চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আনন্দের ছলে নাটকে একটা মেসেজ দিয়ে দেই: সাগর জাহান

আরমান ভাই, সিকান্দার বক্স, অ্যাভারেজ আসলাম-এর পর এবার ‘ফ্যাটম্যান’ নিয়ে হাজির সাগর জাহান

ছোট পর্দার তুমুল জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা সাগর জাহান। আরমান ভাই, সিকান্দার বক্স, অ্যাভারেজ আসলাম-এরকম বেশকিছু জনপ্রিয় নাটকের সঙ্গে লেপ্টে আছেন তিনি। তবে মিডিয়ায় তার জার্নিটা কিন্তু নির্মাতা হিসেবে নয়। নাট্যকার হিসেবে তার আবির্ভাব। নিজের লেখা প্রথম নাটকটি তিনি লিখেছিলেন ২০০৫ সালে। নাটকের নাম ‘নীল গ্রহ’। ২০০৯ সাল পর্যন্ত নাটকের গল্পই লিখে গেছেন। এরপর নিজেই নেমে এলেন নির্মাণে। তবে লেখা ছাড়েননি। বেশির ভাগ সময় নিজের লেখা নাটকই নির্মাণ করেন তিনি। এখনতো আরো জনপ্রিয়। গেল ঈদেও তার বেশকিছু নির্মিত নাটক স্থান করে নিয়েছে জনপ্রিয়তার তালিকায়। ফ্যাটম্যান, দুলু বাবুর্চি এবং মাহিনের লাল ডায়েরী উল্লেখযোগ্য। ঈদে জনপ্রিয়তা পাওয়া নাটকগুলো ছাড়াও মঙ্গলবার দুপুরে এই নির্মাতার সাথে কথা হলো আরো বেশকিছু বিষয় নিয়ে:

বিজ্ঞাপন

এক ঈদের ব্যস্ততা ফুরিয়ে আরেক ঈদের ব্যস্ততায় ডুবলেন?
ব্যস্ততার মধ্যেইতো বসবাস আমাদের। ঘরের মধ্যে থাকলেও লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ততা, আর বাইরে থাকলে শুটিং। বলা যায়, ব্যস্ততার সঙ্গে আমাদের জীবনের নিবির সম্পর্ক!

তো বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেই এক ঈদতো গেলো। তারপরও আপনার বেশকিছু নাটক জনপ্রিয়তার তালিকায়। পাব্লিক রেসপন্সের কথা যদি বলি, তাহলে কী অবস্থা সব মিলিয়ে?
আসলে আমার পুরো ভাবনা জুড়েই ছিলো নাটক। বিশ্বকাপের কথা আমি মাথায় রাখিনি। একজন নাট্য নির্মাতা হিসেবে বিশ্বকাপ যে আমার মধ্যে চাপ তৈরি করতে পারে, সে সুযোগ আমি দেইনি। এটা ভাবতে আমার ভালো লাগে যে, নাটক নিয়ে আমার ভাবনাগুলো ছিলো একদম ফোকাসড! ঈদ আসলে আমার মধ্যে অটোমেটিক একটা রেসপনসিলিবিটির জন্ম নেয়। আমি আমার সাধারণ দর্শকের কথা চিন্তা করি। নিয়মিত দর্শকের কথা সব সময় মাথায় রাখি। আমি প্রায় সময় সব মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময়ও বলি যে, আমি কিন্তু নাটক লিখি কিংবা বানাই একদম সাধারণ দর্শকের জন্য। তারমানে অসাধারণ মানুষকে আলাদা করছি না কিন্তু, বলতে চাইছি বাংলা নাটক যারা বেশি দেখেন তাদের কথা। তো এবারও সেই কমিটমেন্ট থেকেই ঈদে নাটকগুলো বানিয়ে ছিলাম। সেই নাটকগুলো ঠিক ঠাক আমার টার্গেট দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এতেই আনন্দ।

আপনার দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিলো এবার?
এবার বিশ্বকাপ একটা হুমকি ছিলো। তারপরেও আমার নাটক ঠিকই মানুষ দেখেছে। প্রতিক্রিয়া জানার দুটো দিক আছে। একটি দিক নাটক দেখে সরাসরি মানুষ তার প্রতিক্রিয়া আমাকে জানায়। তো এবার অসংখ্য মানুষ আমার নাটক নিয়ে তাদের ভালো লাগার কথা আমাকে জানিয়েছে। তাদের কাছ থেকে খুব ভালো রিয়েকশান পেয়েছি। আরেকটা দিক হচ্ছে ইউটিউব। টিভিতে যাওয়ার পর এই মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ নাটকগুলো দেখছে। সবার কাছ থেকেই বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি এবার।

ইউটিউবে আপনার নির্মিত সবচেয়ে বেশি দেখেছে এবার কোন নাটকটি?
এবার আমি খুব কনসার্ন ছিলাম ‘ফ্যাটম্যান’ নামের নাটকটি নিয়ে। খুব ভয়েও ছিলাম। কারণ গত কয়েক বছর ধরে টেলিভিশনে যে চাঙ্কে আমার আরমান ভাই, সিকান্দার বক্স, অ্যাভারেজ আসলামের মতো তুমুল জনপ্রিয় নাটকগুলো প্রচারিত হয়েছে সে চাঙ্কে এবার গেলো ‘ফ্যাটম্যান’। ভাবছিলাম দর্শক কীভাবে নেয়! অথচ টিভিতেতো দর্শক দেখেছেই, সেইসঙ্গে ইউটিউবেও সবচেয়ে বেশিবার এবার দেখেছে ‘ফ্যাটম্যান’ নাটকটি। এটা ঈদের সাত দিনেই একই সময়ে প্রচার হয়েছে। নতুন গল্প, নতুন নাম, নতুন নাটক ‘ফ্যাটম্যান’ দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া ‘মাহিন’-এর নতুন সিক্যুয়ালের নাটকটিও বেশ ভালো রেসপন্স পেয়েছি।

অনলাইনে এতো মানুষ ‘ফ্যাটম্যান’ নাটকটি কেনো দেখেছে বলে মনে হয় আপনার?
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘ফ্যাটম্যান’ অনেক অনেক রেসপন্স পেয়েছি। এখনো পাচ্ছি। আর আমি যেটা বরাবরই বলে আসছি সেটা হলো, মানুষ গল্পটাকে একটু ডিফারেন্ট ভাবে নিয়েছে। আর আমার প্রতিটি নাটকে আমি আসলে আনন্দের ছলে একটা মেসেজ দিয়ে দেই। এমন কোনো মজার নাটক নাই যেখানে আমার মেসেজ নাই। এটা আমি গর্বের সাথে বলতে পারি। এটা আমি দায়িত্বের সাথে করে আসতেছি। মানুষ যেভাবেই এটাকে ব্যাখ্যা করুক, কিন্তু এটা সেই ‘আরমান ভাই’ থেকে শুরু করে সব নাটকেই এমনটা পাবেন। আর এবার আরেকটা সিক্যুয়াল নাটক ‘দুলু বাবুর্চি’। বৃন্দাবন দাসের লেখা জাহিদ হাসানের দুর্দান্ত অভিনয়ে এই নাটকটিও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রচুর রেসপন্স পেয়েছি এই নাটকটি নিয়েও।

‘ফ্যাটম্যান’ নাটকের একটি দৃশ্যে মোশাররফ করিম

‘ফ্যাটম্যান’-এ মোশাররফ করিমকে বেশ মোটা দেখায়। তার কস্টিউম কি আরো রিয়েলিস্টিক করা যেতো না?
এই নাটকে কস্টিউম নিয়ে খুব কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের কোনো কষ্ট না হলেও মোশাররফ ভাইয়ের প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে এই নাটক করতে গিয়ে। তবে হ্যাঁ, আরো রিয়েলেস্টিক করা যেতো। নাটকে যে পরিমাণ বাজেট থাকে তাতে এই চরিত্রকে রিয়েলেস্টিক করে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব না। স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহার করার বাজেটতো আমাদের নেই। বাজেটের প্রয়োজনে আমাদের ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু করতে পারি না। ফলে আমাদের টেকনিকের আশ্রয় নেয়া লাগে। ‘ফ্যাটম্যান’কে ফুটিয়ে তুলতে আমরা টেকনিক্যালি কিছু কাজ করলাম। টেকনিক্যালি মোটা কাপড়, ভেতরে ভারি জ্যাকেট পরিয়ে এরকম করা হয়েছে। আসলে মোশাররফ ভাইয়ের উপর দিয়েই পুরো ঝড় ঝাপ্টা গেছে। পর্দায় মোটা দেখানোর জন্য মোশাররফ ভাইকে বানানো পেট, হাত এগুলোও ব্যবহার করতে হয়েছে। এরজন্য মোশাররফ ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা। রোজার আগের দিন প্রচুর গরমের মধ্যে শুটিং শেষ করে আসছি আমরা, বলে বোঝানো যাবে না! কি কষ্টটা করতে হয়েছে মোশাররফ ভাইকে! এমন চরিত্র এতো চ্যালেঞ্জ নিয়েও ফুটিয়ে তোলার জন্য মোশাররফ ভাইয়ের প্রতি আমি বারবার কৃতজ্ঞ। আমার টিম, মেকাপ-আর্টিস্ট সবাই খেটেছে এটা সত্য কিন্তু মোশাররফ ভাইকেই সবচেয়ে বেশি কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। চরিত্রের প্রয়োজনে সমুদ্রের উত্তপ্ত বালুতে মোটা কাপড় পরে তাকে জগিংও করতে হয়েছে!

সিক্যুয়াল নাটক ছাড়াওতো কয়েকটি সিঙ্গেল নাটক ছিলো এবার। সেগুলোর কেমন রেসপন্স?
এবার ঈদে আমার আরেকটা ইমোশনের জায়গা ছিলো। চৌদ্দ বছর আগে আমার লেখা প্রথম নাটক নির্মাণ করেছিলেন অরণ্য আনোয়ার। নাটকের নাম ‘নীল গ্রহ’। নাটকে অভিনয় করেছিলেন মাহফুজ আহমেদ ও অপি করিম। চৌদ্দ বছর পর এসে আমি এবার ঈদে সেই একই নামের নাটক নির্মাণ করলাম। একই আর্টিস্ট দিয়ে। শুধু এবার পার্থক্য সেই নাটকটি নির্মাণ করেছিলেন অরণ্য আনোয়ার, আর এটা আমি নিজেই করেছি।

‘নীল গ্রহ’ তাহলে আপনার লেখা প্রথম নাটক?
হ্যাঁ। তখনতো আমি শুধু নাট্যকার ছিলাম। নাটক লিখতাম। মানে ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমি নাট্যকার হিসেবেই ছিলাম। এরপর ডিরেক্টর হলাম। তো যা বলছিলাম, ‘নীল গ্রহ’ নিয়ে ভীষণ ইমোশন ছিলো। ভাবলাম দেখি কেমন করে নেয় মানুষ এটা? দেখলাম, ভালোই রেসপন্স পেলো। এছাড়াও মোশাররফ ভাইকে নিয়ে ‘মাছের দেশের মানুষ’ নামের আরেকটা নাটকও খুব ভালো করেছে।

আরমান ভাই, সিকান্দার বক্স, অ্যাভারেজ আসলামের পর এবার ‘ফ্যাটম্যান’। সামনের ঈদেও কি চলবে?
অবশ্যই চলবে। কোরবানি ঈদের জন্য ‘ফ্যাটম্যান’-এর গল্প লিখছি। এই মাসেই শুটিং শুরু করবো। তবে এবারেরটা কি নাম হবে এখনো ভাবিনি।

‘ফ্যাটম্যান’ ছাড়া আসছে ঈদে আর কী কী নাটক নিয়ে আসছেন?
মাহিন যে সিক্যুয়ালের তা আসছে ঈদে শেষ করে দিবো। মানে কোরবানি ঈদে শেষ হচ্ছে জনপ্রিয় নাটক মাহিনের সিক্যুয়াল। এছাড়া আরেকটি ভালো কাজ করতে যাচ্ছি। প্রতি বছরই এটা একটা করার চেষ্টা করি। অপি করিমের সাথে। ‘এ শহর মাধবীলতার না’, একটু সাইকি প্যারা নরমাল টাইপের নাটক এটা। এবার ভাবছি আসছে ঈদে ‘মাধবীলতা চোখের পানি জমায়’ নামে নাটকটি করবো।

আপনার নাটকে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় স্টার কাস্ট। ছোট পর্দার শীর্ষস্থানীয় অভিনেতাদের নিয়ে আপনি কাজ করেন। অনেকে আপনার কাস্টিংকে ‘টাইপ কাস্ট’ বলে অভিযোগ করেন? কী বলবেন?
হ্যাঁ, এটা অনেক শুনেছি। আমি এমন অভিযোগের সাথে মোটামুটি ইউজড-টু। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, গল্পের প্রয়োজনে আমার অভিজ্ঞ অভিনেতারই দরকার হয়। একজন স্টার, একজন জাহিদ হাসান বা একজন মোশাররফ করিম। তাদের বেড়ে উঠার গল্প, তাদের স্ট্রাগলের গল্প এগুলোতো মিথ্যে নয়। তারাতো হঠাৎ বেড়ে উঠেনি। তারাতো এমনিও স্টার হয়নি। তারা বড় অভিনেতা বলেইতো হয়েছে, যোগ্যতায় হয়েছে। তো চরিত্রের প্রয়োজনে তাদেরকেতো আমরা নেবোই। যারা টাইপ কাস্টের অভিযোগ আনছেন তাদেরকে বলি, আরমান ভাইয়ের চরিত্রে যদি আমি জাহিদ ভাইকে না নিয়ে নতুন কাউকে নিতাম তাহলে কি এই প্রশ্ন উঠতো না যে, এমন ম্যাচিউরড একটা চরিত্রে কেনো আমি নতুন ছেলেকে নিলাম? এরকমভাবে সিকান্দার বক্স, বা অ্যাভারেজ আসলামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। অভিনয় হয়তো সবাই দুর্দান্ত ভাবে উতরিয়ে যাবেন, কিন্তু পারফেক্ট কয়জন করতে পারবেন! নির্মাতা হিসেবে আমিতো পারফেকশন খুঁজবোই, একটু কমফোর্ট খুঁজবোই এতেতো দোষের কিছু দেখছি না।

তুলনামূলক নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খুব কমই দেখা যায় আপনার নাটকে, এমন অভিযোগ কি পেয়েছেন অতীতে?
সিনিয়রদের ছাড়াও নতুনদের সাথেও প্রচুর কাজ করি। আজ থেকে আট বছর আগে অপূর্বকে আমি অপি করিমের সাথে ‘বোরকা’ নাটকে নেইনি? আমি সাবিলা নূর, মিশু, তৌসিফ, অ্যালেন শুভ্র, সিয়াম-এদেরকে নিয়েও কাজ করেছি। নতুন কাকে নিয়ে আমি কাজ করেনি। কিন্তু যে চরিত্রে যাকে মানায় তাকেই নিয়েছি। এটাতো আমার অপরাধ না। আর আমরাতো একটা চরিত্রের মৃত্যু ঘটাতে পারি না। জাহিদ ভাইয়ের চরিত্রে অন্য কাউকে আমি কীভাবে নেবো? উনার একটা অভিজ্ঞতা আছেতো, নাকি! সবাই যে বলে আপনি স্টার নিয়ে কাজ করেন কেনো? আরে ভাই, স্টারতো একটা কষ্টের জার্নি। অভিজ্ঞতার জার্নি। আমার চরিত্রগুলো যদি এমন অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ অভিনেতাকে ডিমান্ড করে তাহলে আমি কী করবো! স্টার শব্দের মধ্যেতো আমি ক্ষতিকর কিছু দেখি না।