চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আলোর পাহাড়ে প্রভাবশালী হাসি

প্রতিযোগিতাময় নিয়মিত কলেজ পাঠ শেষ করে ক্লান্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী, সহপাঠীদের সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে এগিয়ে যাওয়া বাড়ির পথে। বাড়ির পথ বলতে রাজধানীর মহাসড়কের পাশে ‘মহান গণপরিবহন’ এর জন্য অপেক্ষা, বাড়িতে মা অপেক্ষায়। কিন্তু কে জানতো মায়ের সেই অপেক্ষা চীরদিনে অপেক্ষায় রূপ নেবে? দুই বাসের প্রতিযোগিতার বলি হয়ে তারা আর কোনোদিন ফিরবে না মায়ের কোলে। এমনই মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিয়ে রাজধানীর খিলক্ষেত মোড়ে বাস চাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী পরিবহন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। ‘জাবালে নূর’ নামে একটি বাস এই ঘটনার জন্য দায়ী।

২৯ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচার পরপরই তা সারাদেশের মানুষের মনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর পরিবহন কোম্পানির বাস-মিনিবাস দিন দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠার ঘটনা নতুন নয়। এসব গাড়ির চালক-শ্রমিকদের কাছে অন্য গাড়ি, যাত্রী, পথচারী সবার জীবনই বিপন্ন। মালিকদের ক্ষমতার দাপটে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটিয়েও চালক-শ্রমিকরা পার পেয়ে যান। জনগণের পাশাপাশি এগুলো ঠিক করার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এসব কোম্পানির গাড়ির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

রাজধানীতে যারা বসবাস করেন এবং নিয়মিত প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করেন, তারা জানেন কী পরিমাণ অব্যবস্থা এই সেক্টরে! প্রায় সবরুটেই এমন একটি বাসের এমন একটি ট্রিপ নেই যাতে কোনো ধরণের ঝামেলা হয় না। ভাড়া নিয়ে সমস্যা, লোকাল-সিটিং সমস্যা, নারী যাত্রীদের সমস্যা, বেপরোয়া-জ্ঞানহীন ড্রাইভিংসহ অসংখ্য নিয়ে চলছে একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীর গণপরিবহন। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তজার্তিক জরিপ ও প্রতিবেদনে এসব নেতিবাচক বিষয় অনেকবছর হলোই উঠে আসছে।

রাজধানীতে বাসচালক-স্টাফরা মালিকদের ভাড়ার টাকা শোধ করার পর বাড়তি মুনাফার জন্য গাড়িতে গাড়িতে প্রতিযোগিতা, একে অন্যের গাড়িতে আঘাত ও সর্বশেষ এই মর্মান্তিক ঘটনার মতো অবস্থার অবতারণা করছে। একটি গাড়ি চালানো শুধু গাড়ি চালানো না, এটা যে একটি সেবা ও দায়িত্ব, সেই কথা বোঝার মতো জ্ঞান ও উপলব্ধি পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে নেই বললেই চলে। ব্যতিক্রম যে নেই তাও নয়, তবে বেশিরভাগই তারা আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। রাস্তায় প্রতিযোগী দুই বাসের চাপায় পড়ে কিছুদিন আগে হাত হারিয়ে পরে জীবনও হারিয়েছেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন। এভাবে শুধু রাজীব নন, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ হাত-পা হারিয়ে বরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন পঙ্গুত্বের দুর্বিষহ জীবন। অনেককেই হারাতে হচ্ছে জীবনও।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে ১ হাজার ৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১২৩ জন নিহত ও ৫ হাজার ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এ বছর দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মোট ৩ হাজার ৩৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৩৩টি। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৯০৮ জন, যা ২০১৬ সালের চেয়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি পথচারী। এই সংখ্যা ২ হাজার ৮০৪ জন। ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪২৭ জন। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একটি পরিবার কী ধরণের শোক ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা ভূক্তভোগী ছাড়া কাউকে বোঝানো সম্ভব না। রাজধানীতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কোনো বিশিষ্ট নাগরিক, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতার পরিবারের সদস্যসহ পরিচিত কেউ কখনও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতে হলে নিহতদের স্বজন-শুভাকাঙ্খীরা মাঝে মাঝে আন্দোলন-অবরোধের পথ বেছে নেয়, তখন বেশ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ পায়। এছাড়া সারাদেশে নীরবে ঘটে যাওয়া পরিবহন সন্ত্রাস-অব্যবস্থাপনার শিকার হওয়া হতভাগ্যদের নিয়ে কোনো আলোচনা-ঘটনার বিচার কিছুই হয় না।

বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেন না- যাত্রী কল্যাণ সমিতি এই তথ্য জানিয়েছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ভয়ে এবং মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের আশ্রয় নেয়ার প্রবণতা কম। তারা ৮০ শতাংশ বললেও আমার ধারণা এর হার প্রায় ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি, সড়ক সন্ত্রাসের শিকার হওয়াকে ভাগ্য বলেই হয়তো মেনে নেন নিহতদের পরিবার। প্রভাবশালী বাস মালিক/নেতা ও প্রায় অশিক্ষিত পরিবহন শ্রমিকদের ‘মারাত্মক জোটবদ্ধ’ শক্তির কাছে সঙ্গে সাধারণ মানুষ কিছুই করতে পারেন না।

খিলক্ষেত মোড়ে ‘জাবালে নূর’ নামে যে বাসটি ৪ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ, সেই বাসের মালিক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নিকট আত্মীয়। তার নাম নামরিন খান। নামরিন খান মন্ত্রী শাজাহান খানের স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া খানের বোনের মেয়ে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। অনেকে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অনেকদিন ধরেই পরিবহন খাতে অব্যবস্থার জন্য অভিযুক্ত নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দায় মুক্তি করতেই পারেন, তারপরেও প্রায় প্রত্যকটি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে দলীয়, প্রশাসনিক প্রভাবশালীদের নামগুলো ওপেন সিক্রেট। কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেই সেগুলো মাঝে মাঝে আলোচনায় চলে আসে, এছাড়া সারাবছরই নীরবে সহ্য করে জনগণ।

রাজধানীসহ সারাদেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) এখন একটি মৃতপ্রায় সংস্থা। জনগণের সুবিধার ও সেবার জন্য বিদেশ থেকে বিশেষ শুল্কসুবিধায় বাস নিয়ে এসে তা বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া ছাড়া কোনো কর্মকাণ্ড এখন আর চোখে পড়ে না। যানবাহনের চাপ কমাতে বিলাসবহুল ভলভো বাসের অনিয়ম-লুটপাট গণমাধ্যমে এসেছে বহুবার, আর দোতলা বাস এখন নামেমাত্র টিকে আছে জনগণের সেবায়। গত একযুগের বিআরটিসির পরিসংখ্যানে খোঁজ নিলে বেরিয়ে আসতে পারে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভোরবেলা রাজধানীর রাস্তায় দেখা যায়, দোতলা বাসগুলোতে কোনো সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা পুরো বাসের অনেকটাই খালি রেখে অফিসে যাচ্ছে। আর যেসব সাধারণ জনগণের জন্য সেই বাস আমদানি করা হয়েছে, তারা অফিস যাবার যুদ্ধে প্রাইভেট বিভিন্ন বাসের পেছনে ছুটছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরায়ও একই চিত্র! এছাড়া বিআরটিসি বাসের প্রশিক্ষিত ও বেতনভূক্ত চালক-কর্মীরাও দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

পরিবহন খাতে এই অবস্থার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে ড্রাইভার নিয়োগে অব্যবস্থা, লাইসেন্স প্রদানে অনিয়ম ও পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত মর্যাদার ঘাটতি বিষয়গুলোও সামনে চলে আসে। ঢাকা শহরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছে চালকদের চাকরি স্থায়ী না, তার উপর বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীদের টাকা দিতে হয়। সেইসব টাকা উঠানোর জন্য চালকরা কার আগে কে যাবে এমন প্রতিযোগিতায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থা কেমন হয়, আর আমরা কোন অবস্থায় আছি? এটা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়। সেইসব দেশে একটি নির্দিষ্ট মানের গাড়ি রাস্তায় থাকে চালকদের যথেষ্ট ভদ্রতা, কার্টেসি, ম্যানার শেখাতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণ সামাজিক মর্যাদা না থাকার কারণে শিক্ষিত লোকেরা ড্রাইভিং পেশাতে আসছে না, সেজন্য স্বল্প শিক্ষিতরা ও অশিক্ষিতরা পরিবহন সংক্রান্ত পেশাতে এসে নানা অব্যবস্থার ফসল হিসেবে সড়কে-মহাসড়ককে মৃত্যুকূপে পরিণত করেছে। ‘জাবালে নূর’ শব্দের অর্থ ‘আলোর পাহাড়’, এই নামের একটি বাস রাজধানীতে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়েছে তা সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছে, ভাবিয়েছে এবং ভাবাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এধরণের ভাবাবেগ আমাদের জাতির কোনো পরিবর্তনে খুব একটা কাজে দিচ্ছে না, যতক্ষণ না আইনপ্রনেতা, মন্ত্রী ও দায়িত্বশীলরা তাদের কর্তব্যপালনে একনিষ্ঠতা দেখাচ্ছেন। কারণ দু:খজনক হলেও সত্য যে, দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্নধরণের নেতিবাচক ঘটনার পেছনে ডালপালা-লতায়পাতায় প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়/যাচ্ছে। আর কোনো গণদাবীকে যতই যৌক্তিক মনে হোক না কেন, প্রভাবশালীরা প্রায়ই সেসব দাবীকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে জনগণের কণ্ঠরোধ করার দারুণ সফল কৌশল কাজে লাগাচ্ছেন। নিরাপদ পরিবহনের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ছবিতে পরিবহন শ্রমিকদের জুতা পেটা, আদালতের আদেশে সাজাপ্রাপ্ত চালকের মুক্তির দাবিতে প্রভাবশালীদের সরাসরি মদদে পরিবহন ধর্মঘটের ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ ‘আলোর পাহাড়’ ওই বাসের কারণে ওই ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের হাসিহাসি মুখে সাংবাদিকদের জবাব দেবার ঘটনা বিষয়টির মুখে-কপালে জুতা মারার মতো মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মৃত্যু মন্ত্রী মহোদয়ের মনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, তা তার ‘প্রভাবশালী ও সাবলিল হাসি’ দেখে মনে করেছে দেশের মানুষ, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশও করেছেন সাধারণ মানুষ।

কীভাবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে? তা ভেবে ও কাজ করার জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের শুভ বুদ্ধি উদয় হোক…. এছাড়া আর কী’ই বা কামনা করতে পারে সদ্য উন্নয়নশীল দেশের তকমা লাগা দেশের নাগরিকরা!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)