চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমরা যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিলাম

গত বছরের পহেলা জুলাই গুলশান এলাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের হামলা এবং একই বছরে ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশে সবচেয়ে বড়ো ঈদ জামাতে জঙ্গী হামলা চেষ্টার পর গণমাধ্যমে উঠে আসে সারাদেশে জঙ্গীবাদের বিস্তারের ভয়াবহ নানা তথ্য। এ হামলাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের পারিবারিক সামাজিক যেসব তথ্য আমরা জানতে পেরেছিলাম, তাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা গণমাধ্যমে আমাদের বিস্ময় আশঙ্কা প্রকাশ করেছি।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাগুলোর পরপরই জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের নানা ধরনের ভিডিও বার্তা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তাদের বক্তব্য শুনেই পরিষ্কার হয়েছিলো কী ভয়াবহ অমানবিক বিভ্রান্তির জালে তারা আটকা পড়ে আছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গীবাদ দমনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানগুলোতে আটক বা নিহতদের পরিচয় প্রকাশের পরও আমরা দেখেছি, এদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। এগুলো নিয়ে নানাবিধ লেখা হয়েছে। সামাজিক সমস্যা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বা পারিবারিক সমস্যার নানাদিক নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো আমাদের মাঝে উত্থাপিত হয়েছিলো, তার সঠিক সুরাহা সম্ভবত এখনও হয়নি।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, জঙ্গীবাদের ভয়াবহ বিভৎস রূপের মাত্র একটি দিক আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। যতোই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে ধৃত ও সন্ত্রাসী কাজে নিহত জঙ্গীদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয়, তাদের বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বিচরণের খতিয়ান প্রকাশিত হচ্ছে, ততোই স্পষ্ট হচ্ছে যে, দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা এই ভুল পথে গিয়েছে। আর সেই প্রক্রিয়াগুলো তৈরি করেছে একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দল, জামায়াতে ইসলাম ও তাদের ভাবাদর্শীরা।

জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তরুণদের মগজ ধোলাই করেছে ধর্মের অপব্যাখ্যা বা বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে। তাদের দলে টেনেছে জিহাদের কথা বলে। আইএসে যোগদানের জন্যে পালিয়ে যাওয়া তরুণদের অতীত জীবন লক্ষ্য করলে বোঝা যায় মগজ ধোলাইয়ের মাত্রাটি কেমন ছিলো। এই মগজ ধোলাইয়ের শুরু আজকে থেকে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও দেখেছি জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী কীভাবে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের মগজ ধোলাই করে তাদের রাজনৈতিক কূট-আদর্শ বাস্তবায়ন করেছে।

কিন্তু এ হলো একটি প্রক্রিয়া। মনে রাখা প্রয়োজন, এই জঙ্গীবাদী অপগোষ্ঠীগুলোর একটি নির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে এবং সেই দর্শনের বিষই তারা ছড়িয়ে চলেছে বছরের পর বছর। আফগানিস্তান ফেরৎ মোল্লারা কথায় কথায় তাদের জিহাদি জোশের বর্ণনা দিয়েছে, সেগুলো নিয়ে ওয়াজের অডিও এমনকি বই পর্যন্ত বেরিয়েছে। সবখানেই ইসলামের জিহাদকে তারা কাজে লাগিয়েছে সুকৌশলে। আইএসে যোগ দিতে পরিবার ছেড়ে পালায়, তাদের পূর্বরূপই ছিলো আফগান যুদ্ধে যোগ দিতে যাওয়া জিহাদিরা। এইসব জিহাদ-সন্ত্রাসীরাই মগজে বিষ সঞ্চালনের দায়িত্বটি পালন করে আসছে এতোকাল।

ধর্মকে বর্ম বানানো দর্শনের ভিত্তিতেই সাতচল্লিশে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানানো হয়েছে। ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, তৎকালীন অনেক প্রগতিশীলরাও এই পাকিস্তানের পক্ষে জিকির তুলেছিলো। মুক্তিযুদ্ধ ছিলো সেই ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক দর্শনকে পরাজিত করার সবচেয়ে বড়ো জনযুদ্ধ। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করেছে বাঙলার মানুষ। কিন্তু সে বিজয় আমরা ধরে রাখতে পারিনি। পঁচাত্তরের পর আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোতে একাত্তরের পরাজিত শক্তি ফিরে আসে এবং আবারও বাঙলাদেশে পাকিস্তানিকরণ চলতে থাকে।

দুই
আগেই বলেছি, সাম্প্রদায়িক অপ-দর্শনের বিষ ছড়িয়ে দেবার যে রাস্তা মৌলবাদীরা গ্রহণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই, তার মাত্রা একটি নয়। ধরনও বিভিন্ন। ধর্মকে তারা ব্যবহার করে মাত্র, তাদের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসা। বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমানদের জঙ্গীবাদী অপকর্মগুলোতে যখন আক্রান্ত ছিলো বাঙলাদেশ, তখন বিএনপি-জামাতের নেতারা এদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে।

আইনের মাধ্যমে যখন এদের শাস্তির বিধান কার্যকর হলো, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলাম জঙ্গীবাদ বুঝি দমন হলো। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। জঙ্গীবাদ হলো সাম্প্রদায়িক দর্শনের চূড়ান্ত প্রকাশ।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রদায়িক দর্শন সমাজে বিস্তার লাভ করে কয়েকটি পর্যায়ে। তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যায়টি হলো শিক্ষা। আর শিক্ষার ক্ষেত্রে যে কোনো রাজনৈতিক কূট-কৌশল বাস্তবায়নের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকীকরণ। কারণ পাঠ্যপুস্তকগুলো রাষ্ট্রের উদ্যোগেই সম্পাদিত হয় এবং ছাপা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে এটি বিলি বণ্টনও হয় বিনামূল্যে। বছরের প্রথম দিনেই ‘বই উৎসব’ যে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিলো, তার অনেকটাই এবার ম্লান হয়ে গেছে। কারণ পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ আর বৈষম্য মানসিকতা সৃষ্টির উপাদান ভয়ানকভাবে বিরাজমান। অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানো হচ্ছে শিশুদের মধ্যে। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ, কেননা এই বইগুলো যাচ্ছে সারাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষার্থীদের কাছে। এছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়েও উন্নত জীবনবোধের রচনাগুলো বাদ দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত আমরা মোনে করতে পারি, ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছিলো, যার সভাপতি ছিলো তৎকালীন শিক্ষা সচিব। ১৯৯৬ সালে তারা মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্যে একটি পাঠ্যক্রম হাজির করে, যেখানে সবার জন্য ‘ধর্ম’, ছেলেদের জন্য ‘কৃষি বিজ্ঞান’ ও মেয়েদের জন্য ‘গার্হস্থ্য অর্থনীতি’ বাধ্যতামূলক করা হয়। এর আগে এ বিষয়গুলো ছিলো ঐচ্ছিক। সে সময় ঐ পাঠ্যক্রমের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ফলে এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্যে ‘উচ্চতর গণিত’ ও ‘জীববিজ্ঞান’ ঐচ্ছিক বিষয় হিশেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এই সর্বনাশটিকে তখন কতোটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো আমার জানা নেই। তবে সর্বনাশের বাড় বেড়েছে দিনে দিনে। একের পর এক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে, কিন্তু কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

সর্বশেষ পাঠ্যপুস্তকে যে সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হলো, তা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, আমাদের ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার। যদিও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু মগজের কোষে কোষে যে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আগের পাঠ্যপুস্তকগুলো অনুমোদন এবং ছাপানো শেষে বিতরণ পর্যন্ত করা হলো, তার পরিমার্জন কে করবে?

তিন
আগের কথায় ফেরৎ আসি। দেশে একের পর জঙ্গী-সন্ত্রাসের পর আমরা অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি যে, এইসব তরুণরা কেনো এই নষ্ট পথে পা বাড়ালো। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এক হাত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই জঙ্গী সন্ত্রাসীদের বয়স যদি বিবেচনা করা হয় এবং তাদের শৈশবের পাঠ্যপুস্তকে ফেরৎ গেলে আমরা দেখতে পাবো সেই পাঠ্যপুস্তকগুলো ছিলো ইতিহাস বিকৃতি যুগের পাঠ্যপুস্তক। আমি বলছি না, সেগুলো যারা পড়েছেন, সকলেই বিভ্রান্ত হবেন বা হতে পারেন।কিন্তু এ কথা তো মানতেই হবে যে, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলের এইসব পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতির যে জঘন্য কর্মকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তাতে আমাদের প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে রাজনীতি বিএনপি’র মিথ্যাচার থেকে সৃষ্টি, যেমন এখন তারা মুক্তিযুদ্ধের শহিদের সংখ্যা নিয়ে রাজনীতি করে। এই মিথ্যাচারকে তারা পাঠ্যপুস্তকে ঠেসে দিয়েছে আবর্জনার মতো এবং একটি বড়ো অংশের শিশুদের মানসিক গঠনে ফেলেছে নেতিবাচক প্রভাব।

আজকের যে পাঠ্যপুস্তকগুলো শিশুদের হাতে গিয়েছে, সে কিন্তু এটাও জানে যে, কেনো রবীন্দ্রনাথের কবিতা বাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তার মনোজগতে ধর্মীয় বিভেদের ষড়যন্ত্রটি গেঁথে দেয়া হলো। আর এইসব বিকৃত ইতিহাস আর সাম্প্রদায়িক তথ্যে ঠাসা পাঠ্যপুস্তকগুলো নিয়ে আলোচনা হলেই মৌলবাদী দলগুলো তাদের ধর্মের বাতাসে নড়া কল আবার নাড়াতে থাকে। এবেলাও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

জামায়াতাশ্রয়ী হেফাজতে ইসলাম ও চরমোনাইয়ের পীরের গদগদ ধন্যবাদই প্রমাণ করে, সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর যে সুদূরপ্রসারী কূটকৌশলের ছক তারা তৈরি করছিলো, তাতে তারা সফল। সুতরাং এই শিশুরা যখন বড়ো হবে, যখন তারা উচ্চশিক্ষার জন্যে প্রবেশ করবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন তাদের কাছে ‘মানুষ’, ‘মানবতা’ শব্দগুলো কোনো অর্থ বহন করবে না। কারণ তাদের শেখানো হয়েছে ‘হিন্দু’ ‘মুসলমান’। সাম্প্রদায়িক বিভেদ এদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হচ্ছে, সুতরাং তার কাছে মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর জিহাদের দাওয়াত দেয়াটা আরও সহজ হবে। তার মনোজগতে আধিপত্য স্থাপন করছে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় উন্মাদনা।

সুতরাং তার কাছ থেকে কোনো মানবিক সিদ্ধান্ত আশা করা সম্ভব হবে না। যে বৃক্ষের শিকড়ে পোকা ধরে, সে বৃক্ষ কোনোদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। একটি সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির পোকায় খাওয়া শৈশব নিয়ে সে বেড়ে উঠছে। এই পুঁজভর্তি পাঠ্যপুস্তকগুলো পড়ে বড়ো হওয়া এই শিশুগুলোর মধ্যে কতোজন নিবরাসকে ভবিষ্যতে দেখতে হবে আমাদের? একাত্তরের পরাজিত শক্তি আজকে পাঠ্যপুস্তকেও মৌলবাদী চাপাতি চালিয়েছে। আমাদের হয় এর প্রতিবিধান করতে হবে, না হয় আরও ভয়ানক ভবিষ্যতের জন্যে ধুঁকে ধুঁকে অপেক্ষা করতে হবে।

আর কতো খেসারত দিলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে বোঝানো যাবে মৌলবাদ তোষণনীতি দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যেতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তবায়ন করা যায় না। হেফাজত-জামাত-চরমোনাইরা যখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে উচ্চস্বরে ধন্যবাদ দেয়, তখন বুঝতে পারি, সরকারেরও ছাগলের মতো গাছে উঠে আম খাওয়ার সময় চলে এসেছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)