চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইংল্যান্ড ম্যাচে কী বার্তা পেল বাংলাদেশ?

সাউথ আফ্রিকাকে ১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ঘরের মাঠে হট-ফেভারিটের মতই বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করেছে ইংল্যান্ড। স্বাগতিকরা বড় ব্যবধানে জিতেছে ঠিকই, তারচেয়েও আকর্ষণীয় ছিল তাদের জয়ের ধরণ। ব্যাটে-বলে একরকম উড়িয়েই দিয়েছে প্রোটিয়াদের। যাদের বিপক্ষে ২ জুন ওভালে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নামবে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের জয়পথ বিশ্লেষণ করে অনেকরকম বার্তারই খোঁজ পেতে পারেন মাশরাফীরা!

ওভালের উদ্বোধনী ম্যাচে শুরুতে বোলিং করতে এসে প্রথম ওভারেই দুবার চমকে দিয়েছিল সাউথ আফ্রিকা। প্রথম চমক আসে ফ্যাফ ডু প্লেসিসের থেকে। প্রোটিয়া অধিনায়ক ইমরান তাহিরের হাতে বল তুলে দেন যখন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো স্পিনার হিসেবে প্রথম বলটি করার নজির গড়েন তাহির। পরের চমকটি আসে তাহিরের থেকেই। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই যখন রানের খাতা খোলার আগে ইনফর্ম জনি বেয়ারস্টোকে সাজঘরে ফেরান তিনি।

শুরুতেই উইকেট হারিয়ে চাপ জেঁকে বসতে যাচ্ছিল ইংল্যান্ডের কাঁধে। সেটি তুড়ি মেরে উড়িয়ে শতরানের জুটিতে জেসন রয় ও জো রুট ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচের ভিত গড়ে দেন। অথচ তাহিরের ধাক্কার পর প্রোটিয়া পেসব্যাটারি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল! সেটি ঘটতে দেননি রয়-রুট, জুটিতে ১০৬ রান তুলে। যেটি তাদের তিনশ পেরোনো সংগ্রহের শেকড় গেঁথে দেয়।

শুরুতে উইকেট হারালেও প্রোটিয়া বোলারদের জেঁকে বসতে দেয়া যাবে না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে জুটি গড়তে পারলে উল্টো চাপে ফেলা সম্ভব তাদেরই। বাংলাদেশ খুব ভালোভাবেই মগজে লেপ্টে নিতে পারে এমন চিন্তা। যদিও এটা সব প্রতিপক্ষের জন্যই ক্রিকেটের চিরায়ত সমীকরণ। কিন্তু বিশ্বকাপের দাবি নিয়ে আসা সাউথ আফ্রিকাকে শুরুতে প্রভাব বিস্তার করতে না দিলে ফায়দা লোটা সম্ভব, সেই জারিজুরি তো আরেকবার খোলাসা হলই! এমন পরিস্থিতি এলে প্যানিক না হয়ে কেবল উইকেটে কামড়ে পড়ে একটু থিতু হওয়ার চেষ্টা করলেই দলকে সাহায্য করা সম্ভব তামিম-সৌম্যদের।

জোড়ায় জোড়ায় উইকেট হারানোর ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অহরহ! এদিন রয়-রুট জুটি যেমন ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, তেমনি আউটও হয়েছেন জুটি বেধেই। তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচে ফিরতে যাচ্ছে প্রোটিয়ারা। সেটি হতে দেননি আরেকটি শতরানের জুটি আনা ইয়ন মরগান ও বেন স্টোকস। এই জুটিও ঠিক ১০৬ রানের।

মরগান ও স্টোকস সে সময় জোড়া আঘাতের বিরুদ্ধে কেবল পাল্টা প্রতিরোধই গড়ে তোলেননি, রানের চাকাও সচল রেখেছিলেন দ্রুতলয়ে। যেটি ম্যাচে ফেরার আশা থেকে অনেকটাই ছিটকে দেয় প্রোটিয়াদের। যা আবার ইংল্যান্ডের তিনশ পেরোনো সংগ্রহ আনার পথ পরিষ্কার করে দেয়।

পরিস্থিতি যাইহোক, জুটি গড়ার চেষ্টা করলে রাবাদা-তাহিরদের যে হতাশ-ক্লান্ত করা সম্ভব, যার ফাঁক গলে রানও বের করে আনা সম্ভব, সেই গর্তটুকুও তো খোলাসা করে দিলেন মরগান-স্টোকস। যতই বলা হোক এই প্রোটিয়া দল অন্যরকম, আদতে তারা দরকারের সময়ে চাপে নিমজ্জিত হওয়া প্রোটিয়াই! বাকি ম্যাচগুলোতে এই সুযোগটা তুলতে চাইবে অন্য সব প্রতিপক্ষও। দরকার হলে বাংলাদেশই কেনো নয়!

ওয়ানডেতে বড় সংগ্রহ আনতে, বা বড় লক্ষ্য তাড়া করতে জুটি বেধে এগোনোর বিকল্প নেই। তাতে হাতে উইকেট থাকলে রানের গতি বাড়িয়ে নেয়া সম্ভব যেকোনো সময়ে! প্রথম ম্যাচ হেরে মুষড়ে থাকা প্রোটিয়ারা পরের ম্যাচে টাইগারদের বিপক্ষে গা ঝারা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইবে ইংল্যান্ড হতাশা থেকে। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে নামার সময় হতাশা যখন তাদের সঙ্গী থাকবেই, সেটি দ্বিগুণ করে দেয়ার সুযোগও থাকবে ওই বড় হারের টাটকা স্মৃতির কারণেই!

চনমনে বাংলাদেশ যখন প্রথম ম্যাচে নামবে, তখন দুইদিনের ব্যবধানে একটি বড় হারের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া আফ্রিকা একটু ক্লান্ত যেমন থাকবে, মরিয়া ভাবটার কারণে তারা সুযোগও দেবে কিছু! বাংলাদেশ সেটা কাজে লাগাতে পারলেই হয়।

স্পিনে প্রোটিয়ারা বরাবরই একটু পিছিয়ে। দলে দ্রুতগতির বোলার থাকলে তাদের বাড়তি একটু ঘাবড়ে দিতে পারত বাংলাদেশ! ঘাবড়ে গিয়েই তো ইংল্যান্ড ম্যাচে খেই হারানোর শুরু প্রোটিয়াদের। ৩১২, বিশ্বকাপের জোর দাবি জানিয়ে আসা কোনো দলের সামনে তেমন বড় বাধা হওয়ার নয়! আধুনিক ওয়ানডেতে যেখানে সাড়ে তিনশ ওঠে হরহামেশাই! কিন্তু শুরুতে জফরা আর্চারের পেস তোপ যখন হাশিম আমলার হেলমেটে লাগল, আমলাকে মাঠ ছাড়তে হল, তখনই পথ হারানোর রাস্তা দেখা শুরু হয়ে গেছে প্রোটিয়াদের। অধিনায়ক ডু প্লেসিস সেটা ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নিজ মুখেই বলে গেছেন।

আর্চারের মতো গতিঝড় তোলার কেউ নেই বাংলাদেশের। তবে গতি দিয়ে ভিতি ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হলেও বাউন্স-সুইং দিয়েও তো কম সুবিধা আদায় করে নেননি ইংলিশ বোলাররা। মাশরাফীর মাপা লাইন-লেন্থ, মোস্তাফিজের ছোবল দেয়া সুইং-কাটার, রুবেলের গতি, আর সাইফউদ্দিনের ইয়র্কার, কয়েকটি ভালো বল ভালো শুরুর পথের কথাই বাতাস দিয়ে যায় বাংলাদেশের পালে।

বাংলাদেশের সবসময়ের শক্তি স্পিনে কার্যকরী থাকা। ওয়ানডের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব যে দলে, মিরাজ গত কিছুদিন যেকোনো কন্ডিশনেই দারুণ বল করে চলেছেন, জোড়াতালির দরকার হলেই মোসাদ্দেক-সাব্বির-রিয়াদরা কার্যকরী কিছু ওভার দিতেই পারেন মাশরাফী আস্থা খুঁজলে। স্পিনে যে প্রোটিয়াদের কাবু করা সম্ভব সেটিও তো মঈন-আদিলরা দেখিয়ে দিয়েছেন। ইংল্যান্ড ম্যাচে পেসাররা ৭ উইকেট নিলেও দুই ইংলিশ স্পিনারের সামনে ডুসেন-ডি ককরা খানিকটা অস্বস্তিতেই ছিলেন!

চড়াই-উতরাই থাকলেও ইদানিং নিজেদের কাজটা ঠিকঠাক করতে জানে বাংলাদেশও। ওপেনিংয়ে ঝড়ো শুরুর সামর্থ্য রাখে, পারঙ্গম হয়ে উঠছে জুটি গড়ে এগোতে, বিপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে, দরকার হলে পারে হাত খুলে মারতে, আর পেস-স্পিনে সর্বোস্ব নিংড়ে দেয়ার সামর্থ্যই তো বদলে যাওয়া বাংলাদেশ তকমা এনে দিয়েছে।

ইংল্যান্ড ম্যাচের দিকে তাকিয়ে সাউথ আফ্রিকাকে মুষড়ে দেয়ার বাড়তি রসদ নিজেদের পরিকল্পনার তুনে খানিকটা মিশ্রণ করে নিতে পারলে দারুণকিছুই আশা করা যায়। তবে সবশেষে তাকিয়ে থাকতে হবে সামর্থ্যকে মাঠের পারফরম্যান্সে রূপ দিতে পারার স্পৃহার দিকেই। নিজেদের দিনে তো তৃষিত সেই বাংলাদেশ ভয়ঙ্করই!