয়নে কাজ করছে কিন্তু ওই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারছে না। আবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ এত প্রাধান্য পাচ্ছে যার কারণে সমাজের জন্য কোন কিছু ত্যাগের মানসিকতা এখন বিরল হয়ে উঠছে।

কিন্তু, প্রত্যেক ধাপে যখন একজন নারী তার অবস্থানকে ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছে সেই একজন নতুন বেগম রোকেয়া হয়েছে, একজন বেগম রোকেয়া জন্ম নিয়েছে বলে মনে করেন শিরিন আক্তার। আজ যে পাহাড়-পর্বত জয় করেছে সে নতুন বেগম রোকেয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একজন নারী গার্মেন্টস কর্মী সে যখন তার সমস্ত নির্যাতন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্য ১০ জনকে পথ দেখাছে সে কিন্তু একজন নতুন বেগম রোকেয়া হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।’

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, সামগ্রিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজ অনেক অনেক নারী নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে, নারী কর্মীরা তৈরি হচ্ছে, সমাজের বাঁকে বাঁকে বেগম রোকেয়ার জন্ম হয়েছে। সমঅধিকারের ক্ষেত্রেও অনেক দাবি আদায় হয়েছে, সমমর্যাদার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা অবদান রেখেছে। লেখনীতে, সাহিত্যে পুরুষতান্ত্রিকতার কবর রচনা করে গণতান্ত্রিক সমাজ যে গড়ে তুলতে পারে তার অনেক প্রতিচ্ছবিও দেখা যাচ্ছে।

. গীতি আরা নাসরীন আজকের নারী আন্দোলনের নেতৃত্বকে দেখছেন এভাবে: এখন যে পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই সেখানে নানা মাপের ভূমিকা কিন্তু অসংখ্য নারী রেখেছেন এবং রেখে যাচ্ছেন। হয়তো কোন ভূমিকা লিপিবদ্ধ কোনটি হয়তো নয়। কিন্তু নারী যে নারী হিসেবে সামাজিক বৈষম্যের শিকার, সেটি এখন সাধারণভাবে স্বীকৃত এবং এ বিষয়ে নারী মুখর।

‘আমার দৃষ্টিকোণে এটিকে একটি সামষ্টিক উত্তরণ মনে হয়। নারীর আইনি অধিকার নিয়ে যিনি লড়ছেন- এরকম নারী থেকে শুরু করে নারীকে স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছানোর যিনি চেষ্টা করছেন, কিংবা ঘরে-বাইরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে যে নারী– সময়ের ক্রমধারায় চিন্তা করলে সেটাও ‘উত্তরণ’। আমি নির্ধারিত বৃত্তের বাইরে পদচারণা করা প্রতিটি নারীর মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের পদশব্দ পাই।’

তবে, বেগম রোকেয়ার মতো নেতৃত্বের শূন্যতা স্বীকার করে নিয়ে বনশ্রী মিত্র এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন এভাবে: নিজের সিদ্ধান্তের জায়গায় নারীরা এগিয়েছে। কিন্তু তিনভাবে নারী নিগৃহীত হচ্ছে চরমভাবে: ১. যৌনজীবনে নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয় না। নিতে পারে না। ২. প্রজননের বিষয়ে নারী নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই জায়গায় নারী আওয়াজ তুলতে গেলে চরমভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। ঘরের কাজের জায়গায়, সন্তান প্রতিপালনসহ গৃহস্থালী কাজে নারী পুরুষকে পাচ্ছে না। পুরুষরা এখনো এখানে হাত লাগায়নি। যতই নারী শিক্ষিত হোক, যতই অর্থনীতিতে অবদান রাখুক– এখানে নারীর ভূমিকার কোন পরিবর্তন হয়নি। ৩. যৌনতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও গৃহস্থালী কাজকে কেন্দ্র করে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য খুব নাজুক অবস্থায় রয়েছে। নারী মানসিকভাবে পর্যুদস্ত। কেউ এ বিষয়টা দেখছে না। দশ হাতে নারীকে সব সামলাতে হচ্ছে। ভালো আয় করতে হবে, ভালো বউ হতে হবে, ভালো মা হতে হবে– সবকিছু যেন একজনকেই করতে হবে। এসব করতে যেয়ে নারীর নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। সংসারের সব দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে নারীর মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে, সেদিকে নজর নেই। নারীর বিশ্রাম নাই, বিনোদনও নেই। সেটা আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না। এরকম মানসিক চাপের মধ্যে থেকে সমাজের জন্য কাজ করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।

এখন কিন্তু সে শিক্ষিত, কিছুটা বুদ্ধি আছে, সে কথা বলে। এই যে মেনে না নেওয়া এটা কিন্তু পুরুষের ইগোতে লাগে, সে তখনই মারমুখী হয়ে ওঠে।

‘শিক্ষা আমাদের প্রয়োজন, অর্থনীতি আমাদের প্রয়োজন সে খাতিরে আমাদের সমাজব্যবস্থা মেয়েদের মবিলিটি (চলাফেরা) মেনে নিয়েছে। যারা সমাজ চালাচ্ছে তাদের প্রয়োজনে মেয়েদের এই জায়গাটা মেনে নিয়েছে কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি।’

বনশ্রী মিত্র

বনশ্রী মিত্রের মতে: সহিংসতার মাত্রা এবং ধরণ এখন অনেক ভয়াবহ ও নির্মম। পরিবারে, সমাজে পুরুষ যা বলে সেটা নারীদের মেনে নেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল বা আছে। তার যাওয়ার জায়গা ছিল না, পায়ের নীচে মাটি ছিল না। এখন কিন্তু সে শিক্ষিত, কিছুটা বুদ্ধি আছে, সে কথা বলে। এই যে মেনে না নেওয়া এটা কিন্তু পুরুষের ইগোতে লাগে, সে তখনই মারমুখী হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি আর তথ্য ব্যবহার করে পুরুষ সহজেই পর্নোগ্রাফি, ড্রাগে আসক্ত হচ্ছে। এগুলো পুরুষকে ভায়োলেন্ট করে তুলছে।

বিশ্বায়নের যুগে সবকিছু মানুষের হাতের আছে। স্বার্থবাদিতা, ব্যক্তিগত লাভ, ভোগবাদিতা এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এক্টিভিজম, সামাজিক সংস্কারের বিষয় এখন গৌণ হয়ে গেছে। এটার সাথে মিলেছে বিশ্বায়ন। বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে মেয়েরা আরো বেশি সঙ্কটাপন্ন, অনিরাপদ। ঘুরেফিরে সমাজব্যবস্থা আবার দায়ী হয়ে যায়। এই জায়গায় নারী এগোতে পারেনি।

বনশ্রী মিত্র বলেন: যখন একটি মৌলবাদী গ্রুপ সে যেই ধর্মেরই হোক না কেন যখন তার ধর্মের বেড়াজালে নারীকে আটকাতে যায় তখন আবার বিরোধ বাধে। বিরোধ কোথায়? নারী শিক্ষায় এগিয়ে গেছে। অর্থনীতিতে এগিয়ে গেছে কিন্তু আবার তাকে পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আরেকটা প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে। সমাজব্যব্যস্থাও ওইভাবে তৈরি হয়নি।

নারী আন্দোলনের কর্মী এবং নারী বিষয়ক গবেষকদের মতে: এসব জায়গায় পুরুষদের ইতিবাচক হতে হবে, তাদেরকে নারীদের পক্ষে আরো সোচ্চার হতে হবে। সত্যিকার পরিবর্তন চাইলে পুরুষকে পাশে থাকতে হবে। তাদের মনোভাব পরিবর্তন ছাড়া নারীমুক্তি হবে না।