চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই?

‘কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই: উচ্চশিক্ষা, নীতিমালা, কাঠামো’ শিরোনামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কনভেনশন।

‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ আয়োজিত এই শিক্ষক-কনভেনশনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নানান সঙ্কট, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের গ্যালারিতে উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষক কনভেনশনের প্রথম দিন ‘বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, নাসিম আখতার হুসাইন, আনু মুহাম্মদ, গীতি আরা নাসরীন ও সাঈদ ফেরদৌস।

একই দিন শিক্ষকদের নিয়ে ‘১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন’, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে: প্রাইভেট ও ‘সরকারি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা’ ও ‘নিওলিবারেল রূপান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়’ বিষয়বস্তুর উপর ধারাবাহিক তিনটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘‘কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই? এর উত্তর এককথায় বললে হবে, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় চলছে সে রকম বিশ্ববিদ্যালয় আমরা চাই না। বাংলাদেশে বহু রকমের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩এর অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হয়। এটা শুধু অধ্যাদেশ নয়, এটা একটা ইতিহাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যদি চিন্তা করার সক্ষমতা, প্রশ্ন করার আগ্রহ, সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটা স্বৈরতন্ত্র, নিপীড়ক, রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রভুদের জন্য হুমকি। সে জন্য সরব হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়কে।

বিজ্ঞাপন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন না শিক্ষকরা, কিন্তু সেখানেই আবার প্রাইভেট পড়ানো হচ্ছে। আমরা তা নিধন করতে চাই।’’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা যেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই। এর জন্য দুটি জিনিস দরকার। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা এবং ছাত্র সংসদ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যমে পড়ানো হয়। কিন্তু তা উচ্চমানের হয় না। মাতৃভাষার মাধ্যমে যে উচ্চ শিক্ষা এ চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করি না। প্রয়োজন ছিল মৌলিক বইয়ের, গবেষণার এবং অনুবাদের। কিন্তু তা আমরা তা করতে পারিনি বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজন হলো শিক্ষার্থীরা কিভাবে সাংস্কৃতিক শিক্ষা নিচ্ছে, সামাজিক হয়ে ওঠছে। আর এই বিষয়গুলো ছাত্র সংসদের মধ্যদিয়েই তৈরি হয়। আমরা জানি যে গত ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো ছাত্র সংসদ ছিল না, এখনও যেটা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। তাই এই দুটি জিনিসে যদি সৃষ্টিশীলতা না থাকে তবে এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় নয়।

রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের করতে চায় না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার করতে চায়। রাষ্ট্র যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে এবং যে নিয়ন্ত্রণ রাখে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিপ্লব যাতে না ঘটে। তোমরা শিক্ষিত হও, ভালো হও, বিকশিত হও এবং দক্ষ হও, কিন্তু বিপ্লব ঘটিও না।’’

গীতি আরা নাসরিন বলেন, ‘‘কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই? এ বিষয়টি সামনে আসলেই আমরা যে উত্তর পাই তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ধারণাটি আসলে কী, এ বিষয়টি আমাদের কাছে অস্পষ্ট হতে হতে খুব বেশি আর আমাদের সামনে উপস্থিত নেই। যে কারণে ক্রমাগত আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণাটি ভুলে যেতে শুরু করেছি।

উচ্চ শ্রেণিই এখন তাদের পুঁজিতন্ত্র ধরে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলবে তা নির্ধারণ করে। প্রাচীন চীন সাম্রাজ্যে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়কে আমলা তৈরির কারখানায় পরিণত করা হয়, তেমনই বাংলাদেশেও একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা একই রূপ দেখতে পাই। এখন মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমলা হওয়ার জন্য পড়াশোনা করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যে একটা স্বাধীনতা তার সীমাবদ্ধতা আমরা বৈশ্বিকভাবেই দেখছি। মুক্ত ও স্বাধীন শব্দ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর অবস্থান করছে না। এগুলো ফিরিয়ে আনতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় যে বিভাজন তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে তা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।’’