চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এইডস: ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীদের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো যাচ্ছে না

এইডস একটি সংক্রামক রোগ, যা এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণের মাধ্যমে হয়। এটি মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এইচআইভি সংক্রমণের ফলে অন্যান্য রোগ যেমন নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। টিবি রোগ থেকেও এইডস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এইচআইভি সংক্রমণের পরের ধাপকেই এইডস বলা হয়। শারীরিক সম্পর্ক, এইচআইভি সংক্রমিত রক্ত আদান-প্রদান, কারও ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে এইডস ছড়ায়। এইডস সম্পর্কে মানুষের কুসংস্কার দূর করাকে গুরুত্ব দিয়ে এ বছর বিশ্ব এইডস দিবসের প্রতিপাদ্য করেছে: থিংক পজিটিভ, রিথিংক এইচআইভি।

১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় দিবসটি। বিশ্বে এইডস রোগীর সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৪টি দেশে বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এইডস রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১০১ জন। সেই সঙ্গে বাড়ছে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। চলতি বছরেও এইচআইভি আক্রান্ত ও এইডস রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে এইডস রোগীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এইডস সর্বপ্রথম ১৯৮১ সালে আমেরিকায় ধরা পড়ে।

১৯৮৫ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে রক্ত এইচআইভি জীবাণুমুক্ত কিনা স্ক্রিনিং করে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল রক্ত সরবরাহ করার পরামর্শ দেয়। এইডস রোগের বাহক হলো অতিক্ষুদ্র এক বিশেষ ধরনের ভাইরাস। এই ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন সেলকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে মানবদেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই এইডস ভাইরাসকেই হিউম্যান ইমিউনোডেফিয়েন্সি ভাইরাস বা এইচআইভি বলা হয়।

এইচআইভি সংক্রমণের সর্বশেষ পর্যায় হলো এইডস। মাইগ্রেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এইডস ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, সরকারি- বেসরকারি অর্থায়ন বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের এইডস আক্রান্তের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন। তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭২টি সেন্টারের মাধ্যমে ১৪ হাজার মাদকাসক্ত, ২৮ হাজার ৬০০ যৌনকর্মী, ১ হাজার ১০৬ এইচআইভি আক্রান্তকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়েছে।

জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক শাখার এক তথ্য মতে, সারা বিশ্বে ৩ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ এইডস আক্রান্ত। ২০১৪ সালে ২০ লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক ও শিশু এইডস আক্রান্ত হয়েছে। ২০০০ হাজার সালের তুলনায় এইডস আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০০০-১৪ সাল পর্যন্ত এন্টি রেট্রোভাইরাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে ৭০ লাখ ৮০ হাজার এইডস আক্রান্ত মানুষকে বাঁচানো গেছে। ২০০৪ সাল থেকে ১০ লাখ ২০ হাজার মানুষ এইডস আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। যা এইডসে মৃত্যু হারের চেয়ে ৪২ শতাংশ কম। ২০১৪ সালে ২ লাখ ২০ হাজার শিশু নতুন করে এইডস আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৪ সালের এন্টি রেট্রোভাইরাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে ১০ লাখ ৪০ হাজার শিশু সুস্থ হয়েছে।

বাংলাদেশে ৩০৯ জন শিশু যাদের বয়স ০-১৪ বছর মূলত জন্মগতভাবেই এইডস আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২০১৪ সালে ৬৩ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ২০৮ জনকে এন্টি রেট্রোভাইরাল ট্রিটমেন্ট দেয়ার প্রয়োজন থাকলেও মাত্র ৭৯ জনকে দেয়া সম্ভব হয়েছে।

২০১৪ সালে এইডস আক্রান্তদের মধ্যে ৩০ শতাংশ নারী। এইডস মুক্ত সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে ১৩৮ গর্ভবর্তী মায়ের চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও পেয়েছেন মাত্র ২৫ জন। সিরিঞ্জের মাধ্যমে যারা মাদক সেবন করেন তাদের এইডস আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ২৮ শতাংশ বেড়ে যায়। যৌনকর্মীদের মাধ্যমে ১২ শতাংশ বাড়ে। ১৯ শতাংশ বাড়ে সমকামীতার মাধ্যমে। ৪৯ শতাংশ বাড়ে হিজড়াদের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত শরীরে গ্রহণ, তার ব্যবহার করা সিরিঞ্জ বা সুই ব্যবহার, আক্রান্ত ব্যক্তির রেজার, ব্লেড বা ক্ষুর জীবাণুমুক্ত না করে আবার ব্যবহার ও আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অনিরাপদ (কনডম ব্যবহার না করে) শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুললে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমনকি এইচআইভিতে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের নবজাতকেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা গর্ভধারণের শেষ দিকে বা প্রসবের সময় হতে পারে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীর সাড়ে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে এইডসবাহী জীবাণু এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত। ২০০৭ সালের জরিপ অনুযায়ী এইডসে আক্রান্ত হয়ে সারাবিশ্বে আনুমানিক ৩৩ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, যার মধ্যে ৩ লাখ ৩০ হাজার শিশু।

যে কোনো বয়সী নারীদের চেয়ে ১৫-২৪ বছরের নারীদের মধ্যে অন্য এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি ৮ গুণ বেশি। ইউএন এইডসের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে আনুমানিক ১১ হাজার।

এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দেয়া রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে এইচআইভি পজিটিভ মানুষ,এইডস রোগী এবং এইডসজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। কয়েক হাজার মানুষ নিজের অজান্তে এইচআইভি জীবাণু বহন করছে এবং অন্যদের শরীরে ছড়াচ্ছে। অন্য দিকে ইউএন এইডসের হিসাব মতে বাংলাদেশে ৮ হাজার থেকে ১৬ হাজার এইচআইভি আক্রান্ত আছে।

জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক কর্মকর্তারা বলছেন, এইচআইভি এইডস মোকাবিলায় বাংলাদেশে আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। তারা বলছেন, বিশ্বের বহু দেশে যখন এর সংক্রমণের হার কমছে সেখানে বাংলাদেশে বাড়ছে।

জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক কর্মকর্তা নাদিয়া ফারহীন রহমান বলেন, দাতা সংস্থাগুলো মনে করছে বাংলাদেশে এখন এ রোগের প্রকোপ কম, তাই সাহায্যের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে তারা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর সংক্রমণের হারের প্রবণতা কমছে, না বরং বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীদের কাছে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা বা চিকিৎসা সেবা পর্যাপ্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না যেটা এইডসের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে থেকে এইডস বিষয়ক বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। ‘বাঁচতে হলে জানতে হবে’ কর্মসূচি এর মধ্যে অন্যতম। এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে এইচআইভি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নেই। ২০১২ সালে সরকারি হাসপাতালে এর চিকিৎসা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন হবার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় হুমকির মুখে আক্রান্তদের জীবন।

গত বছর এনজিওগুলোর সাথে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থসহযোগিতা চুক্তি শেষ হয়ে যায়। এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এইডস আক্রান্তদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিকল্পনা সংক্রান্ত আইনের খসড়াটিও অনুমোদন পায়নি। এতে করে এইডস রোগীদের চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশে গত এক বছরে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৩৩৮ জন, আর এইডস রোগী বেড়েছে ১০৩ জন। এছাড়া এইডসে মারা গেছেন ৬৫ জন।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এইডস্ শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এর পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৭২ জনের। গবেষকরা বলছেন, এইচআইভি সংক্রমিত দুই-তৃতীয়াংশ ব্যক্তিই তাদের সংক্রমণ সম্পর্কে জানে না। তারা না জানলে পরিস্থিতি বদলাবে না। এ জন্য হাসপাতালগুলোসহ কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এইডস বিশ্ব মানবতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভয়াবহ এই রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনকে আরো সংহত করতে পারলে রোগটি থেকে দূরে থাকা অনেকাংশে সম্ভব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail