চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অসংখ্য পুরনো সংবাদের একটি হয়ে যাচ্ছে দীপন

মানুষের ভাগ হয়ে যাওয়া কতটা প্রকট হতে পারে আর ভয়ে মানুষ কতটা বদলে যেতে পারে?

বিজ্ঞাপন

নানা ইস্যুতেই মানুষ ভাগ হয়ে যায়। মানুষ আদর্শে ভাগ হয়। পছন্দ-অপছন্দে ভাগ হয়। স্বার্থে ভাগ হয়। ভাগ হয়ে থাকে। মানুষ ভয়ও পায়। এসবই স্বাভাবিক। তবে কাছের কারো দুঃসময়ে মানুষ এক হয়ে যায়। ভয়, সংকোচ, বিভক্তি ভুলে ছুটে আসে। এমনই আমরা দেখি। দেখে এসেছি। কিন্তু প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন নিহত হওয়ার পর কিছু বিষয় দেখে কিংবা শুনে মনে হলো, সে অবস্থাও পাল্টাতে শুরু করেছে।

দীপন নিহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চেনা-অচেনা, কাছের-দূরের, সাধারণ কিংবা উচ্চ পর্যায়ের- সব ধরনের মানুষই তার পরিবারের খোঁজ নেন। সহানুভূতি জানান। অনেকে ছুটে আসেন। কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ একজন রাজনৈতিক নেতা একটি মন্তব্য করে বসেন। তার সে মন্তব্যে মনে হয়, দীপনরা পারিবারিকভাবে হত্যাকারীদের পক্ষের মানুষ। ওই মন্ত্যবের অনেক সমালোচনা হয়। নিন্দা হয়। এক পর্যায়ে ওই নেতাও দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু এর মাঝেই কেউ কেউ সতর্ক হতে শুরু করেন। পরিবারটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমে যায়। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের মানুষদের।

এরপর বড় একটি রাজনৈতিক দল দাবি করে, দীপন তাদের একটি সমর্থক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা নিজেদের কার্যালয়ে তার জন্য দোয়ারও আয়োজন করেন। সাবধানীরা এবার আরো সর্তক হয়ে যান। অনেকেই তখন পারিবারিকভাবে আয়োজন করা দোয়ায়ও আসেন না। উচ্চ পর্যায়ের কেউ কেউ জানান, প্রটোকল জটিলতা কিংবা জরুরি কাজের কারণে আসতে পারছেন না তারা। আবার, ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়া সজ্জন মানুষটিকে যে দলের পরিচয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, সেই দল এবং তাদের সমর্থক কিছু সংগঠনের সঙ্গে যুক্তরা খুব উৎসাহ নিয়ে আসেন। অথচ দীপনের পরিবারের কারো জানা নেই, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক সংগঠন বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছিলেন! এমন কি তার বন্ধুদের মধ্যে যারা সেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত তারাও জানেন না এমন কিছু। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কিসের জন্য তাকে এমন ভাগ করে দেওয়া?

বিজ্ঞাপন

তাহলে মানুষের চেয়ে তার বিভক্ত পরিচয়টিই বড়? এমনকি তা কল্পিত বা কারো স্বার্থে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হলেও!

কিন্তু তাকে ভাগ করে নিজেরা বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানুষেরা কি অনুভব করতে পারেন, দীপনকে হত্যার মধ্য দিয়ে আসলে শুধু একজন সত্যিকারের মানুষকেই কেড়ে নেওয়া হলো? অসম্ভব ভালো ক’জন মানুষের ঝলমলে একটি পরিবারের আলোটাই নিভিয়ে দেওয়া হলো? আর এ জন্য মানুষ হিসেবে সমানুভূতি প্রকাশে এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোয় সঙ্কোচের কোনো কারণ থাকতে পারে না?

আমরা গণমাধ্যমকর্মীরাও যতটা ব্যস্ত ছিলাম দীপনের মৃত্যুর পর তাকে হত্যার স্থান, হাসপাতাল আর পরিবারের চিত্র তুলে ধরায়, পরে দোষীদের চিহ্নিত করার বেলায় সেই গভীরতাধর্মী সাংবাদিকতা কোথায়? যত প্রশ্ন তখন সেই পরিবারের বয়োজ্যষ্ঠ থেকে শিশুদের করা হয়েছে, তার কতটা করা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে তাদের তদন্ত নিয়ে? কতটা লেগে থাকা হচ্ছে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে?

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আরো কত বড় সংবাদ গণমাধ্যম দখল করে ফেলছে! দীপন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পুরনো সংবাদের একটি। আর তার স্বজনদের কান্নার ছবিগুলোও এখন আর্কাইভে…

(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)