চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমার বন্ধু রাসেল!

এত যে বিষাদ চারিধারে আজ ! উত্তুরে হাওয়া হাহাকার করছে কান্না হয়ে। অথচ আজকের দিনটি তো এমন হবার কথা ছিল না…ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আজ যে দেবশিশুর আগমন হয়েছিল তার জন্মোৎবের আলোক ছটা মেঘে মেঘে ভেসে বেড়াবার কথা ছিল। কথা ছিল তেতুলিয়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিয়ে যাওয়ার। কীভাবে করব আমরা আজকের দিনকে বরণ ।

বিজ্ঞাপন

জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাসের কলংকজনক হত্যাকান্ডের নির্মম শিকার সেই দেবশিশুর হত্যাকারী আমরা নিজেরাই। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর দিনটি চিরদিনের জন্য বিষাদ ভরা হয়ে রইল। আর কোন দিন প্রত্যুষে হাসবে না সূর্য । রাত জাগা পাখির ডানায় করে বিষাদ মাখা ভোর আসে প্রতি বছর।
দেবশিশুর আজ ৫৪ তম জন্মদিন। কিন্তু কোথাও কোন আলো নেই। সে সময় কতইবা বয়স ছিল তার? ১০ বছর । অথচ ঘাতকের বুক একটি বারের জন্যেও কাঁপল না।

পঁচাত্তরে ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে শিশু রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে।

শেখ রাসেল বারবার মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল। আকুতি করেছিল, আমি মায়ের কাছে যাব । তার কান্নায় পাথর হয়তো গলে যায়। কিন্তু তাতে ঘাতকের নিষ্ঠুর মন গলেনি। তাদেরই একজন মায়ের কাছে চল বলে দোতলায় নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে। টেনে হিচড়ে উপড়ে নেয়ার সময় রাসেল ভয় পেয়ে বলেছিল, আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন।

চিরতরে হারিয়ে গেল হাসু আপার কলিজার টুকরো । মা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নাড়ি ছেড়া ধন। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা দুজনেই ছিলেন বার্টান্ড রাসেলের ভক্ত। তার মানেই রেখেছিলেন ছোট্ট রাসেলের নাম। রাসেলের জন্মের সময় বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন। যার কারণে শিশু রাসেল বাবাকে ভালোভাবে চিনত না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিকথায় রয়েছে, জেলখানায় পরিবারের সবাই বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছেন। রাসেল এক পর্যায়ে বলে উঠল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি? এমন প্রশ্নে সে সময়ের উপস্থিত সবাইকে হতবাক হতে হয়েছিল। আর আজও রাসেলের এমন প্রশ্নে আমরা হতচকিয়ে যাই এবং বেদনাহত হই। এমন ঘটনা আরও আছে।

বিজ্ঞাপন

২ বছরের শিশু রাসেল জেলখানায় গিয়ে একদিন বঙ্গবন্ধুকে বলল, ‘আব্বা বালি চল।’ … সেই দেবশিশু রেহাই পেল না ।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনের যে রাস্তায় রাসেল সাইকেলে ঘুরে বেড়াত সেই রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে আমি বহুবার ভেবেছি রাসেল এর কথা। রাস্তাটাকে বহু লোকের সমাগমেও আমার কাছে নিঃসঙ্গ লাগে। রাস্তার দুপাশের গাছগুলো আজ নিশ্চয়ই সারাদিন অপেক্ষা করেছে রাসেলের জন্য।

ছোট রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। পাড়ার আর দশজন সাধারণ ছেলের মতই সে স্কুলে আসত । ছোট ছেলেটি যেন বাবা মা আর বড় ভাই-বোনদের অনুসরণ করছে। কলাভবন থেকে বাসায় ফেরার পথে রাসেল এর স্কুলের সামনে মাঝে মাঝে দাঁড়াই। মনে মনে উত্তর খুঁজে পাবার চেষ্টা করি। কীভাবে সম্ভব একটি শিশুর শৈশব লুন্ঠন করা?

আমাদের রাসেলের তাই ৫৪ তম জন্মদিনেও বয়স বাড়ে না। আমাদের আদরের রাসেলের বয়স ১০ বছরে আটকে গেল। একটি শৈশব লুণ্ঠনের কী শাস্তি হতে পারে ? আমি ভেবে পাই না। আমি পরিমাপ করতে পারি না সেই শাস্তির ওজন! আমি কোন দাঁড়িপাল্লায় মাপতে পারি না ঘাতকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আমার চোখের বিচ্ছুরিত ঘৃণাকে।

ক্ষমতালোভী ঘাতকেরা চাপা দিতে চেয়েছিল যে আলোকরশ্মি তাতে তারা সক্ষম হয়নি। ১৯৯৬ সালে বহুবছর অমাবস্যায় ঢাকা চাঁদ আবার কিরণ ফিরে পেয়েছে জননেত্রি শেখ হাসিনার নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে।

১৯৯৬ সালে আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম। আমাদের ঘরের দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর বিশাল একটা ছবি ছিল। আমার বাবার মুখে ইতিহাস শুনতে শুনতে আমার বড় হওয়া । বাবার মুখে শুনেছি ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রাতের কাহিনী । বাবার সাথে শুনেছি প্রতি ১৫ আগস্টে, যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই…। ১৯৯৬ সালে আমার বয়স ছিল ১০ বছর। বাবার কোলে বসে শুনেছি শেখ রাসেল কে নির্মম ভাবে হত্যা করার কাহিনী । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি । ১০ বছরের শান্তা মনে মনে রাসেলকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বন্ধুর হাত। মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেবেছে, মায়ের কাছে রাসেলকে যেতে না দেয়ার বেদনা। খেলতে গিয়ে পরে গিয়ে হাত কেটে যাওয়ার পর ভেবেছে, যখন ঘাতকের বুলেট রাসেলের বুকটাকে ভেদ করে বেরিয়ে গেছে তখন কতখানি বেদনার কুকড়ে গেছে দেব শিশুর মুখটা…

আমার বাবার নাম মোঃ তৌহিদুজ্জামান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। আমার বাবা তার নামের সাথে মিলিয়ে আমার নাম রেখেছিলেন তাওহিদা। বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি করতেন। বাবার মুখে শুনেছি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ আর শেখ মুজিবের কথা । আমার বাবার নেতা শেখ মুজিব কবে কোনদিন আমার নেতা মুজিব হয়ে উঠেছেন আমি জানি না। আমার খুব গর্ব হয় আমার বাবাকে নিয়ে । মাঝে মাঝে ভাবি আজ যদি শেখ রাসেল বেঁচে থাকত সেও নিশ্চয়ই তার বাবা শেখ মুজিবকে নিয়ে আমার মত গর্ব করত !
আমার বন্ধু রাসেলের চোখে আমি তাকাতে পারি না। মাঝে মাঝে আমার নিজেকে খুব অপরাধী লাগে। আমার বন্ধু রাসেল কি কোনদিন ক্ষমা করবে আমাদের?

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)