চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আসল নির্বাচন ও নকল নির্বাচন

সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পরাজিত প্রার্থী ও গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বলেছেন, “আওয়ামী লীগ একসময় মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করতো। এখন তারা মানুষের অধিকার হরণ করেছে। যে নির্বাচন হয়েছে তা আসল নির্বাচন নয়। তারা ভোট ডাকাতি করেছে।” আসল নির্বাচনের জন্য নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ৪ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে রেজা কিবরিয়া নবীগঞ্জ উপজেলার জলালসাপ গ্রামে নিজের বাড়িতে আসেন। তিনি আসছেন জানতে পেরে আগে থেকেই ওই বাড়িতে ভিড় করেন নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা। রেজা কিবরিয়াকে কাছে পাওয়ার পর নেতা-কর্মীরা ভোটের দিন ও আগের দিনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। অনেকে রেজা কিবরিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। (প্রথম আলো, ৫ জানুয়ারি, ২০১৯)।

বিজ্ঞাপন

বিদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক রেজা কিবরিয়ার বাবা শাহ এ এম এস কিবরিয়া ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের (১৯৯৬-২০০১) সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী; যিনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক রাজনৈতিক জনসভা শেষে বের হয়ে আসার পথে স্কুলগেটে দুর্বৃত্তদের গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। বিচারাধীন ওই মামলার আসামিরাও বিএনপির নেতা-কর্মী। তাই বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে তাদেরই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে রেজা কিবরিয়া সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন-এমনটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। 

কিন্তু বাস্তবে তাই-ই করেছেন তিনি। কেন করেছেন-প্রার্থী হওয়ার আগে সে বিষয়ে একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। তার ক্ষোভ হচ্ছে দীর্ঘ ১৪ বছরেও তার বাবা সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন না হওয়া। কারণ এই ১৪ বছরের মধ্যে টানা ১০ বছরই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এই ক্ষোভ থেকেই রেজা কিবরিয়ার রাজনৈতিকপক্ষ বদল। তবে সরাসরি প্রয়াত বাবার শত্রু পক্ষের সঙ্গে না মিলে তিনি যোগ দিয়েছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে। যোগদানের পরপরই তাকে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়। আর কামাল হোসেনের নেতৃত্বেই গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট; যার প্রধান শরিক বিএনপি।

নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর রেজা কিবরিয়া বললেন, “যে নির্বাচন হয়েছে তা আসল নির্বাচন নয়”। আসল নির্বাচনের জন্য নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত হতে বলেন তিনি। সদ্যসমাপ্ত একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিংবা হয়নি সে প্রসঙ্গে আমি যাবো না। এ নিয়ে নানামুখি আলোচনা-সমালোচনা আছে। যদিও নিরঙ্কুশ বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবারের নির্বাচনে তাদের বিজয়কে সরকারের অভূতপূর্ব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য বলে দাবি করছে।

অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট এই নির্বাচনকে জাতির সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রহসন বলে আখ্যায়িত করে পুনর্নির্বাচন দাবি করে আসছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য দুটি পক্ষ সিপিবি-বাসদ নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছে।

তবে তর্কের খাতিরে বিরোধীপক্ষগুলোর অভিযোগ সঠিক ধরে নিয়েই কয়েকটি প্রশ্ন রাখছি: ১. ভোটগ্রহণ যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতো, তাহলেও কি মহাজোটকে হারানো যেত? ২. ঐক্যফ্রন্ট কিংবা বাম জোটের কি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার মতো জনপ্রিয়তা অথবা ৩০০ আসনে জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি ছিল? ৩. ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি কি অনেক আগে থেকে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়েছিল? ৪. চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার অবর্তমানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা কি দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন?

বিজ্ঞাপন

৫. লন্ডনে অবস্থানরত (পলাতক) ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন তারেক রহমান কি গত ১০ বছর দলীয় নেতাদের স্বাধীনভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাতে দিয়েছেন? ৬. মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির উদারপন্থী নেতারা কি ২৫ জন জামায়াত নেতাকে বিএনপি পরিচয়ে দলের মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন? ৭. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে যুদ্ধাপরাধী দল ও উচ্চ আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর চিহ্নিত নেতাদের ঐক্যফ্রন্টের (বিএনপি) মনোনয়ন দেয়াকে নতুন প্রজন্মের ভোটাররাসহ সাধারণ মানুষ কি ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছিল? 

আমি নিশ্চিত যে, ওপরের সাতটি প্রশ্নের প্রত্যেকটিরই জবাব হচ্ছে ‘না’। এই এতোগুলো ‘না’ এর মধ্যে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে ঐক্যফ্রন্টের জন্য বিশেষ করে কামাল হোসেনের গণফোরাম, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আ স ম আব্দুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যর জন্য ‘আসল নির্বাচন’ ছিল না- তা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। যদিও রেজা কিবরিয়া পরাজয়ের গ্লানি ও ক্ষোভ থেকেই এমন কথা বলেছেন। তবে আসল নির্বাচনের জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তাও অমূলক নয়। কারণ এই নির্বাচনই তো শেষ নয়। সংবিধান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পরই সংসদ নির্বাচন হবে। সেসব নির্বাচনেও প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের প্রয়োজন হবে। তাই আগাম বার্তা দিয়ে রাখাটাও দূরদর্শীতার পরিচয়।

প্রয়াত শাহ এ এম এস কিবরিয়া তর্কাতীতভাবে একজন সফল অর্থমন্ত্রী এবং সৎ, ভদ্র ও অমায়িক রাজনীতিবিদ ছিলেন। একসময়ে দক্ষ আমলা ও কূটনীতিকও ছিলেন তিনি। তার উত্তরসূরি রেজা কিবরিয়াও একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। একজন ভদ্র ও সজ্জন মানুষ হিসেবে তিনিও সর্বমহলে পরিচিত। পিতৃ হত্যার বিচারে বিলম্বের ক্ষোভ ও দুঃখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপরীত স্রোতে যুক্ত হয়েছেন তিনি। তার এমন ক্ষোভ ও দুঃখ নিরর্থকও নয়। কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্নে দীর্ঘসূত্রিতা অত্যন্ত দুঃখজনক। নিহত কিবরিয়ার স্বজনদের সঙ্গে সারা দেশের শান্তি প্রিয় জনগণও প্রকৃত খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রত্যাশা করে। তবে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে যুক্ত হলেও সেখানে অবগাহন করেননি। নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে প্রার্থী হওয়ার স্বার্থে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও তিনি বিএনপিতে না ভিড়ে যোগ দিয়েছেন গণফোরামে।

যদিও কামাল হোসেনের হাতে গড়ে এই গণফোরামের সাংগঠনিক ভিত্তি খুব দুর্বল। দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় দলটির জোরালো তৎপরতাও নেই। সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক পরিচিতি না থাকায় গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাও কম। তবে জন্মলগ্ন থেকেই দলটি সুশাসনের কথা বলে আসছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলে আসছে। এই দলে কোনো যুদ্ধাপরাধী কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকও নেই। বরং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আছেন; আছেন উচ্চশিক্ষিত অনেক মানুষ। এছাড়া আমাদের দেশের রাজনীতিতে নেতার ছেলে নেতার দলে ভিড়ে উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব দখল এবং ক্ষমতাসীন দলে ভিড়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অর্থবিত্ত অর্জনের যে সংস্কৃতি বহমান, তার বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন রেজা কিবরিয়া। সেই বিবেচনায় তার গণফোরামে যোগদান অগ্রহণযোগ্য কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বরং ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির উত্তরাধিকার সংস্কৃতি বদলানোর এক অনন্য নজির।

সুতরাং রেজা কিবরিয়ার উদ্দেশে বলতে চাই, তিনি কর্মী-সমর্থকদের আসল নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন তা যেন বছরজুড়ে কার্যকর থাকে। তিনি যেন নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে সাধ্য অনুযায়ী দলকে শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা চালান এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আগামি নির্বাচন পর্যন্ত সক্রিয় রাখেন। তাকে উপলব্ধি করতে হবে যে, ড. কামাল হোসেনের ঘন ঘন বিদেশ যাত্রা ও সেখানে দিনের পর দিন অবস্থানের কারণে একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার মতো জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারেননি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজীবী। একই কারণে দীর্ঘ আড়াই দশকেও জাতীয় রাজনীতিতে গণমুখী চরিত্র অর্জন করতে পারেনি গণফোরাম। তাই রেজা কিবরিয়ার ক্ষেত্রে তেমনটি যেন না হয়। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে অনন্যোপায় হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা বিএনপির সঙ্গে এবার যেমন গাঁটছাড়া বেধেছিল গণফোরাম, আগামিতে আমরা তা আশা করি না। 

দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর বিনিময় অর্জিত এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, লাল-সবুজের পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান হাতিয়ার ১৯৭২ এর সংবিধান। শহীদদের রক্তাক্ষরে লেখা এই সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক কামাল হোসেনের হাতেই জন্ম নিয়েছে গণফোরাম। সুতরাং এই দল ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের সুবিধাভোগী, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধবিরোধী কোনো অপশক্তি কিংবা একাত্তরের পরাজিত ধর্মাশ্রয়ী কোনো গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে- এ দেশের সাধারণ জনগণ তা প্রত্যাশা করে না।

একাত্তরের চেতনাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা; যার মর্মার্থ হচ্ছে শোষণ-বৈষম্যহীন, দারিদ্রমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। পবিত্র সংবিধানেও এই চেতনার প্রতিফলন রয়েছে। যদিও বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রেই রয়েছে গরমিল। তাই ভবিষ্যতে ভোটের ময়দানে সকলপক্ষই যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী হয়, রেজা কিবরিয়ারা যেন সে কাজটিই করতে পারেন। আর তাহলে সেটিই হবে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমে পরাজিত সৈনিক রেজা কিবরিয়ার ‘আসল নির্বাচন’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)