চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আশ্বিনে পুড়ছি

আশ্বিন মাসের ৪ তারিখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; আজ। বাংলার ঋতুচক্রে শরৎকাল। শরতের প্রথম মাস ভাদ্র বিদায় হয়েছে; আর ভাদ্রে ‘তালপাকা’ গরম পড়ে এটা বাঙালির মগজে মননে গেথে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। তাই বলে শরতের আশ্বিন মাসে এমন তাপদাহ, এমন ঘামময় দিনরাত্রি!

আশ্বিনে চৈত্রের তাপদাহ শহরজুড়ে! শেষ রাতে একটু তাপ কমে এলেও সূর্য ওঠার পর থেকেই তপ্ত হাওয়া। দেশের এ কোণায়, ও মাথার খবর পাই; সেখানে বাতাসে শীতের আগমন বার্তা। অথচ ঢাকা শহরে খরতাপ। ঢাকা কিংবা হোক সে কলকাতা, নগরের রূপতো একই প্রায়। তাই কলকাতার বাঙালি কবি, শীতাকাঙ্খী ভাস্কর চক্রবর্তী কবিতায় আর্তি গেয়েছিলেন ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’। আশ্বিনে শহরজুড়ে, দিনমান এই ঘামঝরানো, ক্লান্তকরা গরম আর সইছে না। তাই আমরাও বলছি শীতকাল কবে আসবে?

খুব কি বেশি দূরের কথা? মাত্র ৩০ বছর আগেও। ঢাকা শহর তখনো এতো বিস্তার লাভ করেনি। শহরের বক্ষনীড় থেকে দালান উঠে যায়নি এভাবে আকাশে আকাশে! তখন শরৎকালে বাতাসে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ লেগে থাকতো। তখন শহরের ধানমন্ডি, গুলশান ছিলো অভিজাত আর নান্দনিক এলাকা। তখন সেখানে বাড়িতে বাড়িতে একটু হলেও বাগান থাকতো। বাড়ির দেয়াল ঘেষে থাকতো শিউলি, শেফালি আর কাঁঠালচাঁপার গাছ। শরতের সকালে বাগানজুড়ে, বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকতো লালবোটা শিউলি ফুল। ভাদ্রের শেষাশেষি ভোরের বাতাস, সকালের হাওয়া কেমন মায়াজড়ানো হয়ে যেতো। মন টের পেয়ে যেতো শীত আসি আসি করছে। বাতাস ফুরফুরে ছিলো তখনো।

সেই সময়কে, সেই শহরকে আমরা পিছনে ফেলে ‘বিপদজনক নগর’ এক নগর গড়ে তুললাম আমরা। বিশ্বব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, ‘দূষণের কারণে কেবল ২০১৫ সালেই বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মারা গেছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ১০ গুণ।’

এবার বর্ষা শুরু হয়েছিলো গ্রীষ্মকালে। নানা দুর্বিপাক আছে, তারপরও বর্ষাকে আশীর্বাদ বলে মনে হয় ধূলাধূসরিত এই শহরের জন্য। শীতকাল এখনো অনেক দূরে, আর এরই মধ্যে শহর তলিয়ে যেতে শুরু করেছে ধূলায়। এই ধূলা, আর দূষণ আমাদের নগরজীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। বৃষ্টিহীন শীতকালে এটা কী রূপ নেবে ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। তারপরও গরম থেকে রক্ষা পেতে নগরবাসী চাইছে এখনি একটু শীত নেমে আসুক।

আর শীতকালে ধূলা-দূষণ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে কীভাবে কেউ স্থির, নিশ্চিত করে বলে দিতে পারছে না!

একথাতো ঠিক যে, শত প্রতিকূলতায় আমরা এখনি এই শহর ছেড়ে চলে যেতে পারছি না। বাতিল ঘোষণা করতে পারছি না ঢাকাকে। তাহলে একে বাসযোগ্য করার কি কোনো উপায় নেই? নেই কোনো পরিকল্পনা? ঢাকা শহরের ধাবমান বিস্তার মেনে নিয়েই উত্তর আর দক্ষিণে দুই সিটিকরপোরেশনে ভাগ করা হয়েছিলো। উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন এক স্বপ্নবান মানুষ আনিসুল হক। ঢাকাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিলো। তিনি আধুনিক বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মৃত্যুর অনিবার্য টানে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে ঢাকা থেকে, দুনিয়া থেকে। তার সেই ঢাকা মহানগর আছে, উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও আছে। প্রশ্ন হলো একজন মেয়র, একজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার স্বপ্ন, তার পরিকল্পনাও কি মরে যায়? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের আবারো জিজ্ঞাসা, মেয়র আনিসুল হকের পরিকল্পনাগুলো একটু একটু করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেনো?

ঢাকার আরেক অংশের মেয়র সাঈদ খোকনকে দেখছি নিজেই মডেল হয়ে বিজ্ঞাপন বানিয়েছেন বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার ডাক দিয়ে। তিনি সম্মানীত মানুষ। এই শহরের, এই দেশের সনামধন্য রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ হানিফের পুত্র তিনি। আমরা তাকে ‘সুযোগ্য’পুত্র বলেই মানতে রাজি। তাহলে তিনিও কেনো ঢাকাকে বাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে পারছেন না? অথচ তিনিই তো বলেছেন, সিটি করপোরেশনে টাকার কোনো অভাব নেই। তাহলে? এটাতো ঠিক যে, মেয়র সাঈদ খোকন সুযোগ আর সময় হলেই ঘুরে দেখেন অনেক অনেক দেশ, শহর। সেসব সাজানো, ফুলময় দূষণহীন পরিপাটি শহর দেখে তার বুকের তলে কি একবার চিনচিনে অনুভুতি হয় না, প্রশ্ন জাগে না- ‘আহা তিনি যে শহরের মেয়র, সে শহরটাও যদি অমন হতো’!

এই আশ্বিনের সকালে বসে শহর নিয়ে এতো কথা বলার কারণ ওই যে একটাই আমরা যদি চাইতাম, আমরা যদি ভাবতে পারতাম এই শহর আমাদের, তাহলে সব কিছু অন্যরকম হয়ে যেতো। আশ্বিনে এভাবে পুড়তে হতো না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)