চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ইনবক্স বন্দি প্রেম’

ফোনে মিসড কল। তা থেকে পাল্টা ফোন। তারপর একাধিকবার ফোন। ফেসবুকে দিনরাত কথামালা। সম্পর্ক বেশ মাখোমাখো পর্যায়ে পৌঁছাল। কিন্তু মাত্র ৬ মাসেই সব শেষ। মাইশা আর আবিরের (ছদ্মনাম) সম্পর্কটা এখন আর আগের মতো নেই। আবিরের ফেসবুকে সবুজ বাতি জ্বলে সারারাত। মাইশাকে নক করে না। মাইশাও জেগে থাকে। জানে আবিরের আর দরকার নেই মাইশাকে। সে অনেক মেয়ের সাথে সারারাত চুটিয়ে আড্ডা দেবে। তবুও মাইশাকে নক করবে না। আবিরও বালিশে মুখ গুজে ভাবে একই কথা। মাইশার না জানি কতগুলো ফেসবুক ফ্রেন্ড। কত জনের সাথে চ্যাট করে কে জানে!

বিজ্ঞাপন

পাঠক, এ শুধু মাইশা আর আবিরের গল্প নয়। সম্পর্কগুলো অস্থির সবখানে। প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ দিনকে দিন কেমন যেন ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় ব্রেকআপ। কেন এতো অস্থিরতা সবার মনে? সবাই কী চায়? কেন কেউ কোন রিলেশন ধরে রাখতে পারছে না? কারণ জিঞ্জেস করলাম কয়েকজন সহকর্মীকে। এক নারী সহকর্মী অকপটে বললেন, ‘প্রেম আর কোথায়? প্রেম হয়ে পড়েছে ইনবক্সবন্দী। যেন সব প্রেম ওই ইনবক্সে। আগে আমরা যখন প্রেম করতাম তখন এক নজর দেখার জন্য বুক টিপটিপ করতো। সামনে দিয়ে একবার হেঁটে যেতে গেলেও পা কাঁপতো। একটা চিঠির জন্য কত কসরতই না করতে হতো। এখন কোন ইমোশন নেই। ভিডিও চ্যাট হচ্ছে। ডেটিং এর জন্য কোন নিরাপদ জায়গার দরকার হচ্ছে না। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সব সেরে নিচ্ছে সবাই। যে সম্পর্ক হৃদয় স্পর্শ করে না সেটা কি আদৌ কোন সম্পর্ক?

বিজ্ঞাপন

আরেক কলিগ বললেন, ‘সবই প্রযুক্তির নেগেটিভ ব্যবহার। সবাই অস্থির। সম্পর্কগুলো টিকছে না ‘ভেঙ্গে যাচ্ছে অহরহ’। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাবা-মা এক ছাদের নিচে থেকেছেন বছরের পর বছর। কারণ সেখানে বিশ্বাস ছিল। একজন আরেকজনের পরিপূরক ছিলেন। বিকেলে আমাদের মায়েরা বাগান করতেন, গাছে পানি দিতেন। সোয়েটার বুনতেন। এখনকার বেশিরভাগ হাউস ওয়াইফ হয় সিরিয়াল দেখেন অথবা ফেসবুকে বসে থাকেন। কারো জন্য কারো যেন অপেক্ষার সুযোগ নেই। আসলেই তো তাই। কারো জন্য কারো অনুশোচনা কিংবা দু:খবোধেরও কোন সুযোগ নেই। বিশ্বাস নেই। ভালবাসা নেই। সবাই ব্যস্ত। তাই হুটহাট ডিভোর্স। ব্রেকআপ। এখন আর কেউ শরৎ-কাহিনী খোলা রেখে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কারো চোখের পাতা কারো পথ চেয়ে নাচে না। সবাই চেয়ে থাকে ওই সবুজ বাতির দিকে। কখন চ্যাটলাইন অ্যাকটিভ দেখাবে!  এই যদি হয় অবস্থা তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কী হবে?

এটা শুনেই এক কলিগ বলে ফেললেন, আমার ক্লাস টেনে পড়া মেয়েকে নিয়ে খুব বিপদে আছি। ফেসবুকে সারাদিন ফালতু কিছু ছেলের সাথে কথা বলে। কখন যে কোন বিপদ পড়ে। নিষেধ করলে শোনে না। বুঝিয়েও লাভ হয়নি। হয়তো প্রতিটা ঘরের চিত্র এটি। কিন্তু শেষ পরিণতি তো সেই ভাঙন। প্রতিদিন ভাঙনের শব্দ শুনতে কার ভালো লাগে? আমার লাগে না। তাই প্রতিদিন বেডরুমের ডানদিকের জানালাটা বন্ধ রাখি।

কারণ সেখান থেকে প্রায় রাতেই এক দম্পতির তুমুল বাকযুদ্ধ আমি শুনতে পাই। সেই শব্দ আমার কাছে ভাঙনের শব্দ মনে হয়। সেটি যখন হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যায়, তখন আর সহ্য করা যায় না। আমি জানি হয়তো এই সম্পর্কটাও একদিন ভেঙে যাবে। জানালটা বন্ধ রাখার আরেকটা কারণ আছে। হাতাহাতির সময় তাদের ছোট্ট বাচ্চাটি চিৎকার করে কাঁদে। আব্বু-আম্মু বলে চিৎকার করে। সেই চিৎকার থেকে নিজেকে লুকাতে আমি জানালা বন্ধ রাখি। কখনো পারি, কখনো পারি না। মাঝে মাঝে জানালা ভেদ করে সেই চিৎকার আমার ঘরে আছড়ে পড়ে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)