চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আমি নেতৃত্ব দিছি, কিন্তু পদের প্রতি কোনো মোহ ছিল না’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী আব্দুল জলিল ভূইয়ার জন্ম ১৯২৯ ৯ জানুয়ারি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার হারং গ্রামে। তার বাবা আলী নেওয়াজ ভূইয়া।

বিজ্ঞাপন

চান্দিনা পাইলট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পর ১৯৪৭ সালে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসিতে ভর্তি হন ১৯৫০ সালে। ছাত্র অবস্থায় তিনি স্টুডেন্ট ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। লেখাপড়া শেষ করে রাজনীতি এবং শিক্ষকতা করেন তিনি। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯২ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল থেকে অবসর নেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর রাজনীতি করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতাও করেছেন।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হারং গ্রামে নিজ বাড়িতে এই ভাষা সংগ্রামীর সাক্ষাৎকার নেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

সাক্ষাতকার শুরুর সময় খেয়াল করলাম আমি যে প্রশ্ন করি সাথে সাথে তিনিও মুখ ঠোট জিহ্বা নেড়ে সে প্রশ্ন করছেন। তার অর্থ, তিনি কানে কম শোনেন, কিন্তু সেটা কাউকে বুঝতে দিতে চান না। এই অধ্যবসায় দিয়ে মুখভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারেন একজন কী কথা বলছেন।

তা. ই. মাসুম: আপনি ভাষা আন্দোলনে কখন, কী ভাবে যুক্ত হলেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: ১৯৪৮ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে ভাষা আন্দোলনে জড়িত হলাম। তখন ছাত্রাবাসে থাকতাম। স্কুল জীবন থেকে রাজনীতি সচেতন ছিলাম। ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি, বড় কামতা হাই স্কুলে, তখন স্কুলে ছাত্র ফেডারেশন হল, আমার বসয়স তখন ১৪ বছর। একজন শিক্ষক ছিলেন মজুমদার স্যার, তিনি সিনিয়র ছাত্রদের নিয়ে সেল করলেন। ভাল ছাত্র হিসেবে আমার নাম ছিল।

জগন্নাথ কলেজে আমার সঙ্গী ছিল মোহাম্মদ তাহা, মমিনুল হক চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন, মঞ্জুর এলাহী বেগ, আমিরুল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন, মোসলেহ উদ্দিন সিএসপি, পরে ডক্টরেট করছিল।
ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার চেষ্টা করল সরকার। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠল পূর্ব বাংলা থেকে। সেই সময় ভাষার প্রতি একটা ভালবাসা জন্মায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে, ফোর্টি এইটের পরে, ফোর্টি নাইন, ফিফটি, ফিফিটি ওয়ান এই সময়ে কিন্তু ভাষা আন্দোলনটায় খুব তোড়জোড় ছিল না।

ছিল না মানে, এইটা আমরা পালন করতাম (১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস)। তখন আমাদের ঐ মতিন, ‘ভাষা মতিন’ তার নেতৃত্বে ফোর্টি নাইনে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হল। এই পরিষদের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করি।

ফিফটির পরে ফিফটি ওয়ানে যুবলীগ হল। যার ফাউন্ডার সেক্রেটারী ছিলেন অলি আহাদ। যুবলীগের প্রতিষ্ঠার জন্য একটা সম্মেলনের আয়োজন করা হল ঢাকায়। সরকার পক্ষ তাতে বাধা দিল। তখন এইখানে আর করা হইল না। তখন ঐ বুড়িগঙ্গাতে গিয়া নৌকার মধ্যে বইসা এখানে একটা ইউনিট করা হইল।

তা. ই. মাসুম: কোনটা? ওইটা কী ইউনিট?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। তখন ছিল অলি আহাদ। অলি আহাদ (পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক) ছিল এটার উদ্যোক্তা। অলি আহাদ, আরো অনেকে ছিল।

তা. ই. মাসুম: নৌকায় করলেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: হ্যাঁ, নৌকায় গিয়া আমাদের করতে হইল। কারণ এখানে করতে দিল না। তখন আমরা, তখন কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, এই ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে মুসলিম লীগ গভর্নমেন্ট এগুলো করতে দিতো না।

তা. ই. মাসুম: ’৫২ তে?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আচ্ছা, ’৫২ তে ঐ ছাব্বিশে জানুয়ারি খাজা নাজিম উদ্দিন যখন বললেন, উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। তখন কিন্তু আমাদের আবার, ঐ যে, আমাদের সংগ্রাম পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের, এটা সক্রিয় হইল। এবং আমরা, ২৬ তারিখ এ ঘটনা ঘটল, ২৭ তারিখেই আমরা ইউনিভার্সিটিতে বিক্ষোভ করলাম।

তা. ই. মাসুম: এরপরে? এরপরে তো সর্বদলীয় কমিটি হলো?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আচ্ছা, সর্বদলীয় কমিটি হইলো। এটা হইলো আমাদের ৩০ তারিখ, ৩০ শে জানুয়ারি। সব দলের লোক নিয়া কমিটি হইল এবং প্রিজাইড করলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আর আহবায়ক নিযুক্ত হইলেন কাজী গোলাম মাহবুব। আর ইউনিভার্সিটি থেকে ২ জন প্রতিনিধি নেওয়া হইল। প্রত্যেক সংগঠন থেকে ২ জন করে প্রতিনিধি নিয়া ৪০ জনের একটা কমিটি হইল। আমি অবশ্য সংগ্রাম পরিষদে ছিলাম না। আমি একজন কর্মী। আমি ছিলাম একজন সক্রিয় কর্মী।

তা. ই. মাসুম: বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে ছিলেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আব্দুল মতিন সহ বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে ছিলাম। ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের ব্যাপারে ৪ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সভাপতিত্ব করলেন গাজীউল হক। এরপরে ১২-১৩ আমরা…।

ভাষা সংগ্রামী আব্দুল জলিল ভূইয়া
যুবক বয়সে আব্দুল জলিল ভূইয়া

তা. ই. মাসুম: পতাকা দিবস?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: হ্যাঁ, পতাকা দিবস পালন করলাম। ১৯ তারিখে আমরা আবার একটা বিক্ষোভ মিছিল করলাম, একটা মিটিং করলাম। প্রথমে তো আমরা বিক্ষোভ মিছিল করলাম, সমস্ত ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করলাম। ৪ তারিখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ২১ তারিখ ভাষা দিবস পালন করব, (গণ-পরিষদে দাবি নিয়ে যাব বাজেট অধিবেশনে) এই।

তা. ই. মাসুম: এরপরে?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: ২০ তারিখে, ২০শে ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে বিকাল বেলা, আমরা শুনতে পারলাম গভর্ণমেন্ট এনাউন্স করতেছে যে, ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হইল। এবং সব ধরনের শোভাযাত্রা মিছিল মিটিং সবকিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইল। তখন আমরা যে যেই হলের সঙ্গে এ্যাটাচ ছিলাম আমরা মিটিং করলাম হলে হলে।

তা. ই. মাসুম: আপনি কোন হলে ছিলেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আমি ছিলাম এসএম হলের (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) সঙ্গে। আমি এ্যাটাচ ছিলাম, থাকতাম বাইরে। হলের সঙ্গে জড়িত। এরপরে ঐ দিনে সন্ধ্যায় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের মিটিং বসল নবাবপুর রোডে আওয়ামী লীগ অফিসে।

তা. ই. মাসুম: আপনি কি যুবলীগের সঙ্গে ছিলেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: সমর্থক ছিলাম।

তা. ই. মাসুম: কর্মী?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: না, কমিটিতে ছিলাম না।

তা. ই. মাসুম: মিটিংএ ৪/১১ ভোট হইল?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: হ্যাঁ, মিটিংএ আলোচনা হইল। এখন প্রশ্ন আসল দুইটা। কন্ট্রোভার্শিয়াল পয়েন্ট দুইটা। একটা হইল, একজন যুক্তি দিল, এই মুহূর্তে যদি ওয়ান ফোর্টি ফোর ব্রেক করি তাহলে গভর্ণমেন্ট একটা ক্লু পাবে, তারা নির্বাচন দিবে না। আমরা নির্বাচন করেই ক্ষমতায় যাব।

কিন্তু আমাদের, বিশেষ করে আমাদের যারা সাধারণ ছাত্র ছিলাম, বা আমরা যারা মনে করতাম, আমরা বিশ্বাস করতাম, বিশেষ করে প্রগতিশীল চিন্তা ধারার যারা ছিল যে, না, ভাষার দাবি বাদ দিয়া কোন কিছু হবে না। বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করেই আমরা নির্বাচনে যাব।

তখন এই দুই কন্ট্রোভার্সি হলো। এটার পক্ষে বক্তৃতা দিল আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, গোলাম মাওলা, প্রত্যেকেই বলল।

আবার বিরোধিতা করল অনেকে। কিন্ত লাস্টাবল আসল ভোটাভুটির প্রশ্ন। ভোটাভুটিতে গিয়া যারা নাকি পক্ষে বক্তৃতা দিছিল তারও কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোট দিল না। ভোট হইয়া গেল ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১১ আর ৪এ। ১১ আর ৪ কি? ১১ আর ৪ না, ১১ আর ৩।

একজন হইল তোহা সাহেব, উনি হইলেন নিউট্রল, কোনোদিকে ভোট দিলেন না। তো পক্ষে (১৪৪ ধারা না ভাঙার) পড়ল ১১ ভোট।

কিন্তু আমরা যদিও কমিটিতে ছিলাম না, আমরা কিন্তু সেখানে গেছিলাম। আমরা স্লোগান দিলাম সেখানে, আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ওয়ান ফোর্টি ফোর আমরা ব্রেক করবই। আমাদের এই এ্যাডামেন্ট এ্যাটিচ্যুড দেইখা তখন, আবুল হাশিম সাহেব প্রিজাইড করতেছিলেন। খেলাফতে রব্বানী পার্টির আবুল হাশিম, তদানিন্তন মুসলিম লীগের সেন্ট্রাল, অল বেঙ্গল মুসলিম লীগেরও তখন ছিল সে চেয়ার, সোহরাওয়ার্দীর পর।
উনি তখন ঘোষণা দিলেন, যেই মুহূর্তে ওয়ান ফোর্টি ফোর ব্রেক হবে, সেই মুহূর্তে আমাদের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বিলুপ্ত হইয়া যাবে।

আমরা কোনো অবস্থাতেই ওয়ান ফোর্টি ফোর মানব না। এবং রাত্রে একটা মিটিং বসল, মিটিং বসল নেতাদের। তার মধ্যে হাবিবুর রহমান শেলী ছিল, এম আর আখতার মুকুল ছিল, গাজীউল হক ছিল, এটি বারী এটি ছিল, মোহাম্মদ সুলতান ছিল, আনোয়ারুল হক ছিল, জিল্লুর রহমান ছিল, আব্দুল মোনেম ছিল। মিটিংএ সিদ্ধান্ত হইল যে, এখন প্রশ্ন আসল, মিটিং এ প্রিজাইড করবে কে?

এইখানে আবার একটা গোপন আলোচনা হইল। গোপন আলোচনাটা হইল, যদি কাজী গোলাম মাহবুব প্রিজাইড করে তাহলে, সে যেহেতেু, সে ছিল ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে। কাজেই সে হয়ত মিটিংটারে ঐভাবে গাইড করবে।

তখন সিদ্ধান্ত হইল, গাজীউল হক প্রিজাইড করবে।

প্রস্তাব উঠাবে কে? এম আর আখতার মুকুল।

আর সমর্থন করবে কবিরুদ্দিন শহুদ। আর সমর্থন তো কোনো ব্যাপার ন! আমরা সবাই একসাথে সমর্থন দিয়ালামু। একজন প্রস্তাব উঠাইলেই হয়।

সারারাত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চিকা (দেয়াল লিখন) মারা হইল। পোস্টারিং করা হইল ওয়ান ফোর্টি ফোর ব্রেক করার পক্ষে।

আবার আরেক দল কি করল! মাইক বাইর কইরা দিল যে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত হইছে যে, হরতাল (১৪৪ ধারা) ভংঙ্গ করা হবে না, ওয়ান ফোর্টি ফোর ভংগ করা হবে না।

কিন্তু এই বিভ্রান্তির পরেও সাধারণ ছাত্ররা, ওয়ান ফোর্টি ফোর ভঙ্গের পক্ষে ছিল।

আমাদের প্রচারণা এত শক্তিশালী ছিল যে, দোকানপাট, স্কুল কলেজ কিন্তু সবকিছু ঐদিন বন্ধ। স্কুল কলেজ তো বন্ধই, এমনকি দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্রগুলা বন্ধ কইরা দিছে পাবলিক। মানে, এই রকম একটা অবস্থার সৃষ্টি হইয়া গেছে। বিশেষ কইরা ওয়ান ফোর্টি ফোর দেওয়ার পরে এটার গুরুত্বটা আরো বাইড়া গেল।

আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে, যেটা পুরাতন বিল্ডিং ঐখানে জমায়েত হইতে লাগলাম। এবং বোধ হয় ১১টার মধ্যে, ১০ টা ১১টার মধ্যেই কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা, আমি শুধু ছাত্র বলব না। ছাত্র-জনতা ওইখানে জমায়েত হইয়া গেল।

মিটিং শুরু হইল দুপুর ১২টায়। মিটিং গাজীউল হক প্রিজাইড করল, প্রথমে বক্তৃতা দিল শামসুল হক সাহেব, আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাক। উনি হরতাল (১১৪ ধারা) না ভাঙার পক্ষে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করল। কিন্তু সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকে ওনাকে বাধা দেওয়া হইল। তার বক্তব্য শেষ করতে দিল না।
তখন আব্দুল মতিন দাঁড়াইয়া বক্তৃতা দিল, আব্দুল মতিন দাড়াইয়া বললেন, যুক্তি দেখাইলেন যে, ওয়ান ফোর্টি ফোর ব্রেক করতেই হবে। এবং সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ছাত্ররা সমর্থন দিল।

এবং গাজীউল হক ঘোষণা করলেন যে, ওয়ান ফোর্টি ফোর ব্রেক করা হবে।

ব্রেক করা হবে? কীভাবে ব্রেক করবেন? তখন আব্দুস সামাদ (আজাদ)। আব্দুস সামাদ আজাদ এরপরে আওয়ামী লীগের ফরেন মিনিস্টার হইছিলেন। আব্দুস সামাদ সাহেব প্রস্তাব দিলেন যে, আমরা ১০ জন ১০ জন করে বাইর হব। গ্রুপ কইরা, গ্রুপ কইরা। একবারে সবাই না বাইর হইয়া আমরা গ্রুপ কইরা বাইর হব ১০ জন ১০ জন কইরা।

১০ জন ১০ জন কইরা প্রথম বের হইল হাবিবুর রহমান শেলী। তারপরের গ্রুপে হইল মোহাম্মদ তোহা, আব্দুস সামাদ। তার পরে আনোয়ারুল হক, ওবায়দুল্লাহ, এইভাবে যাক।

এরপরে হইল মহিলারা। সুফিয়া ইব্রাহীম, শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা (বাচ্চু), হালিমা খাতুন, নাদেরা বেগম, ঐ সে এখন আর, তার ছেলে নাই, সে কিন্তু খুব জোরালো বক্তৃতা দিছিল। অত্যন্ত স্প্রিটেড মহিলা ছিল ঐ (নাদেরা বেগম) মহিলা। অবশ্য সে পরবর্তী পর্যায়ে বিয়ে-সাদী করে চলে গেল ওয়েস্ট পাকিস্তান। এরপর থেকেই সে আসলে ডিটাচ্ড হইয়া গেল রাজনীতির সঙ্গে।

এরপরে, যখন না-কি এক দল বাইর হয়, আর পুলিশ তাদের ধইরা নিয়া যায়। এক দল বাইর হয়, পুলিশ তাদের ধইরা নিয়া যায়।

মহিলারা যখন বাইর হইল তখন মহিলাদেরও পুলিশ টানা-টানি শুরু করল।

এই তখন জনতা খুব বিক্ষুব্ধ হয়ে গেল। জনতা বিক্ষুব্ধ হওয়ার পরে, তখন তারা একসাথে বাইর হওয়ার জন্য, একসাথে গেট থেকে বাইর হইয়া গেল।

আর পুলিশ করল কি তখন! এর পাল্টা, ভিতরে, ইউনিভার্সিটির ভিতরেই প্রথমে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল। এবং তার ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করল।

তো হাজার-হাজার ছাত্র, কাজেই তারাও তখন পুলিশরে ঢিলা-ঢিলি শুরু করল। তারাও ইয়ে করল, এবং আস্তে আসে কিন্তু ভেন্যুটা চেইঞ্জ হইয়া, কারণ আমরা তখন কী করলাম?

আমরা দেখলাম যে, এইখানে বেশ সুবিধা হবে না।

ও! এর মধ্যে আবার একটা শেল পইরা গাজীউল হক বেহুশ হয়ে গেল। পুকুর ছিল ঐখানে একটা, সেই পুকরে ঝাঁপাইয়া পড়ল অনেকে। আর আমরা তখন ইউনিভার্সিটি আর মেডিকেল কলেজের মধ্যে একটা গেট ছিল, ছোট্ট দরজা ছিল। এইটা ভাইঙা আমরা মেডিকেল কলেজের ভিতরে ঢুকে গেলাম।

আর মূলত বেলা যতই বাড়তে লাগল, কারণ তখন জগন্নাথ হল ছিল সংসদ ভবন। আমাদের বা সবার লক্ষ্য ছিল যে, আমরা ঐখানে যাব, যাওয়ার পর আমরা ওখানে যারা এমএলএ আছে তাদেরকে কনভিন্স করব, বাংলা ভাষার জন্য যেন প্রস্তাব উঠায়।ভাষা সংগ্রামী আব্দুল জলিল ভূইয়া

বিজ্ঞাপন

আমিও কিন্তু ইউনিভার্সিটির ওখান থেকে চলে গেলাম ফুলার রোডে। ফুলার রোডে চলে গেলাম! মনে করলাম ঐদিক দিয়া সুবিধা হবে যাওয়া। আমি কিন্তু ইউনিভার্সিটির গেট থেকে বাইর হইয়া ফুলার রোডে চলে গেলাম।

আমি দেখি যে, ফুলার রোডে ঔখানে পুলিশ মেশিনগান ফিট কইরা আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়া দিছে। যাতে আমরা কেউ ভিতরে ঢুকতে বা ঐখানে যেতে না পারি।

ঠিক বোধ হয় ৩টার পরে! হঠাৎ কইরা গুলির আওয়াজ হইল কয়েকটা। প্রথম ২/৩ বার, এরপরে ২/৩ বার গুলির আওয়াজ ইইল। টিয়ার গ্যাস তো আগেই নিক্ষেপ করতে ছিল।

গুলির আওয়াজ হওয়ার পরেই কিন্তু মেডিকেল কলেজের ভিতরে কান্না কাটি পড়ে গেল! চিৎকার পড়ে গেল! বেশ কয়েকজন আহত হইল, তার মধ্যে সালাহ উদ্দিন নামে একজন আহত হইছিল ঐ যে মাথার খুলি উইড়া গেছে।

এইটা আসলে পরবর্তীতে জানা গেল যে, আসলে সালাহ উদ্দিন নামে যে আহত হইছিল, এটা না, এটা হইছে রফিক উদ্দিন আহম্মদ।

রফিক উদ্দিন আহম্মদের বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জে, দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র ছিল। তার মাথার খুলি উইড়া গেছিল।

আর বরকতের গুলি পড়ল তলপেটে। তার পড়ে জব্বার, সালাম, এরকম আরো অনেক।

এবং আহত হইল অন্তত কমপক্ষে দুই’শ জন। এবং সিরিয়াসলি উইন্ডেড হইল বিশ-পঁচিশ জন। সিরিয়াসলি উইন্ডেড হইল বুলেট উইন্ডেড।

তার পরে এ্যাসেম্বলী হলের মধ্যে এই খবর পৌঁছে গেল। তারপরে, এর মধ্যে বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, উনি এ্যসেম্বলীতে না ঢুইক্যাই চলে আসছেন এইখানে। তখন এমএলএ ছিলেন উনি, কুমিল্লার ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। যিনি ’৪৮এ ভাষা আন্দোলনে ঐ যে পাকিস্তান গণ-পরিষদে যে বাংলার দাবি উঠাইছিল। উনি আসলেন, ওনার সঙ্গে আরো ছিল।

ওরা আইসা দেইখা গেল। গিয়া তখন এ্যাসেম্বলী হলে ঢুকল। এ্যসেম্বলী হাউসে ঢ্ইুক্যা, তখন তারা প্রস্তাব দিল যে, এ্যাসেম্বলী এই মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়া হউক। এবং এই যে গুলি চলল, পুলিশ যে গুলি চালাইল এইটা সন্বন্ধে আলোচনা হউক। কেন গুলি করা হইল ছাত্রদেরকে?

সেখানে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ছিল, প্রস্তাব উঠাইলেন, খয়রাত হোসেন ছিল, আলী আহম্মদ এমএলএ ছিল, তারপরে আনোয়ারা খাতুন, বসন্ত কুমার দাস, এইরকমভাবে যারা ছিল বিরোধী দলে, তারা প্রস্তাব দিল যে, আগে আমরা আলোচনা করব।

নূরুল আমীন (মুখ্যমন্ত্রী) কিন্তু ঢুকল বেশ দেরি কইর‌্যা। প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন পার্লামেন্টে ঢুকল খুব দেরি কইরা। এবং সেটা কিন্তু, এ ঘটনা ভিতরে হইল। আমরা তো আর ভিতরে যাই নাই। এই কথা পরে আমাদের বলছে যারা এমএলএ ছিল।

সে (নূরুল আমীন) প্রথমত গুলির কথা অস্বীকার করল! পরবতী পর্যায়ে বলল যে, হ্যাঁ, পুলিশ বাধ্য হইছে গুলি করতে। তবে কেউ মারা পরছে বলে আমি জানি না। মৃত্যুটা সে অস্বীকার করল।

এখন প্রশ্ন আসল, গুলি করার অর্ডারটা দিল কেডা? এই গুলি করার অর্ডার কে দিল?

তো, আমি যতদূর জানি, গুলির অর্ডার দিছিল মাসুদ বোধ হয়, মাসুদ নামে একজন এসি বা এসপি ছিল আর কেরাইশী তারাই আমার মনে হয়, আমরা সন্দেহ করি আর কি? যে, তারা ওপরে যোগাযোগ কইরাই গুলি করেছে আর কি?

২১ তারিখ থেকে ২৫-২৭ তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় কোনো এ্যাডমিনেস্ট্রেশন ছিলনা। অফিস-আদালত চলত না। মানুষ হাট-বাজার বন্ধ রাইখ্যা বাইর হইছিল। ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই স্লোগানে প্রকম্পিত ছিল ঢাকা।

এই সময় ২৩ তারিখ রাতে শহীদ মিনার নির্মাণ হল। বদরুল আলম সহ মেডিকেল কলেজে ছাত্ররা শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২৪ তারিখ উদ্বোধন করলেন মশিউর রহমান, একজন হাইকোর্টের পিয়ন, তার বাপ। পরবর্তীতে ২৪ তারিখ এমএলএ আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেব উদ্বোধন করলেন। কিন্তু ২৬ তারিখ রাতে এটা আর্মি ভেঙে দেয়। ২২ তারিখ রাত থেকে আর্মি এ্যাকশনে গেছে।

২১ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। ২২ তারিখ শহীদদের গায়েবানা জানাযা হল। শোক মিছিল হল। রিক্সা চালক আউয়ালকে হত্যা করল। ২২ তারিখও ৫০-৬০ জন আহত হল। অন্তত ৪ জন মারা গেল। লাশ গুম করে ফেলল। ২৫ তারিখ হরতাল চলল। ছাত্ররা ঘোষণা দিল স্কুল কলেজ ছাড়া হরতাল প্রত্যাহার।

তারপরে মানুষ স্বাভাবিক হতে পারে নাই।

এরপরে এ্যারেস্ট এ্যাকশন শুরু করল। মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, অজিত গুহ সহ অনেকে এ্যারেস্ট হল। এমএলএ খয়রাত হোসেন, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আহম্মদ এদের এ্যারেস্ট করল।

২৯ তারিখ নারায়ণগঞ্জের মডার্ন (মর্গান) গার্লস কলেজের মমতাজ বেগমকে এ্যারেস্ট করল। খান সাহেব ওসমান আলীর ছেলে, শামসুজ্জোহা, আরেক ছেলে, মোস্তফা মনোয়ার এদের ধরে নিয়া আসলো।

এবং মিথ্যা খবর ঘোষণা করল, চাষারাতে একজন কনেস্টাবল মাইরা ফালাইছে! এবং ঐ কনেস্টাবল এর পরিবারকে ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপুরণ দিল। আর একজন আনসার আহত হইছে, তারে দিল ২ হাজার টাকা।
এই খবরগুলো ছিল আসলে সম্পূর্ণ মিথ্যা!

আরো মিথ্যার আশ্রয় নিল তারা (সরকার), যে, এই যে আন্দোলনগুলা হইতেছে, এইটা আসলে কোনো ছাত্রদের আন্দোলন না। এইটা একটা রাজনৈতিক আন্দোলন। এটার সঙ্গে কংগ্রেস জড়িত আছে, কমিউনিস্ট পার্টি জড়িত আছে। তারাই মূলত আন্দোলনটা নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সময় ৯ জনের নামে হুলিয়া জারি হইল।

তা. ই. মাসুম: বর্তমান অবস্থা কেমন দেখছেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: দেশটা এখন খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে। কারণ এখন একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাস করতেছি। আমরা যখন ভাষা আন্দোলন করছিলাম। পরবর্তীতে এই ভাষা আন্দোলন থেকেই কিন্তু স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলন। এর মূলে হইল ভাষা আন্দোলন।

আইজও যখন আমরা শপথ গ্রহণ করি, আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাই, আমরা যে কোনো অনুষ্ঠান করি আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাই।

আমরা কিন্তু জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাই না। অবশ্য ঐটা (জাতীয় স্মৃতিসৌধ) আমাদের সর্বোচ্চ। অস্বীকার করার কোনো পথ নাই। কিন্তু তারপরেও বলব যে, হ্যাঁ, ঐ যে ভাষার মিনার এইটা হইল আমাদের মূল। ঐ মূলে থেকেই আমরা এই পর্যন্ত আসছি।

আমি বাম রাজনীতি করছি, তারপরে, আগে স্টুডেন্ট ফেডারেশন কইরা আইছি, ছাত্র ইউনিয়ন কইরা আইছি। আমি ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) করতাম। ন্যাপে’র সদস্য ছিলাম। ন্যাপ থেকে আমি পার্লামেন্টে নির্বাচন করছি, কুড়ে ঘর মার্কায়।

ভাষা সংগ্রামী আব্দুল জলিল ভূইয়া
ভাষা সংগ্রামী আব্দুল জলিল ও তার স্ত্রী

আমরা চাইছিলাম, একটা শোষণমুক্ত সমাজ, একটা সমাজতান্ত্রিক দেশ। আমরা চাইছিলাম আমাদের রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতি করা হইছিল। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালী জাতীয়তাবাদ, এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। এইটা ছিল আমাদের বেসিক। আমরা এইটারে ভিত্তি কইরা সামনের দিকে আগাইতে চাইছিলাম।

(কান্না জড়িত কন্ঠে) আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যা চাই নাই।

কারণ, সে, বঙ্গবন্ধুই এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলস্তম্ভ। এটা অস্বীকার করার পথ নাই। তাঁর সেই সাহসী ভূমিকা, তাঁর মাথা নত না করা, তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম।

হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে অন্যান্য, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ বা অন্যান্য দল ছিল। কিন্তু মূল নেতৃত্ব চইলা গেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। আমরা যে স্বাধীনতা যুদ্ধ করলাম, করলাম তো তার নামেই। স্বাধীনতা যুদ্ধ।

তা. ই. মাসুম: এখন আমাদের কী অবস্থা? এখন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া : বর্তমান অবস্থা আমি বলব, দেশে জরুরী অবস্থা চলছে, অত্যন্ত খারাপ! আমার এখন যেটা চলছে, প্রথমদিকে, যখন না-কি ১১ তারিখে (১১ই জানুয়ারী ২০০৭)। তারা প্রথমেই এই তত্ত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসল। কিছু ব্যবস্থা নিল, মানুষ তখন চরম হতাশার মধ্যে ছিল। তারা একটু আশার আলো দেখতে পাইছিল। কিন্তু এখন আমরা যেন, আশার কোনো আলো আমি দেখতেছি না। এটা আমার কথা বলছি। আশার কোনো আলো আমি দেখতেছি না।

কারণ, দ্রব্যমূল্য তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নাই!

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বহু স্লোগান দিছে, দুর্নীতি তারা নির্মূল করতে পারে নাই!

তারা স্লোগান দিছিল, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করবে, এইটা কখন হবে, কীভাবে হবে এটা অনিশ্চিত।

যে, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, জামায়াত যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের চরম বিরোধিতা করছে, আমাদের মা বোনদের ইজ্জত নষ্ট করছে, হত্যা করছে, বাড়ি-ঘর লুট করাইছে, তারা এখন বহাল তবিয়তে আছে! তাদের গা কেউ স্পর্শ করে নাই!

বহু মামলা হইছে! শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হইছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হইছে, অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে হইছে, তারা এ্যারেস্ট হইয়া গেছে। মামলা দিলে আর দেরি নাই!

কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা মামলা হইছে, কিন্তু একজনও এই পর্যন্ত এ্যারেস্ট করে নাই!
এতে আমরা মনে করতে পারি যে, এর পিছনে একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে।

এই সরকারের পেছনে, আরেকটা সরকার কাজ করতেছে, অদৃশ্য সরকার! এটা হইল আমার বিশ্বাস। আমার বিশ্বাস যে, এই সরকারের বাইরে অদৃশ্য একটা সরকার কাজ করতেছে।

যেই সরকার দেশটা কোথায় নিয়া যাবে আমি জানি না।

কারণ, একটা জিনিস আমি বিশ্বাস করি, আমার বয়স কিন্তু বর্তমানে ৮০ চলছে। আমার বর্তমান বয়স ৮০ চলছে, একটা কথা আমি বিশ্বাস করি, বাঙালী জাতি, বারবার মাইর খাইছে, কিন্তু আবার তারা জাগছে। এইখানে আমি বিশ্বাস করি, কোনো সাম্প্রদায়িকতার স্থান নাই।

বাঙালি ধর্মভীরু, রোযা-নামাজ করে, মোল্লা-মৌলবীরে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তারা রাজনীতিতে দেখতে চায় না। তাদেরকে রাজনীতির মধ্যে দেখতে চায় না। ঐ তাদের মসজিদে দেখতে চায়।

তা. ই. মাসুম: আপনি ব্যাক্তিগত জীবনে কী করেছেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আমি শিক্ষকতা করেছি, এবং শিক্ষক আন্দোলন করেছি। ফ্রম নাইন্টিন সিক্সটি টু টু নাইন্টিন নাইন্টি টু। শিক্ষকতা করতাম ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে। ওখান থেকেই অবসর নিয়েছি। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমার ওয়াইফও শিক্ষকতা করত। সে ছিল ধানমন্ডি গভর্ণমেন্ট গার্লস স্কুলের টিচার।

তা. ই. মাসুম: উনি কোথায়?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: উনি মারা গেছেন।

তা. ই. মাসুম: আপনার ছেলে-মেয়ে?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: আমার কোনো ছেলে-মেয়ে নাই। আমার বিয়ে বা সংসারের প্রতি কোনো মোহ ছিল না। আমি এর বিরোধিতা করছি।

কিন্তু, এ্যাট দ্য ওল্ড এইজ, এ্যাট দ্য এইজ অব ফিফটি ফোর, তখন আমার বন্ধু-বান্ধব কিছু ধরল যে, যাই করো একটা বিয়া-সাদী করো। বিয়ে-সাদী না করলে তোমাকে দেখবে কে? তারপরে ঐ শিক্ষিকাকে বিয়ে করছিলাম।

তা. ই. মাসুম: উনি মারা গেলেন কবে?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: ২০০০ সালে। আমার ছোট ভাই, আর ভাইস্তারা আছে, আমার চাচাতো ভাইরা আছে, তাদের নিয়া বাড়িতেই থাকি। ইদানীং ডাক্তারের কাছে যাই, আমার চোখে একটা সমস্যা আছে, ওটা অপারেশন করার পরে ভাল হবে।

তা. ই. মাসুম: আপনার এই অভিজ্ঞতা লিখেছেন?
আব্দুল জলিল ভূইয়া: কিছু লিখছি আরকি, ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখছি। তারপর সমাজ ব্যবস্থার ওপর লিখছি। আমি তো রাজনীতি করতে গিয়া আর কিছুই করা হয় নাই। আমি ফিল্ডের কর্মী ছিলাম, মাঠের কর্মী যারে বলে। আমি নেতৃত্ব দিছি, কিন্তু পদের প্রতি কোনো মোহ ছিল না। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি।

চলবে…