চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদক ও অপরাধের যোগসূত্র

(সুব্রত ব্যানার্জী ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম যৌথভাবে লেখাটি লিখেছেন)

বিজ্ঞাপন

‘মাদক-অপরাধ সংযোগ’ প্রত্যয়টি সাধারণত মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের সঙ্গে অপরাধমূলক আচরণের সম্পর্ককে বোঝায়। তাই, প্রথমেই প্রশ্ন আসে মাদকের সাথে অপরাধের কি সম্পর্ক থাকতে পারে বা মাদকের কারণে কিভাবে অপরাধ সংঘটিত হতে পারে? অপরাধবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এমন অনেক উপায় রয়েছে যার মাধ্যমে মাদক ব্যবহার এবং অপরাধমূলক আচরণ সংযুক্ত হতে পারে। তাদের মতে মাদক সম্পর্কিত অপরাধ এর ধারণার মধ্যে বেশ কিছু ধারণা প্রচলিত রয়েছে যেমন ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ’, ‘মাদকদ্রব্য বাজারজাত কার্যক্রমে অংশীদারিত্বমূলক অপরাধ’ এবং ‘মাদকদ্রব্যের ব্যবহারের ফলস্বরূপ সংঘটিত অপরাধসমূহ’।

অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সবকিছু বিশ্লেষণ করে আমরা মাদক ও অপরাধের মধ্য প্রধানত তিন ধরণের সংযোগ চিহ্নিত করেছি। প্রথমত, মাদক ব্যবহারের কারণে অপরাধ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, মাদকের অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক আচরণ উভয়ই একটি তৃতীয় পরিবর্তনশীল চলক দ্বারা সৃষ্ট হতে পারে। তৃতীয়ত, মাদক ব্যবসার সাথে অপরাধের একটি বৃহৎ যোগসূত্র রয়েছে। আমরা আমাদের লেখায় উপরোক্ত যোগসূত্রে অপরাধ ও সমাজবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার প্রয়াস করেছি।

প্রথম যোগসূত্রের দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, মাদকসেবনকারীরা মাদকদ্রব্য সেবনের জন্য অর্থোপার্জন করতে অবৈধ উপায়ে অপরাধ সংঘটন করতে পারে। সাধারণত মাদকসেবীরা মাদক সংগ্রহের জন্য অর্থের উপর নির্ভর করে। এই অর্থ যোগাড় করতে তারা চুরি, ছিনতাই এমনকি খুন করতেও দ্বিধা বোধ করে না। কিছু গবেষণায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, মাদকদ্রব্যের ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্য অপরাধ করার সাহস বেড়ে যায়। বায়োলজিক্যাল তাত্ত্বিক ও গবেষকরা এই বিষয়টিকে “মাদকের প্রতিক্রিয়া” বা “ফার্মোকোলোজিকাল ইফেক্ট” বলে অভিহিত করেছেন। এর ফলে একজন ব্যক্তি যখন মাদক ব্যাবহার করেন তখন মাদকের প্রতিক্রিয়ার তার ভেতর সাহস বেড়ে যায় এবং সে তখন অপরাধ করতে ভয় পায় না। উদাহরণস্বরুপ দেখা যায়, আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখি মাদকাসক্তের হাতে খুন, চুরি, ছিনতাই হয়েছে।

গবেষকরা বলেন এ ধরণের প্রতিক্রিয়ার কারণে মাদকাসক্তরা সহিংস অপরাধ বেশী করেন। এক্ষেত্রে আমরা যদি মাদকের অর্থনৈতিক মডেল পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় যে কিছু মাদক যেমন অ্যালকোহল, কোকেইন, হিরোইন, মারিজুয়ানার সাথে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণার একটি যোগসূত্র রয়েছে। এ প্রসঙ্গে গোল্ডস্টেইন ১৯৮৫ সালে মাদক ও অপরাধের এই যোগসূত্রকে “মাদকের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা মডেল” নামে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে গুডি, ১৯৯৭ সালে এই মডেলের একটি ব্যাখ্যা দেন যেখানে তিনি উল্লেখ করেন মাদকাসক্তরা মাদক সেবনের ফলে মাদকের দাস হয়ে যান এবং তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তারা মাদকের পেছনে এত বেশী পরিমাণ অর্থ খরচ করেন যে সাধারণ বৈধ পেশা দ্বারা তাদের মাদক সেবনের অভ্যাস বজায় রাখতে অর্থায়ন সম্ভবপর হয়ে উঠে না। ফলস্বরুপ তাদের অবশ্যই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে হবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে যেয়ে একটি গবেষণার কথা মনে পড়ে গেল। ১৯৯৯ সালে আমেরিকার “Arrestee Drug Abuse Monitoring Program (ADAM)” নামক একটি সংস্থা সমগ্র আমেরিকার ৩০টি স্থান হতে ৪০০০০ এরও বেশী গ্রেফতারকৃত প্রাপ্তবয়স্ক ও ৯টি স্থান হতে ৪০০ জনের অধিক গ্রেফতারকৃত কিশোরের উপর একটি বৃহৎ গবেষণা পরিচালনা করে। উক্ত গবেষণায় তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সমগ্র নমুনার দুই-তৃতীয়াংশের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। ভয়ংকর হলেও সত্য বেশীরভাগ কিশোরের মূত্রনমুনায় মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় অনেক বেশী।

মাদক ও অপরাধের দ্বিতীয় যোগসূত্র যদি অপরাধবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায় মাদক ও অপরাধ উভয়েই একে অপরকে প্রভাবিত করে বিভিন্ন চলক দ্বারা। শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাত্ত্বিকরা যেখানে মাদক ব্যাবহার ও অপরাধের যোগসূত্রের জন্য ব্যক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা সেখানে মাইক্রো লেভেলে সমাজের কাঠামোগত কারণসমূহ তুলে ধরেছেন। তাদের মতে সামাজিক পরিস্থিতি, সমাজের কাঠামো, সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে মাদকের সাথে জড়িত থাকার জন্য এবং মাদককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংঘটন করার জন্য। এলিয়ট ১৯৮৯ সালে বলেছেন, মাদক ব্যবহারের একটি প্রধান কারণ সহপাঠী বা বন্ধুদের কাছ থেকে মাদক ব্যবহারে অভ্যাস রপ্ত করা। শুধু তাই নয় মাদক ব্যবহারের ফলে মাদকের অর্থ যোগাড় করার জন্য অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার কৌশলও সহপাঠী বা বন্ধুদের কাছ থেকে তরুণরা শিখে থাকে।

আবার মাদক-অপরাধের যোগসূত্র পরিবেশগত ব্যাখ্যা থেকে দেখা যায়, পরিবেশগত কারণে মাদক ব্যাবহার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উভয়েই বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিবেশগত কারণের মধ্যে আছে কোন নির্দিষ্ট বসতি বা এলাকার গঠন এবং অবস্থানগত প্রভাবকসমূহ। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম আসে ১৯২০ এবং ১৯৩০ দশকের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্লিফোর্ড সহ এবং ম্যাকির প্রবর্তিত বহুল আলোচিত “সামাজিক বিশৃঙ্খলা” তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে যেই বসতি বা সমাজে জনসংখ্যার সংখ্যা অত্যধিক থাকবে, দরিদ্রতা, বেকারত্বসহ অন্যান্য সামাজিক সমস্যা বেশী থাকবে সেই সমাজে বা বসতিতে মাদকের ব্যাবহার ও ব্যবসা বেশী থাকবে। একই সাথে মাদককে কেন্দ্র করে সেখানকার অধিবাসীরা বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত থাকবে।এ প্রসঙ্গে গরম্যান ২০০০ সালে গবেষণায় দেখিয়েছেন, “সামাজিক বিশৃঙ্খলা” তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত সমাজে সহিংস অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তিনি এই সমাজের আরো কিছু বৈশিষ্ট্যর কথা উল্লেখ করেছেন যেমন শিশুদের প্রতি পিতামাতার উদাসীনতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব, নিরাপত্তার অপ্রতুলতা, ভিন্ন বৈশিষ্ট্যর প্রতিবেশীর বসবাস ইত্যাদি। “সামাজিক বিশৃঙ্খলা” তত্ত্বের আলোকে আমরা যদি বাংলাদেশের মাদক ও অপরাধের যোগসূত্র বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায় আমাদের দেশেও বস্তি বা ঢাকা শহরের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় যেমন রেললাইনের ধারের বস্তিগুলোতে মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায় জড়িত অপরাধীদের বাসস্থান তুলনামূলকভাবে অন্যান্য এলাকা থেকে বেশী।

বিজ্ঞাপন

একই সাথে আমরা যদি ১৯৩০ সালে প্রবর্তিত রবার্ট কে মার্টনের “নৈরাজ্য (Anomie) তত্ত্ব” দেখি সেখানে দেখা যায় ব্যক্তির মধ্য অপরাধমূলক আচরণ ও মাদকের সাথে যুক্ত থাকার প্রবণতা পরিলক্ষিত করা যায় যখন সমাজে তার বস্তুগত সাফল্য আহরণের সকল উপায় বন্ধ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন যুবক যখন সৎ পথে সাফল্য না পায় বা তার রোজগারের উপায় বন্ধ হয়ে যায় তখন সে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ থেকে মাদকাসক্ত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আবার আমরা যদি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বের সাহায্য মাদক ব্যাবহার ও অপরাধ প্রবণতা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায়, যে সকল ব্যক্তির সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রের সাথে “এটাসমেন্ট” বা সামাজিক বন্ধন তুলনামূলক কম তারা সহজের সমাজের নিয়ম-কানুন ভাঙতে পারে এবং সমাজের প্রতি তার বন্ধন বা দায়বদ্ধতার অভাবের ফলে মাদক বা অপরাধের সাথে সহজে যুক্ত হতে পারে।

সর্বশেষে, মাদক ব্যবসার সাথে অপরাধের একটি বৃহৎ যোগসূত্র রয়েছে। বিষয়টি প্রথমে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করব। মাদকের চোরাচালানের সাথে সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি বৈশ্বিক যোগসূত্র আছে। শুধুমাত্র প্রতিবছর মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে আমেরিকার ৪০% সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং এর মাধ্যমে ১১০ বিলিয়নেরও বেশী ডলার আয় হয়ে থাকে। মাদক চোরাচালান ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সাথে জড়িত এইসব সংঘবদ্ধ দলের মধ্য আছে আমেরিকার “লা কোসা নস্ট্রা”, “সিসিলিয়ান মাফিয়া” এবং নাইজেরিয়া ও কলম্বিয়ান বিভিন্ন সংঘবদ্ধ মাদক চোরাচালান সংঘ বা গ্যাং।সাধারণত বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধী গ্রুপ নিজেদের মধ্য মাদক চোরাচালানের জন্য একটি গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখে।

উল্লেখ্য দক্ষিণ আমেরিকাকে কেন্দ্র করে কোকেইনের বিশাল চোরাচালান ও বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। কোকেইন প্রধানত পেরু, বলিভিয়া, কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে প্রচুর পরিমাণে চাষ হয় এবং পরবর্তীতে কলম্বিয়া, ব্রাজিল এবং ভেনিজুয়েলায় বিভিন্ন কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়। প্রক্রিয়াজাত কোকেইন আবার অন্যান্য দক্ষিণ আমেরিকান দেশ ও ক্যারিবিয়ান দেশের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে বাজারজাত করা হয়। তবে কোকেইন বাণিজ্য ও চোরাচালানের মূল হোতা ধরা হয় কলম্বিয়ান মাফিয়াচক্রকে। অপরদিকে, সারা বিশ্ব হেরোইন চালানের সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত আছে ম্যাক্সিকোর মাফিয়া চক্র। উল্লেখ্য ম্যাক্সিকোর সাথে আমেরিকার ২০০০ মাইল অরক্ষিত সীমান্তরেখা আছে যার মাধ্যমে আমেরিকাকে পথ বা রুট হিসাবে ব্যাবহার করে সমগ্র পৃথিবীতে হেরোইন পাচার করা হয়। বহু বছর ধরে মেক্সিকোর বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলে আফিম চাষ করা হয়ে থাকে। তারপর সেই আফিম থেকে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা হেরোইন তৈরি করে কুরিয়ারের মাধ্যমে আমেরিকায় চালান করে।

অন্যদিকে, ইউরোপের মাদক ব্যবসার কথা বলতে গেলে বিশেষভাবে ইতালি ও ফ্রান্সের মাফিয়াদের কথা বলতে হয়। ইতালিতে মাদক ব্যবসা ও অপরাধের ভয়ংকর তথ্য পাওয়া যায়। ১৯ শতকে এসব মাফিয়াদের মূলত উত্থান হয় এবং মাদক চোরাচালানকে কেন্দ্র করে তারা মানব পাচার, অস্ত্র পাচার, অপহরণ, গণিকাব্যাবসা, ঘুষ, খুনের মত অপরাধ সংঘটন করে। এসব মাফিয়াচক্রের সাথে ইতালি সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গেরও যোগসাজশ আছে বলে শোনা যায়। মাদককে কেন্দ্র করে এই মাফিয়ার আয় বছরে ১০ বিলিয়ন ইউরোরও বেশী যা কিনা ইতালির সমগ্র অর্থনীতিতে ১০% জিডিপি হিসাবে গণ্য হয়। ইতালির মাফিয়াচক্রের মধ্য উল্লেখযোগ্য হল সিসিলিয়ান মাফিয়া, ন্যাপলস মাফিয়া, ক্যালাব্রিয়া মাফিয়া, পুগ্লিয়া মাফিয়া ইত্যাদি।

পরিশেষে, যদি এশিয়া অঞ্চলে এবং প্রধানত বাংলাদেশের মাদক চোরাচালান ও অপরাধের সংযোগ দেখি তাহলে বাংলাপিডিয়ার সূত্রমতে বিশ্বে অবৈধ মাদক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ওপিয়ামজাত দ্রব্যাদি তৈরি হয় মূলত পপি নামের একটি গাছের নির্যাস থেকে যা কিনা এশিয়াতে সবথেকে বেশী পরিমাণে উৎপাদন হয়ে থাকে। ১৯৯৬ সালের এক পরিসংখ্যান অনুসারে ওই সময় গোটা বিশ্বে পপিচাষের জমির পরিমাণ প্রায় ২,৮০,০০০ হেক্টরে সম্প্রসারিত হয়েছিল। অবৈধ উপায়ে উৎপন্ন ওপিয়ামজাত মাদকের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তিনটি প্রধান উৎপাদন এলাকা গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান), গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড) ও গোল্ডেন ওয়েজ ( বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম সংযোগ)। ভৌগিলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার এই প্রধান তিনটি মাদক উৎপাদন ও পাচারকারী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে খুবই উপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে শত শত নদ-নদী ও খাল দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। মাদক চোরাকারবারিরা সমুদ্র উপকূল ও জলপথকে তাদের পণ্য পাচারের খুবই উপযুক্ত পথ হিসেবে বিবেচনা করে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে ভারতের অনুপ্রবেশযোগ্য বিশাল সীমান্ত। ভারতে বৈধভাবে ফেনসিডিল তৈরি হয়। ১৯৮২ সালে উৎপাদন বন্ধের পর সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ফেনসিডিল একটি অপব্যবহারযোগ্য মাদকদ্রব্যে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার থেকে পাচারকৃত ইয়াবা নামের আরেকটি উত্তেজক ট্যাবলেট যা মূলত মেথামফেটাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে ইয়াবার সহজলভ্য ব্যবহার দেখলে বোঝা যায় যে হেরোইন, ফেন্সিডিলের চেয়ে ইয়াবা বহন করা সহজ। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের ৩৬৫ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে ইয়াবা খুব সহজেই নদী ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। আর এসব ইয়াবা ব্যবসার সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও সংযোগ আছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগে উঠে এসেছে। এছাড়া সেই ৯০ এর দশকে থেকে মায়ানমারে প্রচুর পরিমাণে আফিম চাষ হয় যা বাংলাদেশ হয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশে যে সমস্ত মাদকদ্রব্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেগুলি হচ্ছে: হেরোইন, গাঁজা, পেথিড্রিন, ফেনসিডিল ও ইয়াবার মতো কিছু কিছু চেতনানাশক রাসায়নিক দ্রব্য। জানা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদকের অর্থ লেনদেন হয় হুন্ডির মাধ্যমে যা কিনা মানি লন্ডারিং অপরাধ নামে পরিচিত।

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার মাদকের অপব্যবহারকে অন্যতম মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টার উপর জোড় দিয়েছে। উল্লেখ্য, মাদকের বিরুদ্ধে গত ৪ মে থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী অভিযানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৫৩ জন। এর মধ্যে গত চার দিনে নিহত হয়েছে ৪০ জন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতে শুধুমাত্র ঢাকাতেই রমনায় ৭৪টি, লালবাগে ৯০টি, ওয়ারলেসে ১৫০টি, মিরপুরে ১২৫টি গুলশানে ১১২টি, উত্তরায় ৬৮টি, মতিঝিলে ১২২টি এবং তেজগাঁওয়ে মাদকের শতাধিক স্পট রয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানের আগে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের একটি তালিকা তৈরি করে সরকার। সেই তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আছে কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম। তবে দুঃখজনক হলেও স্থানীয়ভাবে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় মাদক ও অপরাধের মধ্য পারস্পরিক যোগসূত্র আছে যার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপদজনক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেই দেখা যায় মাদক ও মাদককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধ কিভাবে সারা দেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে। শুধুমাত্র সাময়িক “জিরো টোলারেন্স” নীতির মাধ্যমে আসলে কোন সমাজে বা রাষ্ট্র মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। মাদক ও অপরাধের যোগসূত্র ও কারণসমূহ উদঘাটন করে, মাদকে-অপরাধের সামাজিক ও তাত্ত্বিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেই কেবল মাদকের ভয়ানক ছোবল থেকে রাষ্ট্র ও জনগণকে দীর্ঘমেয়াদীভাবে রক্ষা করা সম্ভব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)