চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমার অভিজ্ঞতায় মাদক

প্রায় ১৩ বছর ধরে ঢাকায় আছি। যে বয়সে বাবা-মা সন্তানকে স্কুলে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে সেই বয়স থেকে পরিবারের বাইরে আমি। মেস, হোস্টেল, ফ্ল্যাট বাসা করে ঢাকার বুকে কাটিয়ে দিলাম তের বছর।  এই তের বছরে প্রচুর মানুষকে ক্লাসমেট, রুমমেট, ফ্ল্যাটমেট, ক্লাস ও কর্মক্ষেত্রে জুনিয়র, সিনিয়র হিসেবে পেয়েছি। যাদের সবাই প্রায় আমার সমবয়সী, তরুণ।

বিজ্ঞাপন

এই তালিকায় আছে সচিব, শিক্ষক, আমলা, রাজনীতিবিদ, ধনী, দরিদ্র পিতার সন্তানেরা। শহরে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি গ্রামে বেড়ে ওঠারাও আছে বন্ধু তালিকায়। ছাত্র, বেকার, কর্মজীবী, কবি, কেরানি, সাংস্কৃতি কর্মীসহ প্রায় সব শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করেছি।

ফলত ঢাকায় বসবাসরত তরুণ সমাজের উপর চাক্ষুষ গবেষণা হয়ে গেছে বলা চলে।  তারই প্রেক্ষাপটে আজ কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।

এক.
যে গল্পটি আমি পাঁচমাস আগে লিখবো বলে ঠিক করেছিলাম সেই গল্পই সবার আগে বলতে ইচ্ছা করছে।  গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এক বন্ধুর নিমন্ত্রণে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। অতিথি পাখি নিয়ে বন্ধু ডকুমেন্টরি বানাবে। আমি সাথে থাকলে ওরা আনন্দ নিয়ে কাজ করতে পারবে এই আশায় ডেকেছিল। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বরাবরই আমার কাছে লোভনীয় দর্শনস্থান। সেটা যদি হয় শীতের আগমনকালে তাহলে তো কথাই নেই।  ভোরবেলা লাখো পাখির কিচির মিচিরে কী এক মুগ্ধতা বিরাজ করে।! সময় বের করে চললাম জাহাঙ্গীর নগর। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টহাউজে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নই এমন আটজনের সমন্বয়ে গড়া আমাদের দল। জাবির এক বড় ভাইয়ের আতিথিয়েতায় হৈ-হুল্লোড় করতে করতে সবাই জাবিতে ঢুকলাম। আমি শুধু আমার বন্ধুকেই ভালো করে চিনতাম। ও আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সবাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র ভাই ব্রাদার। পরিচয় পর্বে একটা মুখ হাসি দিয়েই হৃদয় জয় করে নিলো। গ্রুপের সবার চেয়ে ছোট ছেলেটির মাথা ভর্তি লাউডগার মতো এলোমেলো চুল, গালভরা হাসি আর সরলতা। দেখলে যে কারই ভালো লাগবে। বটতলা খেয়ে গেস্টহাউজে উঠলাম। হৈচৈ করলাম গভীর রাত পর্যন্ত। সূর্য ওঠার অনেক আগে আমাদের শুটিং শুরুর কথা। বন্ধু সবাইকে দ্রুত ঘুমানোর তাগাদা দিল। আমরা ঘুমিয়েও গেলাম। কিন্তু আমাদের টিমের সেই মিষ্টি হাসির ছোট্ট ছেলেটি ঘুমালো না। সারারাত লাইট নেভানো ঘরে মোবাইল মুখের সামনে নিয়ে জেগে রইলো। এবং ভোরবেলা যথেষ্ট ‘এনার্জি’ নিয়ে আমাদের ডেকে তুলল। কাজেও দেখলাম চনমনে।
ছেলেটার এত এনার্জি দেখে আমার সন্দেহ হলো। সকালের নাস্তার ফাঁকে আলাদা ডেকে নিলাম। একটু বেশি গল্প করলাম ওরসাথে। হালকা রসিকতা করলাম। এরপর বললাম, তোমার গল্প বলো। জীবনের গল্প। ছেলেটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। তার জীবন বলে কিছু নেই।  গল্প বলে কিছু নেই। সবই এখন নেশা। ইয়াবার নেশা।
গত রাতেও সে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ইয়াবা খেয়ে বের হয়েছে।  সপ্তাহের বেশিরভাগ রাত সে নেশা করে এবং  জেগে থাকে। ক্লাস করে না।  ক্লাস করতে পারে না।  আগ্রহ করে একবার ইয়াবা সেবন করেছিল। এখন আর এ থেকে বের হতে পারছে না।

দুই.
তখন মিরপুর ক্যাম্পাসে পড়তাম। গ্রিনরোড থেকে মিরপুর ক্লাস করতে অসুবিধা হতো। মিরপুরে একটা মেসে উঠলাম। মেস বলতে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মেস করে থাকা।  ড্রইং স্পেস গ্লাস দিয়ে ঘিরে রুম বানানো। সেই রুমে আমার সিট। সন্ধ্যায় রুম থেকে বের হয়েছি ব্যালকনিতে যাব। মিষ্টি পরিচিত একটা গন্ধ নাকে এলো। পুরোপুরি পরিচিতও না। গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখি একটা রুমে আমাদেরই ভার্সিটির কয়েকজন বড় ভাই গোল হয়ে বসে আছেন। তাদের হাতে সিগারেট। একজন মুখের সামনে নিয়ে সিগারেটে বিশাল টান দিয়ে আরেকজনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন।  তাদের সিগারেট থেকে মিষ্টি মিষ্টি পাতা পোড়া গন্ধ আসছে।  তাদের গোল বৈঠকে ভার্সিটি পড়ুয়া আপুদেরও যোগ দিতে দেখেছি মাঝে মাঝে। 
তিন.
নামি দামি এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সেন্টমার্টিন ট্যুরে যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক টিচারের গেস্ট হিসেবে।  আমাদের বাসের প্রথম চার পাঁচটা সিট শিক্ষক ও গেস্টদের। পেছনের সিটগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের। তারা ঢোল তবলা নিয়ে গান গাইছে।  মহাসড়কে দুরন্ত গতিতে বাস চলছে। হঠাত কোনো এক ঝামেলার কারণে বাস থামাতে হলো। বাস থামাতেই পেছন দিক থেকে পাতা পোড়া সেই গন্ধ এসে নাকে লাগলো। দুজন শিক্ষিকাকে দেখলাম ওড়না দিয়ে নাক ঢাকতে। এই ট্যুরের বিশেষ আয়োজন ছিল, সেন্টমার্টিন গিয়ে অল্পদামে কেনা মিয়ানমারের ‘রাম’ ও ‘বাবার’ অঢেল যোগান। যেমন খুশি তেমন সাজো স্টাইলে যেমন খুশি তেমন খাও।

চার.
মতিন ও রাকিব (ছদ্মনাম) দুই বন্ধু।  হঠাত করে তাদের সাথে আমার খুব ভাব জমে গেল।  আমরা দুই থেকে তিন বন্ধু হয়ে গেলাম। একসাথে সিনেমা দেখি, আড্ডা দেই, রান্না করি।  আমরা একসাথের সময়টা খুব উপভোগ্য হয়। এরই মধ্যে লক্ষ করলাম রাকিব মতিনের সাথে আগের মতো মিশছে না।  কেমন এড়িয়ে চলছে। আলাদা করে রাকিবকে জিজ্ঞেস করলাম। কেন সে মতিনকে এড়িয়ে চলছে।  রাকিব যা বলল আমার তাতে শক খাওয়ার দশা।
মতিন মাদকাসক্ত। সে রাকিবকে প্ররোচিত করে মাদক নেওয়ার জন্য। এবং মতিন সুযোগ পেলে আমাকে নিয়েও একদিন নেশা করবে বলে প্ল্যান করছে। মতিন কী ধরণের নেশা করে জানতে চাইলে রাকিব বলল- গাঁজা, ভাং, কেরু, ইয়াবাসহ প্রায় সব ধরণের মাদকে অভ্যস্ত মতিন।

পাঁচ.
কয়েক বছর আগের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির জন্য মফস্বল থেকে মেধাবী দুই খালাতো ভাই আমাদের ফ্ল্যাটের এক রুমে উঠলো। ঢাকা পা দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাধীন জীবন ‘উপভোগ’ করলো সিগারেট ধরে। তারপর শুরু হয় ধানমণ্ডি এলাকার বারগুলো যাতায়াত।  নতুন কিছু বন্ধুও জুটে যায় তাদের।  বাসা ভাড়া না দিয়ে সে টাকায় নেশা করতো। কয়েকমাস বাসা ভাড়া বাকি পড়ায় মেস ম্যানেজার তাদের বাবা-মাকে ডেকে বাকি টাকা দিয়ে তাদের গ্রামে নিয়ে যেতে বলে।  পরে শুনেছি গ্রামে নিয়ে গেলে আত্মহত্যা করবে, এমন হুমকি দিয়ে একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয় দুই খালাতো ভাই। এবং অর্ধশিক্ষিত বাবা-মাকে ঠকিয়ে টিউশন ফি বাবদ বেশি টাকা এনে সেই টাকায় চলছে তাদের মাদক সেবন। 

বিজ্ঞাপন

ছয়.
অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বের হয়ে টিএসসিতে আড্ডা দিচ্ছি। বাসায় ফিরবো। এক বন্ধু বলল, দোস্ত চল একটু পলাশী যেতে হবে। ওর হাবভাব দেখে মনে হলো খুব জরুরি কিছু। বন্ধুর ইমার্জেন্সি আর আমি তাকে প্রশ্ন করছি বিষয়টা ভালো দেখায় না ভেবে কোনো প্রশ্ন করলাম না। বাইক নিয়ে গেলাম পলাশী। পলাশী মোড় পার হয়ে বাইক থেকে নেমে রিকশাওয়ালাদের সাথে ফিসফাস করে কিছু কথা বলল সে।  তারপর কিছু একটা পকেটে গুঁজে এসে বাইকে উঠলো। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না এই বন্ধুর ইমার্জেন্সি কী ছিল।

ছয়টা ঘটনা বলেছি। তারমানে এই না যে শুধু ছয়টা ঘটনাই আমার সাথে ঘটেছে। প্রতিদিন প্রতিটি পদক্ষেপে চলতে ফিরতে এমন অসংখ্য মাদকসেবীর মুখোমুখি হয়েছি।

এমন মাদকসেবীদের দেখেছি যারা বাড়ি থেকে আনা টাকা কিংবা বেতনের টাকা মাসের প্রথম সপ্তাহেই শেষ করে ফেলে। বাকিমাস চলে ধার-দেনায়।  পরিচিতি, কম পরিচিত এমনকি অপরিচিতদের কাছেও ধার চাইতে তাদের দ্বিধা কাজ করে না। তারপর পালিয়ে বেড়ায় সবার থেকে। এই মাসেও আমার কাছে ‘চারশো’ টাকা ধার চেয়েছে তিন চারজন পরিচিত-কমপরিচিত। যারা আগের ধার করা টাকাই ফেরত দেয়নি। নতুন করে ধারা চাইলে ‘টাকা নেই’ বলা ছাড়া কিছু করার থাকে না।

ঢাকায় অবস্থানকালে আমি এমন যায়গা পাইনি যেখানে মাদকের বিস্তার নেই। নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত।  সব বিত্তের কেন্দ্রবিন্দুই নেশা।

নেশাকারীদের আরেকটা বিষয় আমার চোখে লেগেছে। সে যে নেশা করে সেটাকে নেশা মনে করে না। বাকিসব নেশাকেই নেশা মনে করে এবং অপছন্দ করে।  একজন ধূমপায়ী ধূমপানকে নেশা মনে করে না, তবে গাঁজাকে সে খুব অপছন্দ করে। গাঁজাখোর ইয়াবাসেবীকে অপছন্দ করে। ইয়াবাসেবী মদখোরকে অপছন্দ করে। নেশাকে প্রায় সবাই খারাপ মনে করে; শুধু সে যে নেশা করে সেটা বাদে।অথচ প্রায় সব নেশাখোরের নেশা জীবন শুরু হয় ‘সিগারেট’ দিয়ে।

আমি যতগুলো মাদকসেবীর সঙ্গে কথা বলেছি তাদের কারও ভেতর জীবন নিয়ে উচ্চাশা দেখিনি।  পাইনি জীবন নিয়ে ভাবনা ও স্বপ্ন। আমাদের এই স্বপ্ন, কর্ম ও উচ্চাশাবিমুখ প্রজন্ম বিশ বছর পর দেশের হাল ধরবে। সময়ের নিয়মে ধরতে বাধ্য হবে। তখন কী হবে দেশের? কী হবে সমাজের?

সারাদেশে চলছে মাদক বিরোধী অভিযান।  এখন পর্যন্ত এ অভিযানে আইন শৃঙ্খলা বাহীনির হাতে নিহত হয়েছে ৮০ জন মাদক ব্যবসায়ী।  জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক।

দুই চার’শ মাদক ব্যবসায়ীকে হত্যা করাই সমাধান নয়। সমস্যা যেহেতু দীর্ঘমেয়াদী। সাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী। মাদকের উৎস ও ব্যবসায়ীদের নির্মূলের পাশাপাশি নিবৃত্ত করতে হবে মাদকের চাহিদা।  কেননা চাহিদা থাকলে মাদক ব্যবসায়ী জন্ম নিতে সময় লাগবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)