চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আপন আলোয় জ্বললে তারা…

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শুরু আজ

কয়েকঘণ্টা পরেই বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেমে পড়বে বাংলাদেশ। নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলার জন্য শক্তিশালী দল সাজিয়েছে টাইগাররা। নেতৃত্বে যথারীতি মাশরাফী, ডেপুটি সাকিব আল হাসান। ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস আসরে তামিম-মুশফিকদের প্রথম প্রতিপক্ষ সাউথ আফ্রিকা। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে গড়া স্কোয়াড, কেমন করবে বাংলাদেশ? ইতিহাস বলে সামর্থ্য ঢেলে দিতে পারলে, খেলোয়াড়রা আপন আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারলে, মিলতে পারে জয়!

চার বছর বাদে আরেকটি বিশ্বকাপ। গত আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ। পরের সময়ে আছে স্মরণীয় অনেক সাফল্য। নিধাস ট্রফির ফাইনাল, এশিয়া কাপের ফাইনাল, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা মিলেছে। বেশকিছু দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়সহ জায়ান্ট প্রতিপক্ষদের মাঝেমধ্যেই হারানোর সুখস্মৃতিও সঙ্গী। সদ্য টাটকা স্মৃতি, আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের মঞ্চ যদিও সেসব থেকে ভিন্ন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধ কন্ডিশনে বড় পরীক্ষাই দিতে হবে মাশরাফী-তামিমদের। প্রত্যাশার পারদও থাকবে আকাশচুম্বী। বলতে গেলে নিজেদের ইতিহাসে সেরা বিশ্বকাপ দল নিয়েই ইংল্যান্ডে গেছে বাংলাদেশ। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে নিজেদের দিনে যেকোনো প্রতিপক্ষকেই প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ফেলার মতো এক দল।

যে দলের নেতা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন যাদের কাঁধে, সেই দলটির কাণ্ডারি। চতুর্থবার বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দলের বদলে যাওয়ার শুরু। বলে গেছেন, নিজের শেষ বিশ্বকাপ এটি। ৩৫ পেরিয়ে যাওয়া মহাতারকার মঞ্চ রাঙানোর সুযোগ থাকছে বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষ ধাপটায়।

এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সাফল্যসহ বহু সাফল্যে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একটা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার আক্ষেপ ছিল। সেটা দুসপ্তাহ আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে উইন্ডিজকে হারিয়ে ছোঁয়া গেছে। বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো শিরোপা। দলের পেস আক্রমণের মূল দায়িত্বটাও সামলাতে হবে তাকেই। ২০৯ ওয়ানডে আর দেড়যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছাপ ফেলে চলার অভিজ্ঞতা সঙ্গী। প্রায় দুহাজার রান ও ওয়ানডেতে দেশের সর্বাধিক উইকেট (২৬৫টি) মাশরাফীর নামের পাশে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি শেষের ঝলক দেখাতে পারলে দারুণকিছুই মিলবে লাল-সবুজদের।

মাশরাফীর তুরুপের অন্যতম সেরা তাস তামিম ইকবাল। যেকোনো সাফল্যগাঁথা লেখা সহজ হয়ে যায় যদি শুরুটা ভালো হয়। শুরুতে দ্রুতগতিতে রান তোলার পাশাপাশি লম্বা ইনিংস খেলে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা আছে তামিমের। ৩০ বছর বয়সী বাঁহাতি ব্যাটসম্যানেরও চতুর্থ বিশ্বকাপ এটি।

গত তিন-চার বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট যে অনেকটা বদলে গেল, তাতে তামিমের অবদান অনেক। তিনি নিজেও অনেকটা বদলেছেন সময়টাতে। ক্রিজে এসেই ঝটপট কিছু রান তুলে আর সাজঘরে ফেরেন না, ইনিংস বড় করার পাশাপাশি ধারাবাহিকতার অনন্য এক নজির স্থাপন করে চলেছেন। ১৯৩ ওয়ানডে নামের পাশে, প্রায় ৬ হাজার রান। ছত্রিশের ওপর গড়ে ১১ সেঞ্চুরি আর ৪৪ ফিফটি বলে দেয় টাইগারদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন কতটা ডানা মেলতে পারে চেনারূপের তামিমকে পাওয়া গেলে।

তামিম সঙ্গী হিসেবে পাচ্ছেন সৌম্য সরকারকে। সুযোগ হতে পারে ২৪ বছরের লিটন দাসেরও। ডানহাতি এ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষের জন্য যথেষ্ট ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার সামর্থ্য রাখেন। গত এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তার ঝড় তোলা সেঞ্চুরিটি সাক্ষ্য দেবে টাটকা স্মৃতি হিসেবে। তবে প্রতিভা আর সামর্থ্যের সমন্বয় তখনই সোনায় সোহাগা, যখন সেটি ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে রূপ নেয়। ২৮ ওয়ানডেতে দুটি ফিফটি ও একটি সেঞ্চুরিতে চব্বিশ ছুঁইছুঁই গড়ের ক্যারিয়ার লিটনকে ঘিরে নির্ভরতার ঘাটতির কথাই সামনে আনে। সেটি কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ত্রিদেশীয় সিরিজে একম্যাচ সুযোগ পেয়েই ফিফটি, ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচেও ফিফটি। প্রথমবার বিশ্ব আসরে যাওয়া লিটনের কাছে দারুণ কিছুই পেতে পারে বাংলাদেশ।

লিটনের মতোই অমিত সম্ভাবনার আরেক সারথি সৌম্য সরকার। লিটনের মতোই ধারাবাহিকতার অভাবও যার প্রকট ছিল! সেটি কাটিয়ে ওঠার আভাস দিয়েছেন। ত্রিদেশীয় সিরিজে ছিলেন ধারাবাহিকতার মূর্ত প্রতীক। শিরোপার মঞ্চে ভিত গড়ে দেয়া ঝড়ো ফিফটি সাহস বাড়াচ্ছে তাকে ঘিরে। নিজের দিনে ২৬ বছর বয়সী এ বাঁহাতি প্রতিপক্ষ বোলারদের কতটা ছত্রখান করে দিতে পারেন সেটির প্রমাণ তো মিলেছে বহুবার। দলে আসা-যাওয়ার চাপ আপাতত নেই। নির্ভার সৌম্যর কাছে তাই মিলতে পারে আরও বেশিকিছু।

তাক লাগিয়ে দেয়া অনেক ইনিংস উপহার দিয়েছেন সৌম্য। ব্যাট করতে পারেন ওপেনিং, টপঅর্ডার থেকে শুরু করে একেবারে লোয়ার মিডলঅর্ডার পর্যন্ত যেকোনো জায়গাতেই। মিডিয়াম পেসে তার বাড়তি কয়েকটি ওভার অধিনায়কের জন্য বেশ স্বস্তিরও। নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলবেন। দুটি বিশ্বকাপের লম্বা সময়ে মাঝে ৪৪ ওয়ানডে তার নামের পাশে, যাতে ২ সেঞ্চুরির সঙ্গে ১০ ফিফটি। গড়টা সাঁয়ত্রিশ ছুঁই, তুলনামূলক ভালোই বলা যায়! স্ট্রাইকরেটও মন্দ নয়, একশ স্পর্শের অপেক্ষায়, ৯৯.৯৩।

টপঅর্ডারে ব্যাট করার সম্ভাবনাই তার বেশি, তবে দলের প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় যেমন ব্যাট করতে পারেন, সঙ্গে দারুণ সব ইনিংস খেলে ম্যাচ বের করে আনার সামর্থ্যও রাখেন সাকিব আল হাসান। বয়স ৩২ হয়ে গেছে, নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন, কিন্তু বাংলাদেশ দল তার মতো আরেকজন খেলোয়াড়কে গড়ে তুলতে পারেনি। বলা চলে সাকিব খেললে দুজন খেলোয়াড়ের কাজটা করে দেন। মানে বল হাতেও যে স্পিন নেতৃত্বটা সাকিবের হাতেই। আবির্ভাবের পর থেকেই ব্যাটে-বলে দলের অন্যতম অপরিহার্য সদস্যটির নাম সাকিব। এবারের বিশ্বকাপেও টাইগার দল ভরসার চোখেই চেয়ে থাকবে তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের দিকে।

ব্যাট-বলের পাশাপাশি সাকিব সামলাবেন সহ-অধিনায়কের দায়িত্বও। তিনি টেস্ট ও টি-টুয়েন্টিতে বাংলাদেশের অধিনায়ক। যেকোনো কন্ডিশন, যেকোনো পরিস্থিতি, যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সমান কার্যকরী। কাউন্টি-ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে দাপিয়ে বেড়ানোর কারণে দেশের বাইরে, এমনকি ইংল্যান্ডেও সবচেয়ে বেশি খেলার অভিজ্ঞতা তার। বাংলাদেশ দলের বর্তমান কোচ স্টিভ রোডস ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলতে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে, সেই বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার প্রাথমিক ধাপেই। দুজনের অভিজ্ঞতা বড় সহায়ক হবে টাইগার দলের জন্য। সাকিবের নামের পাশে ১৯৮ ওয়ানডেতে সাড়ে ৫ হাজারের উপরে রান, আর ৩৫ পেরনো গড়ের সঙ্গে ৭টি সেঞ্চুরি ও ৪২টি ফিফটি লেখা। আর উইকেট? বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪৯টি। সেরা সাকিবের কাছে তাই সেরা কিছুর আশাতেই বুক বাঁধছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

মিডলঅর্ডারে বাংলাদেশের আসল খুঁটিটার নাম মুশফিকুর রহিম। দল বিপদে, দেয়াল হয়ে দাঁড়াবেন। রান দরকার, ব্যাট কথা বলবে সব কন্ডিশনে, চেনাছন্দেই। বাংলাদেশকে বহু রঙিন মুহূর্ত এনে দেয়ার এ কারিগর উইকেটের পেছনেও বিশ্বস্ত হাত গ্লাভসসঙ্গী করে। প্রয়োজনে জুটি গড়া থেকে রানের গতি বাড়ানো, সমান পারদর্শী ৩১ বছর বয়সী মুশফিক। খেলছেন নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপে। ২০৫টি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা ঝুলিতে, পঁয়ত্রিশ ছোঁয়া গড়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার রান। সঙ্গে ৬ সেঞ্চুরি ও ৩৩ ফিফটি। আর উইকেটের পেছনে দুইশ পেরনো ডিসমিসালের কৃতিত্ব। বড় মঞ্চে সাফল্য পেতে হলে মুশফিকের সেরাটা বেশি করেই দরকার লাল-সবুজদের।

মুশফিক জ্বলে ওঠেন ধারাবাহিকভাবেই। যেমন ধারাবাহিকভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর আরেকটি নাম মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। মিডলঅর্ডারে শুরু করে লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি দলের বিপদ কাটিয়ে তোলায় বেশ সিদ্ধহস্ত একটি নাম। ৩৩ বছর বয়সী ডানহাতি অলরাউন্ডার খেলবেন তৃতীয় বিশ্বকাপে। গত বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরিতে তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। ১৭৫ ওয়ানডে নামের পাশে, ৩৩.৩৯ গড়ে সাড়ে তিন হাজারের ওপর রান, সঙ্গে ৩ শতক আর ২০ ফিফটি। ৭৬টি উইকেটও আছে ঝুলিতে। দলের খুব প্রয়োজনের সময় বহুবারই হেসেছে তার ব্যাট, বিপদে হয়েছে ঢাল। ইংল্যান্ডেও যে সেই দায়িত্বটাই কাঁধে তুলে নিতে হবে সেটি বেশ জানা রিয়াদের, যে জানায় ভরসা খুঁজে পায় বাংলাদেশ।

মিডলঅর্ডারে নতুন আরেক সারথির দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ। সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ছিটকে যাওয়া। দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে এসে দারুণ করছেন মোহাম্মদ মিঠুন। বয়সা ২৮ পেরিয়েছে, নামের পাশে কেবল ১৮ ওয়ানডে। কিন্তু গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে রান করে দিয়েছেন আস্থার প্রতিদান। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি নির্বাচকদের। ৪ ফিফটির অভিজ্ঞতা সঙ্গী করেই এ ডানহাতি ব্যাটসম্যানকে নেমে পড়তে হবে ইংল্যান্ডের মাটিতে, উইকেটের পেছনেও তাকে কাজে লাগাতে পারবে দল।

টপঅর্ডারে কিংবা লোয়ার-মিডলে, ঝড় তোলার দরকার পড়লে তাকে নামিয়ে দাও। টিকে গেলে রান আসবে। এই টিকে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ সাব্বির রহমানের জন্য। নয়তো তার সামর্থ্য নিয়ে তো প্রশ্ন তোলা যায় সামান্যই! বিতর্কিত সব কর্মকাণ্ড করে দলে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন। অনেকটা অধিনায়ক মাশরাফীর চাহিদাতেই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে তাকে গত নিউজিল্যান্ড সিরিজে নিয়ে যাওয়া হয়। হতাশ করেননি। সতীর্থদের চরম ব্যর্থতার সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে ঝলমলে এক সেঞ্চুরিতে আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন সাব্বির। তাতে সুযোগ মিলছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ যাত্রার। ৬১ ওয়ানডেতে মাত্র হাজার পেরোনো রান, এক শতকের সঙ্গে ৫ ফিফটি তার সামর্থ্যের পুরোটা ব্যাখ্যা করে না। ২৭ বছর বয়সী ডানহাতি সেই ব্যাখ্যাটা ব্যাটে দিলেই বিশ্বকাপে বিশেষ প্রাপ্তিযোগ মিলবে টাইগারদের।

লোয়ার-মিডলে বাংলাদেশ বিকল্প রেখেছে আরেক অলরাউন্ডারকে। ২৩ বছর বয়সী মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। ২৬ ওয়ানডের ক্যারিয়ার, বিশ্বকাপে গেছেন প্রথমবার। দুটি ফিফটি আছে, নামের পাশে ১১টি উইকেটও। দ্বিতীয় ফিফটি তো ইতিহাস সৃষ্টি করা। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ যে শিরোপাটা জিতল, সেই ম্যাচের নায়ক, ম্যাচসেরা হয়েছেন মোসাদ্দেক এক ঝড়ো ফিফটিতে। শুরুটা সম্ভাবনার ছিল, এপরই ছিটকে যান জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম থেকে। ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করে আবারও ফিরলেন। বড় মঞ্চের আগে প্রথম সুযোগেই বাজিমান। আত্মবিশ্বাসী এমন একজনের থেকে সময় মতো বেরিয়ে আসতে পারে সেরাটাই। যে প্রত্যাশায় তাকে স্কোয়াডে টানা।

মেহেদী হাসান মিরাজ, সাকিব আল হাসানের মতো হয়ে ওঠার রসদ যার মাঝে অটুট। অফস্পিনে জাদু ছড়াতে পারেন যেমন, প্রয়োজনে ব্যাট হাতে রাখতে পারেন দারুণ ভূমিকা। জাতীয় দলে এসে বলে কার্যকরী হয়ে উঠছিলেন ক্রমেই, কিন্তু শঙ্কায় পড়ে যায় ব্যাটিং, সেখানেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ২১ বছর বয়সী মিরাজ। সাকিবের সঙ্গী হিসেবে স্পেশালিস্ট স্পিনার দলে কেবল মিরাজই। ২৮ ওয়ানডে সঙ্গী করে প্রথমবার হয়েছেন বিশ্বকাপমুখী। একটা ফিফটি আছে নামের পাশে, সঙ্গে ২৯টি উইকেট। আর সঙ্গী প্রত্যাশার মাপকাঠি!

মিরাজ যেমন স্পিন-অলরাউন্ডার হিসেবে প্রত্যাশার পারদের নিচে, পেস-অলরাউন্ডারের চাহিদাটা মেটাতে সেখানে আছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। মিরাজের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ সতীর্থ। সত্যিকারের একজন পেস-অলরাউন্ডার নামক সোনার হরিণের পিছু বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে দীর্ঘ ছোটাছুটি, তাতে এক পশলা স্বস্তির নাম সাইফউদ্দিন। বলে কার্যকরী, শুরু থেকে স্লগ ওভার পর্যন্ত মাথা খাটিয়ে বল করায় দক্ষ, আর ব্যাটে বিগশটের পসরা সাজানোর রসদ। ১৩ ওয়ানডে খেলে একশর ওপর স্ট্রাইকরেটে রান তুলে সেটা দেখিয়েছেনও। নামের পাশে উইকেট হয়ত কেবল ১১টি। কিন্তু ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দলের একজন অপরিহার্য সদস্য যে তিনি হবেন, সেটি জানান দিয়েছেন বয়সভিত্তিক সময় থেকেই। এবারের বিশ্বকাপ তার জন্য হতে পারে শিক্ষাসফর, বা তাক লাগিয়ে দেয়ার মঞ্চের যেকোনো একটি। দ্বিতীয়টি হলেই বরং ভালো।

বাকি থাকল বাংলাদেশের পেস ব্যাটারির কথা। দলনেতা মাশরাফী এখানেও নেতা। প্রধান সঙ্গী হবেন ২৩ বর্ষী মোস্তাফিজুর রহমান। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে আবির্ভাব। একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি ভাঙা। এরপরই পথহারা, দায় যতটা না পারফরম্যান্সের, তার কয়েকগুণ বেশি চোটের। পরপর কয়েকটি চোট তাকে দিশেহারা করে তুলেছে। অভাবটা ভালোই বুঝেছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে চেনা ঝলকটা ফিরে আসার খোঁজ মিলেছে কাটার মাস্টারের মাঝে। সেটা বিশ্বমঞ্চে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করলে ভালোকিছুই পাবে বাংলাদেশ। ৪৬ ওয়ানডে সঙ্গী করে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে তিনি, নামের পাশে ৮৩ উইকেট।

২৯ বছর বয়সী রুবেল হোসেন মাশরাফীর পর দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ পেসার। ৯৭টি ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন দীর্ঘ সময়। কখনও চোট, কখনও পারফরম্যান্স, কখনও অন্যরা চাহিদায় এগিয়ে থাকার কারণে ম্যাচে নামতে পারেননি। তবে যখনই নেমেছেন, জাত চিনিয়েছেন। চড়াই-উতরাই যেমন আছে, তার উপর আস্থা রাখার কারণও যথেষ্ট আছে। নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে তিনি, অভিজ্ঞতাটাই তাকে এগিয়ে রাখবে অন্যদের চেয়ে। ১২৩ উইকেট নামের পাশে।

বিশ্বকাপ দলে যখন জায়গা মিলেছে, ওয়ানডে অভিষেকের অপেক্ষায় তখন আবু জায়েদ রাহি। তিনি দলে পঞ্চম পেসার। তাসকিনের চোট, শফিউলের টিকতে না পারা, ২৫ বছর বয়সী রাহিকে সামনে এনেছে। ৫টি টেস্ট ও ৩টি টি-টুয়েন্টি খেলে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। পরে ত্রিদেশীয় সিরিজে অভিষেক। ওয়ানডেতে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়িয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেই ৫ উইকেট নিয়েছেন। ২ ম্যাচে উইকেট ওই পাঁচটি।

এতো গেল অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য আর প্রত্যাশার কথা। এই তিন বিষয় তখনই সুস্বাদু একটি মিশ্রণ উপহার দেবে যখন মাঠের পারফরম্যান্সে দৃষ্টিগোচর হবে। যেখানে ক্রিকেটারদের বাইরের কোনো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একবার সবুজ কার্পেট আর ২২ গজে ব্যাট-বল হাতে নেমে গেলে কাজটা করবে হবে কেবল ক্রিকেটারদেরই। বিশ্বকাপ ইতিহাসেই নিজেদের সেরা দল, বয়সের বিচারে সবচেয়ে অভিজ্ঞও। চারজন চতুর্থ আর তিনজন তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন। সেরা সেরা এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ ক্রিকেটাকাশে সেরা ইতিহাসটা লিখবে, সেই অপেক্ষাতেই প্রহরগোণা এখন!

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দল: তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, মোহাম্মদ মিঠুন, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা (অধিনায়ক), মেহেদী হাসান মিরাজ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, আবু জায়েদ রাহি।