চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অভিনয় শিল্পী এবং হিচককের গবাদিপশু

ইংরেজি শব্দ ‘ক্যাটল’ বাংলায় গবাদিপশু। শিং আছে এমন পশু যাদের মাংশ বা দুধ মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। গরু, মহিষ, ভেড়া আর ছাগলকেই সাধারণতঃ গবাদিপশু বলা হয়। কোন গবাদি পশুর মাংস বেশী সুস্বাদু বা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় সে বিষয়ে আমাদের আজকের আলোচনা নয়। নন্দিত চলচ্চিত্রকার আলফ্রেড হিচককের ‘অ্যাক্টরস আর ক্যাটল’ বা ‘অ্যাক্টরস শুড বি ট্রিটেড লাইক ক্যাটল’ উক্তিটির সূত্র ধরে দেশের তথাকথিত অভিনয় শিল্পীদের পেশাদারিত্ব বিষয়ে আলোচনা শুরুর প্রয়াস, বলা যায়।

বিজ্ঞাপন

‘অভিনয় শিল্পীরা গবাদিপশু’ বা ‘অভিনয় শিল্পীদের গবাদি পশু স্বরূপ দেখতে হবে’ এমন কড়া মন্তব্যের কারণ বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তবে অস্কারজয়ী ফরাসি নির্মাতা ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র সমালোচক ফ্রাঁসোয়া ট্রুফাওকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে আলফ্রেড হিচকক বলেছিলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে এসে শিল্পীরা মধ্যাহ্নভোজে প্রচুর সময় নষ্ট করেন। এর খেসারত দিতে গিয়ে দিনের পরবর্তী দৃশ্য আমাদেরকে অস্বাভাবিক দ্রুততায়, তড়িঘড়ি বা পড়িমরি করে শেষ করতে হয় তাদের মঞ্চের ম্যাটিনি শো ধরার সুযোগ দিতে। অথচ জ্ঞান থাকলে তারা ট্যাক্সি ক্যাবে বসে গলায় স্যান্ডউইচ ঠেলে দিতেন।

হিচ দ্যা মাস্টার অব সাসপেন্স নামে বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া আলফ্রেন্ড হিচকককে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিলো না গত শতাব্দীর ৩০ থেকে ৭০ দশকের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে যারা বিশ্ব সিনেমার খোঁজ রাখেন তারাও এই কিংবদন্তীর সিনেমা দেখেছেন, নির্দ্বিধায় বলা যায়। যারা ভুলে গেছেন তাদের জন্য সংক্ষিপ্তভাবে চলচ্চিত্রে তার অবদান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়ার সুযোগ পাওয়া গেলো।

অমর এই চলচ্চিত্র নির্মাতাকে সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রের ছাত্র ও নির্মাতারা শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ জায়গায় রেখে সমীহ করেন। নাইট উপাধি পাওয়া বৃটিশ এই চলচ্চিত্রকারকে বৃটেনের সিনেমার ইতিহাস সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা দিয়েছে। শুধু বৃটেন নয়, হলিউডে পঞ্চাশের শেষ ও ষাট দশকের শুরুর দিকে তার সৃষ্টি সাইকো, ভার্টিগো, বার্ডস, দ্যা নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট এবং রেয়ার উইন্ডো- এ পাঁচটি সিনেমা আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিউটের শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ এক’শ ছবির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ডায়াল এম ফর মার্ডার, মিস্টার এন্ড মিসেস স্মিথ, স্ট্রেন্জার অন এ ট্রেন, স্পেলবাউন্ড, ব্ল্যাকমেইল, ফরেন করসপন্ডেনট সহ আরো অসংখ্য অসাধারণ চলচ্চিত্রও আছে তার ঝুলিতে। এই শতাব্দীতেও বিশ্বের থ্রিলার ও সাসপেন্স নির্ভর সিনেমার মেধাবী ও আধুনিক নির্মাতাদের নির্মাণ শৈলিতে হিচককের প্রভাব লক্ষণীয়। যাই হোক, মুল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

হিচককের আলোচিত ওই উক্তিটি মূলতঃ ভাবনার ডালপালা মেলেছে একজন অভিনেতার শিডিউল সংক্রান্ত জটিলতায় একটি বাংলা সিনেমার কাজ দু’ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকার সংবাদে। শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত খবরে তার ভিনদেশি সহশিল্পীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিনেমাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে। বলেছেন, বাংলাদেশে এটি আমার প্রথম সিনেমা। এই সিনেমা নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। দুই বছর আগে ছবিটির কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এখনো কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ছবিটির কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়াতে খুব চিন্তার মধ্যে আছি।

শিডিউল ফাঁসানো অভিনেতার নাম উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আমি যত দূর জানি, এই ছবির নায়ক একের পর এক ছবির কাজ করছেন। বাংলাদেশ ও ভারত সবখানে তিনি ঠিকই শুটিং করছেন। শুধু এই ছবির কাজটা যথাসময়ে হচ্ছে না। একটা ছবির কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে একটা সময় অনেক অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। অভিনয়শিল্পীদের লুক-এও অনেক পরিবর্তন দেখা দেয়, যা দর্শকের চোখে সিনেমার ত্রুটি হিসেবেই চিহ্নিত হয়। এখন আমার চাওয়া হচ্ছে, ছবিটির কাজ যেন দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

সিনেমাটির পরিচালক যেমন সইতে পারছেন না তেমনি অভিনেতা বা তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বেশি কিছু বলতেও পারছেন না। তিনি শুধু বলেছেন, কয়েকটি দৃশ্য আর তিনটি গানের চিত্রায়ণ বাকি। অভিনেতা বা নায়কের শিডিউলের ওপর নির্ভর করছে কবে ছবির শুটিং শেষ হবে। এই বক্তব্যেই বোঝা যায় তিনি কতটা বিপদে আছেন। বেশী কিছু বলতে গেলে অভিনেতা যদি আরো বেঁকে বসেন, সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখবে না সেই দুশ্চিন্তা থেকেই তিনি হয়তো এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি।

শিডিউল ফাঁসানোর মতো এমন অপেশাদারী গল্প এদেশের সিনেমা ও টেলিভিশন নাটকের অভিনয় শিল্পীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় শোনা যায়। সম্প্রতি হালের একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী অনেকগুলো সিনেমার কাজ অসমাপ্ত রেখেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। কাউকে কিছু না জানিয়ে তার এই গা ঢাকা দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট সিনেমার পরিচালক ও প্রযোজকরা।

বিজ্ঞাপন

একটি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে, অধিকাংশ সিনেমায় তার সহঅভিনেতা যাকে দু বছর ধরে একটি ছবির কাজ অসমাপ্ত রাখায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে তিনি তার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী’র মতো বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে বসবাস করছিলেন। যদিও অভিনেত্রীর দাবি অভিনেতা তাকে বিয়ে করেছিলেন এবং এর প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। কিছু দিন আগে তাদের সম্পর্কের অবনতি হলে অভিনেত্রী পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কী পরিমাণ অপেশাদার হলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের অজুহাতে ইন্ড্রাস্টির অন্যান্য ব্যক্তি, প্রযোজক ও পরিচালককে এভাবে ফাঁসিয়ে দিতে পারেন একজন অভিনেত্রী? অথচ পারিশ্রমিক হিসেবে আগাম অর্থ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই দুজন অভিনেতা অভিনেত্রী বেশ ক’ বছর ধরেই দেশীয় চলচ্চিত্রে গুরুত্বপুর্ণ স্থান দখলে রেখেছিলেন।

শুরুতেই বলে নিয়েছি, হিচকক ঢালাওভাবে মন্তব্য করলেও এখানে শুধু তাদের নিয়েই আলোচনা হচ্ছে যারা অপেশাদার আচরণের দায়ে অভিযুক্ত। ঢালাওভাবে সকল অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে নয়। সব পেশার মতো এখানেও কিছু শিল্পী আছেন যারা চেষ্টা করেন শতভাগ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে। তবে ইদানীং অপেশাদারের সংখ্যা এতোটাই বেড়েছে, পরিচালক ও প্রযোজকের পাশাপাশি পেশাদার শিল্পীরাও এর কুফল ভোগ করছেন, এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

এফডিসিকেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা কী তা সকলেরই জানা। দেশে দু একটি ভালো চলচ্চিত্র যা হয় তা এফডিসি’র বাইরের নির্মাতারাই করছেন। এক্ষেত্রে শিডিউল ফাঁসানোসহ, সময়মত সেটে না যাওয়া, সেটে গিয়ে মোবাইল ফোনে চ্যাট করে সময়ের অপচয়সহ সকল প্রকার অসহযোগিতার স্বীকার হচ্ছেন এই বাইরের নির্মাতারা। নতুন অনেক মেধাবী নির্মাতা চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ছবিটিকে এডিটিং টেবিলে নিয়ে যেতে পারেন না এ জাতীয় নানাবিধ কারণে।

সম্প্রতি একটি আড্ডায় একজন পরিচালক দুঃখ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানালেন, সকল শিল্পির শিডিউল মিলিয়ে শুটিংয়ের দিন তারিখ ঠিক করার পর অন্তত এক মাস পর একজন অভিনেত্রী ফোন করে জানালেন, নির্ধারিত দিনে তিনি শুটিং করতে অক্ষম। কারণ হিসেবে বললেন দাঁতে ব্যথা আছে। পরিচালক উত্তরে জানালেন, এখনোতো শুটিং এর ১৫ দিন বাকি আছে। দাঁতের ব্যথা সারতে দু তিন দিনের বেশি লাগার কথা নয়। অভিনেত্রীর একই কথা, সরি আমি পারবো না।

৯০ দশকের একজন তারকা অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে একটি গল্প চালু ছিল। প্রায়ই তিনি শুটিংয়ে অনুপস্থিত থাকতেন বিনা নোটিশে। পরবর্তীকালে অজুহাত দিতেন নানি মারা যাওয়ার। এভাবে তিনি তাঁর নানির দাফন উপলক্ষ্যে কতোবার কতো পরিচালকের শিডিউল ফাঁসিয়েছেন তাঁর হিসাব মিলাতে হিমশিম খেতে হতো তৎকালীন পরিচালকদের।

চলচ্চিত্রের মতো নাটকের অভিনয় শিল্পীদেরও এমন আচরণ ইদানীং বেড়েছে। তারাও পরিচালকদের জিম্মি করে চলেছেন, বিশেষ করে সিরিয়ালের ক্ষেত্রে। এর সঙ্গে নতুন একটি সমস্যা যোগ হয়েছে, পাণ্ডুলিপি না পড়া। অথচ একসময় টেলিভিশন নাটকের পাণ্ডুলিপি মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক ছিল। তার পর টানা কয়েকদিন মহড়া চলতো। এখনকার পেশাদার শিল্পীদের পাণ্ডুলিপিতে একবারও নজর দেয়ার সময় নেই, সেখানে চরিত্রের ভেতরে প্রবেশতো স্বপ্নের অতীত।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাটকের মানের নিম্নগামিতার জন্য অভিনয় শিল্পীদের অপেশাদার আচরণ অনেকাংশে দায়ী, অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভালো চিত্রনাট্য ও ভালো নির্মাতা হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত একটি ভালো ছবির নির্মাণ কাজ থমকে যায় দুয়েকজন অভিনয় শিল্পীর অপেশাদার আচরণের কারণে।

কেবলমাত্র আহারে সময় অপচয় করার কারণে মূলতঃ হলিউডের অভিনয় শিল্পীদের ঢালাওভাবে গবাদিপশুর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন হিচকক। এর বাইরে পাণ্ডুলিপি বা পরিচালকের নির্দেশে শিল্পীদের মনযোগ না দিয়ে আশানুরুপ অভিনয় করতে না পারার কারণও হয়তো ছিলো। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রীর শিডিউল ফাঁসানোসহ নানা অপেশাদারী কর্ম করে পরিচালকদের নাকে দড়ি দিয়ে যেভাবে ঘুরিয়ে থাকেন বছরের পর বছর, এমন পরিস্থিতিতে হিচকক পড়েছেন বলে জানা যায়নি। কখনো এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে থাকলে তথাকথিত এসব অভিনয় শিল্পীর অন্য আর কোন প্রাণীর সঙ্গে তুলনা কি করতেন স্যার হিচকক? সে প্রশ্নের সুযোগ এখন আর নেই। বিশ্বকে কাঁদিয়ে হিচকক চলে গেছেন পরপারে ১৯৮০ সালে। তবে এখনাকার নির্মাতারা আলফ্রেড হিচককের আরেকটি লাইন ‘দ্যা নভেলিস্ট হ্যাজ দ্যা বেস্ট কাস্টিং সিন্স হি ডাজন্ট হ্যাভ টু কোপ উইথ দ্যা অ্যাক্টরস অ্যান্ড অল দ্যা রেস্ট’ মাথায় রাখতে পারেন শিল্পী ও কলাকুশলী নির্বাচনের আগে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)