চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অন্ধকার ভেঙেই যেতে হবে

২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর।

বিজ্ঞাপন

আমাদের অভ্যাসগত স্তব্ধতা পুনরায় স্তব্ধ হয়েছিলো। অক্ষম আক্রোশ চেপে আমরা দেখছিলাম আক্রান্ত চিন্তাশীল ও প্রগতিকামী মানুষের সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে। একের পর এক নির্দয়ভাবে আক্রান্ত ও নিহত হচ্ছেন দেশের লেখক-ব্লগার-প্রকাশকসহ মুক্তচিন্তার মানুষেরা-বস্তুত, ধারালো অস্ত্রের নিচে আমরা দেখেছিলাম ক্ষত-বিক্ষত ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।

আজ প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার এক বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি বদলায়নি। ধর্মের ধোঁয়া তুলে এখনও চলছে নারকীয় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। ব্যারিকেড বসানো হচ্ছে চিন্তার সরণিতে, মগজের কোষে কোষে সাতান্ন ধারার নামে জারি করা হচ্ছে ১৪৪ ধারা। মুক্তচিন্তাকে কফিন বন্দী করে একের পর এক পেরেক ঠোকা হচ্ছে; মত প্রকাশের পথরুদ্ধ করে যাবতীয় দ্বিমত আর প্রশ্নের উত্থাপনকে নিজেদের বাক্সবন্দী করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে রাজনীতি।

সুতরাং গত বছর এই দিনে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনাটির সঙ্গে আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ করতে হবে নিহত দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সে-ই পারাবার প্রতিম উচ্চারণ— “শুভবুদ্ধির উদয় হোক”। এক বছর চলে গেছে এবং আরও কতো বছর চলে গেলে আমাদের সমাজে সন্তানহারা অধ্যাপকের এই আশার বাণীর প্রতিফলন দেখবো, আমরা জানি না। আমরা কেবল জানি, শুভবুদ্ধি জাগরণের জন্যে নিজের এবং সমাজ পরিবর্তনের নিরন্তর সংগ্রাম করার সামর্থ্যটুকু আমাদের আছে।

গত বছর এই দিনে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয় আজিজ সুপার মার্কেটে প্রকাশনীর কার্যালয়ে। ওই ঘটনার আগেই লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হত্যার উদ্দেশে আক্রমণ চালানো হয় প্রকাশক আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসু ও তারেক রহিমের ওপর। তারা অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যান। শুদ্ধস্বর এবং জাগৃতি — দু’টো প্রকাশনী থেকেই প্রকাশিত হয়েছিলো গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের অনেক গ্রন্থ।

লেখক রণদীপম বসু দর্শনের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, লিখেছেন। ২০১৫ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছিলো তারেক রহিমের কবিতার বই যেন মাঝপথেই। তারা লিখেছেন এবং লেখার মাধ্যমে, সৃজনশীলতার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছেন আমাদের আবদ্ধ মানসিকতার। মানুষের মননকে মুক্তির নীলিমায় নিয়ে যেতে পারেন বলেই সৃজনশীল মানুষ বারবার আক্রান্ত হন মৌলবাদী ধর্মান্ধদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। কারণ এইসব কূপমণ্ডুক বকধার্মিকরা জানে, মানুষের চিন্তার মুক্তি ঘটলে ভষ্ম হয়ে যায় কাঠমোল্লাদের বুজরুকি।

ফয়সল আরেফিন দীপন
ফয়সল আরেফিন দীপন

মানসকাঠামোর মুক্তিই একটি জাতিকে পরিচালিত করে রেনেসাঁর পথে। কিন্তু সমাজে ক্যান্সারের মতো বিরাজমান এই উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা আর মৌলবাদের বিস্তার রোধে কার্যকর রাজনীতির প্রভাব অনুপস্থিত। বরং রাজনীতি তার জনবিচ্ছিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত নির্লজ্জ মুখাবয়ব ঢাকতে বারবার আশ্রয় নিয়েছে মৌলবাদের আস্তিনের তলায়।

পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখেছি আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে নস্যাৎ করার হীন ষড়যন্ত্রে ধর্মীয় মৌলবাদকে ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ধর্মের নামে পৈশাচিক গণহত্যা আর বিভৎসতম নারী নির্যাতন করেছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমানের ইসলামী ছাত্র শিবির) ও মুসলিম লীগসহ নানা যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে যদিও সাংবিধানিকভাবে ‘ধর্মীয় নিরপেক্ষতা’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়, তবুও বাঙালির মনোজগতে বিরাজমান ‘ধর্মীয় রাজনীতি’র ভূত উবে যায়নি। ফলে পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর অবৈধ সামরিক শাসকদের ধর্মীয় রাজনীতি প্রবর্তনে বেগ পেতে হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এরপর বহু বছর সামরিকতন্ত্র আর মোল্লাতন্ত্র যুগপৎ অপরাজনীতির কারবার সাধন করেছে বাংলাদেশে। সুতরাং মৌলবাদের চাষাবাদে আমাদের অপরাজনীতি একটি বড় প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে এসেছে, এখনও করছে। বস্তুত সে blogger2কারণেই, মুক্তচিন্তার সৃজনশীল মানুষের ওপর যখন একের পর এক হামলা হচ্ছে — তখনও রাজনীতি তার সুবিধাবাদী চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে।

সম্ভবত সে কারণেই ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত বহুমাত্রিক জ্যোর্তিময় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারলেও, অধ্যাপক অজয় রায় বা আবুল কাসেম ফজলুল হকের পাশে সেভাবে দাঁড়াতে পারে না আওয়ামী লীগ। কারণ, তখন আওয়ামী লীগ ছিলো বিরোধী দলে, এখন সরকারি দলে।

তাছাড়া রাজনীতির ভাষাও যেহেতু ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাই মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যার পর আমরা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক উপদেশমালা শুনেছি। একের পর এক ব্লগার-লেখক-প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে আর বিচার তো দূরের কথা, সরকারের নানা মহল ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ও আমাদের সীমা চেনানোর কাজে ব্যস্ত থেকেছেন। আর বিভিন্ন মহলের এইসব অপগণ্ড বক্তব্যসমূহ ক্রমাগত আরেকটি হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করেছে। মৌলবাদীরা মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যাকে তাদের রুটিনে রূপান্তরিত করে ফেলেছিলো।

রাজনীতির এই চিত্র কতটা কলুষিত, কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন সেটারও একটি প্রমাণ সম্ভবত ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর। নিহত প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে বিএনপি’র কর্মী বানানোর কী জঘন্য খেলায় মেতেছিলো দলটির নেতারা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা নিহতের পিতা সম্পর্কে কটূক্তি করতেও ছাড়েননি। যে যার মতো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে রাজনীতি করার তালে থেকেছেন, মাঝখান থেকে হত্যার নীল-নকশা সাজিয়ে গেছে জঙ্গিবাদী দলগুলো।

humayun-azad
হুমায়ুন আজাদ

মৌলবাদের সাথে, ধর্মীয় রাজনীতির সাথে ক্রমাগত আপোসের যে রাজনীতি বহুকাল ধরেই চলে আসছে— তার পরিণামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অক্ষাংশ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিচারহীনতার সুযোগে এইসব অপশক্তি তাদের অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মগজে চলছে সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ। ফলে সমস্যার বিস্তার ঘটছে। সম্প্রতি আবুল কাসেম স্যার একটি জাতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন — “আদর্শগত প্রশ্নে, মনোজগতের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে”। এই আদর্শের জায়গাটি আজ কোথায়? কারা দৃষ্টি দেবেন? যারা আদর্শকে শিকেয় তুলে রাজনীতির নামে এক্কাদোক্কা খেলতে অভ্যস্ত?

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, যে কোনো জাতিরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পূর্বশর্ত হলো রাষ্ট্রের চিন্তাশীল মানুষদের হত্যা করা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই পদ্ধতি অবলম্বন করেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তান ও তার দোসর রাজাকার আল-বদররা। আজ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, তখন তারা আবারও একাত্তরের মতই বাংলাদেশকে পঙ্গু করার নিমিত্তেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো চালাচ্ছে। কারণ একাত্তরের পরাজিত শক্তি আজও বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি সবখানেই সক্রিয়। তারা কোনোদিনই স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।

সুতরাং, এ দেশকে মেধাহীন পঙ্গু চিন্তাশক্তিহীন একটি জড় রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্রই করে যাচ্ছে। এই সত্যটুকু রাষ্ট্রযন্ত্রের মগজে যতোক্ষণ না ঢুকবে, ততক্ষণ এই জনপদ মুক্তবুদ্ধি চর্চার জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে না। রাজীব হায়দার, আরিফ রায়হান দীপ, জগৎজ্যাতি তালুকদার, অভিজিৎ রায়, অনন্ত blogger3বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রী নীল, ফয়সল আরেফিন দীপন, নাজিমুদ্দীন, জুলহাসরা একটি আদর্শ রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে দ্বিমত হবার অধিকার থাকবে, বহুত্ববাদের স্বীকৃতি থাকবে — এমন একটি মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন।

সে-ই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে রণদীপম বসুকে চার্বাকের মতো আরও অনেক কিছু খোঁজে এনে তুলে ধরতে হবে আমাদের সামনে। শুদ্ধস্বরকে সামনে হাঁটতে হবে আমাদের মননকে শুদ্ধ করার লক্ষ্যে।

লেখার শিরোনামটি তারেক রহিমের অন্ধকার ভেঙে যাচ্ছ কোথাও  কবিতার একটি পঙক্তি থেকে অনুপ্রাণিত। এমন অনুপ্রেরণার উৎস আমাদের অন্ধকারে বাঁচিয়ে রাখুক, আমাদের জাগিয়ে রাখুক, মিছিলের পথেই রাখুক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)