চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অপরাধ ঘটার আগে কেনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় না

বাংলা নাটক সিনেমায় সমাজ জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়। বিশেষত সিনেমায় জীবনধর্মী সব হুলস্থূল কর্মকাণ্ডের চিত্রায়ন করা হয়ে থাকে। সাধারণত মারামারি কিংবা বস্তিতে হামলার পরে কিংবা সন্ত্রাসী খুন করে পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাইরেন বাজিয়ে এসে হাজির হয়। খুব কমই দেখা গেছে ইনফরমারের মাধ্যমে অবগত হয়ে বা ভূক্তভোগীদের সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনা ঘটার পূর্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে হাজির হয়েছে, নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে পরিস্থিতি ও আক্রান্তদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের বাস্তবজীবনের চিত্রও আসলে এমন। কোনো অপরাধ হবার পরে বা ঘটনার পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে হাজির হয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ঘটনার পূর্বে যদি হাজির হতে পারত তাহলে হতাহতের সংখ্যা কমে যেত নিঃসন্দেহে, কমে যেত অপরাধের সংখ্যা। আমাদের বাংলাদেশে পুলিশিংটা মূলত সিকিউরিটি ওরিয়েন্টেড, সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদানেই পুলিশসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশাল গ্রুপকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাছাড়া বিদেশি দূতাবাস ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে রিঅ্যাকটিভ ভূমিকা পালন করা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খুব একটা কিছু করারও থাকে না। রিঅ্যাকটিভ মানে ঘটনার পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজির হওয়াকে বুঝায়। আমরা মূলত জানমালের নিরাপত্তার জন্য প্রোঅ্যাকটিভ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যাশা করে থাকি অর্থাৎ ঘটনা ঘটার পূর্বেই তারা ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সহিংস আচরণ তথা অপরাধ নিরসনে ভূমিকা পালন করবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে জনগণের সম্পৃক্ততায় প্রোঅ্যাকটিভ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চর্চা হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে সেটি এখনো সুদূর পরাহত। মাঝে মাঝে কিছু উদাহরণ দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায়। যেমন: জঙ্গিদের গ্রেফতার করা, ডাকাত দল গ্রেফতার করা এবং পাচারকারীদের পাচারের পূর্বেই গ্রেফতার ইত্যাদি প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং হচ্ছে। তবে ইতিবাচক হারে রুট লেভেলে না হওয়ার একমাত্র কারণ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাবলিকের মধ্যকার দূরত্ব।

সম্প্রতি বিয়ে বাড়িতে গান বাজনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হলো রাজধানীর ওয়ারীতে বসবাসকারী নাজমুল হককে (৬৫)। হত্যার দায়ও শিকার করেছে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত বরসহ ৪ জন। এ রকম হরহামেশাই ঘটনাই ঘটে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে। কিন্তু ভয়াবহতার মাত্রা কম থাকায় সবগুলো আমাদের নজরে আসে না ।আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত এ রকম শব্দ দূষণের ঘটনা ঘটে চলেছে, কিন্তু কারোর যেন ভ্রূক্ষেপ নেই এ বিষয়ে। আর ভ্রূক্ষেপই থাকবে কিভাবে যেখানে গণভবনের আশে পাশে রাতে অতি উচ্চস্বরে গান বাজনা বাজানো হয়ে থাকে, রাষ্ট্রের ভিআইপি জায়গাগুলোতে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে চলেছে। আক্রান্ত জায়গা তথা ব্যক্তির নিকট থেকে কোন প্রতিবাদ করা হচ্ছে না, সাধারণ মানুষেরাও সচেতনতার অভাবে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারে না । কিন্তু আমাদের আইনে এ ধরনের অবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্টত বলা রয়েছে।

দণ্ডবিধির ২৬৮ ধারা তে সরাসরি বলা আছে, যে ব্যক্তি, এমন কোন কার্য করে বা এমন কোন বেআইনি বিচ্যুতির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়, যাহা পরিপার্শ্বে বসবাসকারী সম্পত্তির ব্যবহারকারী বা জনসাধারণ বা সাধারণভাবে জনগণের কোন সাধারণ ক্ষতি, বিপদ বা বিরক্তি সৃষ্টি করে, অথবা যাহা অনিবার্যভাবে যে জনগণ কোন গণ-অধিকার ব্যবহার করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারে, সেই জনগণের ক্ষতি, বিপত্তি, বিপদ বা বিরক্তি সৃষ্টি করিবে, সেই ব্যক্তিগণ-উপদ্রবের অপরাধে দোষী বলিয়া সাব্যস্ত হইবে।

বিজ্ঞাপন

দণ্ডবিধির ২৬৮ ধারার শাস্তি বর্ণিত রয়েছে ২৯৪ ধারায়। যেখানে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি অন্যদের বিরক্ত সৃষ্টি করিয়া (ক) কোন প্রকাশ্য স্থানে কোন অশ্লীল কার্য করে, অথবা (খ) কোন প্রকাশ্য স্থানে বা তন্নিকটে কোন অশ্লীল গান, গাথা বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে; সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদণ্ডে-যাহার মেয়াদ তিন মাস পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। কিছু সুবিধা বা সুযোগ সৃষ্টি করবার অজুহাতে কোন সাধারণ উপদ্রব ক্ষমা করা যাইতে পারে না। সুতরাং এ অপরাধের কারণে কেউ মামলা করলে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। তবে জনসাধারণের ভোগান্তি শীর্ষক খুব কম মামলাই হয়ে থাকে থানাগুলোতে। পাশাপাশি পুলিশও নিজ থেকে এ ব্যাপারগুলোতে উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু উদ্যোগী হয়ে অপরাধ নিরসন করতে পুলিশের তেমন ভূমিকা কিংবা মামলার দায়িত্ব নেওয়া খুবই কম দেখা যায়।

কিছু কিছু জায়গায় প্র্যাকটিসটা চালু করতে হবে। একবার চালু হয়ে গেলে পরবর্তীতে শাস্তির ভয়ে কেউ পিটি ক্রাইম (ছোট অপরাধ) করতেও সাহস পাবে না। আমাদের বাংলাদেশে প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশের প্র্যাকটিস তেমনটা নেই বললেই চলে। সরাসরি মাঠের বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিংকে চালু করার ক্ষেত্রে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের। কয়েকজন অফিসারের সাথে কথা বলে চ্যালেঞ্জগুলো সম্বন্ধে জানা যায়। প্রথমেই যে কারণটি উঠে এসেছে তা হল ব্যক্তিগত ইচ্ছে তথা মানবিক মূল্যবোধের অভাব লক্ষ্য করা যায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। পুলিশে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ খুবই প্রয়োজন, যেমন একজন স্পেশাল ব্রাঞ্চে ভাল করছে তাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চেই রাখা উচিত। পাশাপাশি পুলিশের কাজের গ্যাপ বের করতে বাংলাদেশ পুলিশে আধুনিক রিসার্চ উইং প্রয়োজন যারা গবেষণার মাধ্যমে পুলিশের পলিসিকে জনগণের সাথে একীভূত করে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হতে পারেন। এছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সিনিয়র অফিসারদের উপরে নির্ভর করতে হয়, তাই ঘটনার বাস্তবতা জেনেও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা। উপজেলা পর্যায়ে যানবাহনের অপ্রতুলতা থাকায় পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অপরাধীরা জায়গা পরিবর্তন করে ফেলে সহজেই। পাশাপাশি জনগণের যেভাবে সহযোগিতা থাকা দরকার সেভাবে সাহায্য করছে না পুলিশকে। ক্রুশিয়াল মোমেন্টে অপারেশন পরিচালনার দক্ষতার অভাব দেখা যায় মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মাঝে। তাছাড়াও, সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেক সময় যথাযথ সহায়তায় অভাবে আসামীকে গ্রেফতারের আওতায় আনা সক্ষম হয় না। সর্বোপরি, জনগণের তুলনায় পুলিশ সদস্যদের সংখ্যার অপ্রতুলতা প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং এর ক্ষেত্রে বিরাট হুমকি।

প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং কমিউনিটি পুলিশিং এর সাথে আন্ত: সম্পর্কিত। কমিউনিটি পুলিশিং এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্যার সমাধান করা এবং কমিউনিটি পুলিশ মূলত পুলিশ এবং পাবলিকের মধ্যকার সমন্বয় ঘটিয়ে অপরাধ ঘটার পূর্বেই তা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং এর উদ্দেশ্য ও ঠিক তেমনি, পাবলিক কিংবা পুলিশের যে কোন ইনফরমারের মাধ্যমে আহুত সমস্যা সম্পর্কে আঁচ করতে পেরে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে আনা তথা অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। আমাদের দেশে কমিউনিটি পুলিশিং এর ইতিহাস বেশ পুরনো, কিন্তু বাস্তবতায় নিরীখে পুলিশিং এর আবেদনকে জনগণের মাঝে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেক সময় অযোগ্যরা কমিউনিটি পুলিশিং এর কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিচারের সময় দলীয়করণের অভিযোগ থাকায় জনগণের মাঝে কমিউনিটি পুলিশিং সাড়া ফেলতে পারছে না আশাতীতভাবে।

অপরাধের ঘটনা ঘটার পূর্বেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভূমিকা রাখতে হলে বৈশিষ্ট্যসম্পন্নে উন্নীতকরণের জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা দরকার, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাই হবে মাপকাঠি, কোন তদবির এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনভাবেই কাম্য নয়। আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে পুলিশের জন্য, পাশাপাশি মডার্ন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিভিন্ন মাঠ পর্যায়ের বাহিনীতে দক্ষ এবং মেধাবীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যেখানে মাপকাঠি হবে সংখ্যা নয় বিচক্ষণতা। ফ্রেন্ডলি পুলিশিং এর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে জনগণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে অন্যের পরিপূরক হবে। তাদের রাজনৈতিকরণের হাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের ত্বরিতগতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ প্রদান করতে হবে। আইনের বিধান এবং প্রয়োগ সম্বন্ধে সাধারণ জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে। তাহলে অপরাধ ঘটার পূর্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণ কিংবা নিজস্ব ইনফরমারের মাধ্যমে তথ্য জেনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন বলে ধারণা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)