চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অভিজিৎ-দীপনকে কেনো উৎসর্গ করা হবে বইমেলা!

চাপাতির কোপে লেখক-ব্লগার অভিজিৎরায় নিহত হয়েছেন আজ এক বছর। গত বছর বইমেলার শেষের দিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি নিহত হন তিনি। এবার আরেকটি বইমেলা প্রায় শেষের দিকে। এখনো তার হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এর মধ্যেই নিহত হয়েছেন ব্লগার নীলাদ্রিনিলয় ও ওয়াশিকুর রহমান বাবু এবং প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন। আহত আরো কয়েকজন প্রকাশক।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বইমেলায় অভিজিৎ-দীপনরা নিতান্তই উপেক্ষিত বলে অভিযোগ অনেকের। মেলার অনেক জায়গাতেই দীপনের ছবি থাকলেও উপেক্ষার যে অভিযোগ তার কারণ অনেকের প্রত্যাশা মতো এবারের মেলা দীপন-অভিজিৎদের উৎসর্গ করা হয়নি। নিহত লেখক-ব্লগার-প্রকাশকদের নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা কোনো আয়োজন বা শ্রদ্ধাপর্বও ছিলো না।

যারা মনে করেন এবারের মেলাটি দীপনএবং অভিজিৎকে উৎসর্গ করা উচিত ছিলো তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, আবেগের জায়গা থেকে দেখার কারণে তারা একটা ভুল করছেন। বোধহয় বাংলা একাডেমিকে বিপ্লবী কোনো সংস্থা ভেবেছিলেন তারা।

বাস্তবতা হচ্ছে এ একাডেমি হয়তো জ্ঞানভিত্তিক বিষয়-আশয় নিয়ে কাজ করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি সরকারি একটি সংস্থাই মাত্র। স্বায়ত্ত্বশাসিত হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের দর্শনই বাংলাএকাডেমি ধারণ করে। সেটা এখন যেমন আওয়ামী লীগের, যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিলো তখন বিএনপির। ব্যক্তিগতভাবে বাংলা একাডেমি কর্মকর্তাদের অনেকের অবস্থান হয়তো তাদের মতো হতে পারে যারা মনে করেন বইমেলাটি অভিজিৎ-দীপনকে উৎসর্গ করা উচিত ছিলো। এরকম মানুষদের কথা বলছি না। বলছি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমির অবস্থানের কথা। সরকারি এ একাডেমি যে সরকারি দর্শনকে ধারণ করবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, মেলাটি যে লেখক ড. অভিজিৎ আর প্রকাশক দীপনের নামে উৎসর্গ করা হবে না সেটা মোটেই অস্বাভাবিক কোনো বিষয় না। এখানে সরকারের চাওয়া-না চাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন এবারের মেলায় একটা মজার বিষয় দেখছি। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে প্রায়ই বিভিন্ন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় উপস্থিত থাকতে দেখেছি। অনেকের মনেই প্রশ্ন: এটা কী তার কাজ? তার কাজ হলেতো সব বইয়ের মোড়ক উন্মোচনেই তার থাকার কথা। তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওইসব বইয়ের মোড়কউন্মোচনে থেকেছেন যেসব অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অতিথি ছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে তিনি এক ধরনের প্রটোকল ডিউটি করেছেন।

যে একাডেমির মহাপরিচালককে সরকারি কর্মকর্তার মতো প্রটোকল ডিউটি করতে হয় সেই একাডেমির বইমেলায় শুধু অভিজিৎ বা দীপনের বিষয়ে নয়, যেকোনো বিষয়েই সরকারের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সুতরাং, সরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজিত বইমেলা যে দীপন এবং অভিজিতের নামে উৎসর্গ করা হয়নি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তবে, মেলায় যে অভিজিৎ-দীপনরা ছিলেন না এমন নয়। তাদের ছবি ছিলো অনেক জায়গায়। কিন্তু শুধু শোভাবর্ধনের ছবিতেই যে তারা ছিলেন এমনও নয়। চিন্তার স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করেন, অভিজিতের চিন্তার সঙ্গেএকমত না হয়েও যারা মনে করেন তার নিজের চিন্তার প্রকাশের স্বাধীনতা তার ছিলো কিংবা অন্য যে কারো সেটা আছে; তারা বইমেলায় গিয়ে কিংবা না গিয়েও বারবারই তাদের মনে করেছেন। আর মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে যাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে অভিজিৎ-দীপন-নিলয়-বাবুরাআরো বেশি করে আছেন তাদের মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ে।

এ প্রেক্ষাপটে যারা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন তাদের নিয়েও নানামুখি সমালোচনা দেখতে পাই। বিপরীতে বাস্তবতা হচ্ছে, যে দেশ মুক্তচিন্তা প্রকাশের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সাহস করে যারা মুক্তমত প্রকাশ করে চাপাতির কোপে ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার আশংকায় থাকেন তারা এদেশটাকে খুব বেশি নিরাপদ মনে করবেন না এটা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু, সবার পক্ষেইতো আর বিদেশে চলে যাওয়া সম্ভব না। একজন মুক্তচিন্তার মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পর একজনের বেশিতো কেউ তার বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড হতে পারবেন না যে তিনিও তার সঙ্গী হিসেবে বিদেশে চলে যাবেন। তবে, এরকম কৌতুকময় ঘটনা এক বা দু’জনের ক্ষেত্রে হয়তো সত্য; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মুক্তচিন্তার মানুষগুলো এখানে আর নিরাপদ নন। সেটার বহুমাত্রিক কারণ আছে। আঘাতটা যেমন জঙ্গিদের কাছ থেকে আসতে পারে তেমনি এর মধ্যে আরো অনেক সমীকরণও আছে। অনেক ব্লগারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এটা বলেছেন, তারা যে শুধু জঙ্গিদের টার্গেট এমন না; জঙ্গিদের টার্গেট বলে এখানে অন্য সমীকরণের শিকার হতে পারেন বলেও তাদের মধ্যে আশংকা কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

এর মানে ভয়ের একটা সংস্কৃতি ঢুকে গেছে। এ শংকার মধ্যে বসবাস কতোদিন চলবে জানি না। আদৌ আমরা এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো কি না সেটাও নিশ্চিত না। তাই মুক্তচিন্তার মানুষগুলোর দেশত্যাগ হয়তো চলতেই থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে কতোজন অভিজিৎ রায়ের মতো বুদ্ধিবৃত্তি কনতুন দরোজা-জানালা খুলতে পারবেন সে বিষয়েও সংশয় আছে। তারপরও বলবো, চাপাতির কোপে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে কেউ বিদেশে শুধু ঘরগেরস্থালি করলেও আমরা স্বস্তিতে থাকবো।

আবার, খুন-খারাবি করে, মুক্তচিন্তার মানুষদের বিদেশে চলে যেতে বাধ্য করে মুক্তচিন্তা রুদ্ধ করার যে চেষ্টা তাতে কি মুক্তচিন্তাকে রুদ্ধ করা যাচ্ছে? না। এ চেষ্টা আগেও ছিলো, এখনো আছে। তবে অবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর কারণ বহুমাত্রিক।

প্রথম কারণ বিশ্বজুড়েই জঙ্গিবাদের উত্থান, সমান্তরালে বাংলাদেশেও। তাদের প্রথম টার্গেট মুক্তচিন্তা। তাই, এখানে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন মুক্তচিন্তার পথে বেশি বাধা।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, শাহরিয়ার কবির, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীরা যে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছেন; নতুন প্রজন্ম তার সাফল্য নিশ্চিত করেছে। অবশ্যই এ প্রজন্ম চিন্তাশীল, এ প্রজন্ম মুক্তচিন্তার বাহক। সুতরাং, এর মধ্য দিয়ে জামায়াত এবং ধর্মীয় রাজনীতি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তারা মুক্তচিন্তার মানুষদের টার্গেট করছে।

এর সঙ্গে অনলাইন বিপ্লবও একটি বড় কারণ হয়েছে। আগে কেউ কোনো চিন্তা করলে তিনি একটা বই না লিখলে প্রতিক্রিয়াশীলরা সেটা সম্পর্কে খুব একটা জানতে পারতো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক আপনাকে এমন সুযোগ করে দিয়েছে যে আপনি আপনার চিন্তা শেয়ার করতে পারছেন, পরিচিত-অপরিচিতদের সঙ্গে মত বিনিময় করতে পারছেন, বিতর্ক করতে পারছেন। এর ফলে হয়েছেটা কী– চিন্তাগুলো খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারছে। এতে একদিকে যেমন মুক্তচিন্তার চর্চা বাড়ছে অন্যদিকে প্রতিক্রিয়া হিসেবে সমান তালে প্রতিক্রিয়াশীলদের সংগঠিত করে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। মুক্তচিন্তার মানুষরা যেমন অনলাইনের সুবিধা পাচ্ছে তেমনি উঠতে বসতে মার্কিনীদের মৃত্যু কামনা করা জঙ্গিরাও তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুবিধাটা নিচ্ছে।

তারপরও এবারের বইমেলায় কি বড় কোনো প্রভাব পড়েছে? না। বইমেলাটা একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটাজায়গা, অন্যদিকে বাঙালির সার্বজনীন উৎসবগুলোরও একটি। এটা একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক চেতনা স্ফূরণের একটি উৎস তেমনি বাৎসরিক সমাবেশেরও একটি উপলক্ষ। বই যারা পড়েন তারা সারা বছরই বই কিনেন। সংখ্যায় হয়তো খুব বেশি না। কিন্তু, বাঙালি পাঠকের বড় একটি অংশ সারাবছরে একবারই বই কিনেন। এটা হচ্ছে বইমেলা। এ পাঠক গোষ্ঠি হয়তো আটটা, দশটা বা বিশটা বই কিনেন। এজন্য বছরে তাদের একটা বাজেট করা থাকে। এরকম মানুষ আপনার-আমার চারপাশে অনেক। আমি কারো কাছে শুনিনি যে নিরাপত্তার কারণে তারা এবার বইমেলায় যাননি। যারা উৎসবের অংশ হিসেবে বইমেলায় আসেন তারাও কেউ বলেননি যে এবার তারা ভিন্ন কিছু ভেবেছেন। সুতরাং, সামস্টিক অংশগ্রহণে বড় কোনো প্রভাব পড়েনি।

কিন্তু, বাস্তবতা হচ্ছে এবারের বইমেলায় লেখক অভিজিৎ নেই, প্রকাশক দীপন নেই। এক বইমেলা থেকে আরেক বইমেলায় এভাবে বেশ কয়েকজন মানুষের না থাকাটা এ ইঙ্গিতও দেয় যে আগামী বছর তালিকাটাআরো দীর্ঘ হতে পারে। সুতরাং, উৎসবে ভাটা পড়েনি বলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে কোনো শিথিলতা আবারো আমাদের কান্নার কারণ হতে পারে। আবার বইমেলা ঠিকঠাক মতো শেষ হয়ে গেলেই যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলা যাবে এমনও না। যারা অভিজিৎ-দীপন-নিলয়-বাবুদের খুন করেছে তারা কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তাদেরকে খুন করেনি। তারা যে উদ্দেশ্য থেকে খুনগুলো করেছে সেটা পূরণ করার জন্য তারা সবসময়ই তৈরি থাকবে।

এটা এখন আপনি বন্ধ করবেন কিভাবে?

অবশ্যই এমন ব্যবস্থা করতে হাবে যাতে হত্যাকারী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের উপযুক্ত শাস্তি হয়। কিন্তু এখানেই কি দায়িত্ব শেষ? না। তারা একটি অপআদর্শ থেকে সংগঠিত আছে। তাদের এসংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা বন্ধ করে দিতে হবে। এজন্য তাদের নেটওয়ার্ক যেমন ভেঙ্গে দিতে হবে তেমনি সংগঠকদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে, সবচেয়ে বড় বিষয় যে কারণে আমাদের তরুণদের একটি অংশ দুর্ভাগ্যজনকভাবে জঙ্গি আদর্শ বেছে নিচ্ছে সেই কারণ খুঁজে বেরকরে তার স্থায়ী চিকিৎসাপত্র লাগবে। শিশুদের এমন আদর্শে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা চিন্তার ক্ষেত্রে সহনশীলতা নিয়ে বড় হয়। যাতে তারা চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে, কথাকে কথা দিয়ে, লেখাকে লেখা দিয়ে মোকাবেলা করার চর্চায় বড় হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সার্থক হবে অভিজিৎ-দীপনদের আত্মত্যাগ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)